‘ইঞ্জিনিয়ার হতে চান্স পেয়েও মেডিকেলে ভর্তি হয়নি আবরার’

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০১৯, ১৯:০৭

ঢাকা মেডিকেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটে চান্স পেয়েছিল। ইঞ্জিনিয়ার হতে শেষ পর্যন্ত বুয়েটেই ভর্তি হয়েছিলেন। ছেলের মৃত্যুর সংবাদ শুনে কান্না জড়িত কণ্ঠে মা রোকেয়া খাতুন বলেন, ছেলেটাকে মেডিকেলে পড়তে বলেছিলাম, সে পড়ে নাই; ছেলেটা আজ মেডিকেলের মর্গে! 

নিহত বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন গ্রামের বাড়িতে। আরও কয়েকদিন থাকতে চেয়েছিলেন। তবে সামনে পরীক্ষা বাড়িতে পড়াশুনা হয় না, সে কারণে রবিবার ৫টায় ফিরেন হলে। তবে রাতে আর বাবা-মার ফোন ধরেননি আবরার। যতোক্ষণে বাবা-মা ছেলের খবর জানলেন, ততোক্ষণে তিনি আর জীবিত নেই। এবার চিরদিনের জন্য ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন তিনি।  

নিহতের পরিবারিক সূত্র জানায়, ছুটি পেয়ে আবরার গত ১০ দিন আগে কুষ্টিয়ার বাড়িতে এসেছিলেন। রবিবার সেপ্টেম্বর সকালে আবরার কুষ্টিয়ার বাড়ি থেকে ঢাকায় রওনা হয়। ওইদিন বিকাল ৫টায় সে বুয়েটের হলে পৌঁছায়। এরপর রাতে অনেকবার আবরারকে ফোন দেয়ার পর সে আর ফোন রিসিভ করেনি বলে তার মা জানান। 

নিহতের ছোট ভাই ঢাকা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাইয়াজ  জানান, ফোন রিসিভ না করায় আমি ফেসবুকের মেসেঞ্জারে আমার ভাইয়া আবরারকে ম্যাসেজ দেই। আবরার সে সময় ফেসবুকে অ্যাকটিভ থাকলেও সে কোন সাড়া দেয়নি। 

আরও পড়ুন : আবরার হত্যায় চার ছাত্রলীগ নেতা আটক

এদিকে আবরার ফাহাদ শিবির কর্মী বলে একটি মহল হীন উদ্দেশ্যে অপপ্রচার করছে বলে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবী করা হয়। আবরার ধর্ম পরায়ন ও প্রগতিশীল মানষিকতার মেধাবী ছাত্র। তার গোটা পরিবারও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। তবে আবরার তাবলিগের অনুসারী ছিল।  

দলীয় দুর্বৃত্তদের পৈশাচিক ও উপর্যুপরি নির্মম নির্যাতনে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই সড়কস্থ বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। দুর্বত্তদের হাতে নিহত সম্ভবনাময় এই মেধাবী ছাত্রর জীবনপ্রদীপ নিভে য়াওয়ার ঘটনাটি পরিবার, স্বজনসহ এলাকবাসীকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করেছে। পুত্র হারানোর শোকে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন মা স্কুল শিক্ষিকা রোকেয়া খাতুন। 

বিনয়ী ও শান্তশিষ্ট স্বভাবের মেধাবী ছাত্র আবরারের কোনো শত্রু ছিল না। এছাড়া আবরারের পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। এদিকে মেধাবী ছাত্র আবরারের মৃত্যুর ঘটনার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দাবী করেছে নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী। 

মেধাবী আবরার ২০১৫ সালে কুষ্টিয়া জিলা স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি ও পরবর্তীতে এইচএসসি পাস করার পর তিনি বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। তিনি ওই বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত ও শেরে বাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। বুয়েটে ভর্তির আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় তিনি মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান লাভ এবং ওই একই বছর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজেও তিনি মেধা তালিকায় স্থান করে নিয়েছিলেন। 

৬ সেপ্টেম্বও রবিবার রাত সাড়ে ৮ টার দিকে তার ২০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ছাত্রলীগ নামধারী বুয়েটের কয়েকজন আবরারকে ডেকে নিয়ে যায় এবং এরপর রাত ৩টার দিকে শেরে বাংলা হলের নিচতলা থেকে আবরারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। 

এদিকে সম্ভবনাময় মেধাবী ছেলেকে হারিয়ে মা রোকেয়া খাতুন ও পিতা বরকতুল্লাহ পাগলপ্রায়। ছোটভাই ফাইয়াজও যেন বাকরুদ্ধ। নির্মমভাবে পিটিয়ে আবরারকে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে। এদিকে দেশের স্বনামধন্য এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা উপেক্ষা করে আবাসকি হলের অভ্যন্তরে পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বুয়েট শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের ভাবিয়ে তুলেছে। 

পড়ালেখার পাশাপাশি সে সুযোগ পেলে তাবলিগে যেত বলে তার পারিবাবিক সূত্র জানায়। আবরারের পিতা বরকতুল্লাহ ব্র্যাকের অবসরপ্রাপ্ত নিরীক্ষক এবং মা রোকেয়া খাতুন একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষিকা। দুই ভাইয়ের মধ্যে আবরার ফাহাদ রাব্বী পরিবারের বড় ছেলে। তার ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ ঢাকা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। আবরারের পৈত্রিক বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার রায়ডাঙ্গা  গ্রামে। বর্তমানে কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই সড়কের বাড়িতে আবরারের পিতা-মাতা বসবাস করেন।
 
আনুষ্ঠানিকতা শেষে ঢাকা থেকে নিহতের লাশ আসার পর আজ মঙ্গলবার সকালে পৈত্রিক বাড়ি কুমারখালীর রায়ডাঙ্গা গ্রামের গোরস্থানে দাফন হবে বলে তার পারিবারিক সূত্র জানায়। 

উল্লেখ্য, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার আগে ৫ অক্টোবর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ও চুক্তি সম্পর্কিত বিষয়ে ফেসবুকে দুটি পোস্ট দেন আবরার। এঘটনার জের ধরে সরকার দলীয় দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যা করে করেছে বলে নিহতের পরিবার ও স্বজনরা ধারণা করছেন। এদিকে নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আবরারের পরিবার-প্রতিবেশীসহ জেলাবাসী নিন্দা ও চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে এ হত্যাকান্ডের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়ে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করা হয়। 

ইত্তেফাক/কেআই