সাহেবপাড়ার দুই গির্জা

স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী মুগ্ধ করে এখনো

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০১৯, ২০:৪৫

ব্রিটিশ শাসনামলে আঠারো শতকের শুরুর দিকে নীলফামারীর সৈয়দপুরের গোড়াপত্তন হয়। আর ঐ সময়ে নির্মিত দর্শনীয় দুইটি গির্জা কালের বহমানতায় দাঁড়িয়ে আছে এখনো। যার স্থাপত্যকলা ও নির্মাণশৈলী মুগ্ধ করে প্রতিটি মানুষকে।

অন্যদিকে, সেখানকার বৃহত্ রেলওয়ে কারখানাটিতে বাঙালি ও বিহারির সঙ্গে কাজ করতেন বহু ব্রিটিশ নাগরিকসহ অ্যাংলো ইন্ডিয়ান রোমান ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়ের খ্রিস্টান। তাদের বসবাসের জন্য গড়ে তোলা হয় এ শহরে বেশকটি আবাসিক এলাকা। এর মধ্যে সাব-অর্ডিনেট কলোনি, সাহেবপাড়া ও অফিসার্স কলোনি অন্যতম।

জানা গেছে, ১৮৮৬ সালে তাদের ধর্মীয় উপাসনার জন্য ব্রিটিশ সরকার সাহেবপাড়ার দুই প্রান্তে দুটি গির্জা নির্মাণ করে। এর একটি ছিল রোমান ক্যাথলিক ও অপরটি প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়ের ক্রাইস্টচার্চ গির্জা। এ গির্জা দুটি উত্তরাঞ্চলের সর্বপ্রথম ও প্রাচীনতম গির্জা। এর নির্মাণশৈলী রোমান ও ইউরোপীয় স্থাপত্যকলায় সমৃদ্ধ। এর মধ্যে রেলওয়ে কারখানা গেট সংলগ্ন গির্জাটি মা মেরি বা কুমারী মরিয়মের নামে উত্সর্গ করা হয়। ব্রিটিশ সরকার ১৮৯২ সালে গির্জার পাশেই রেলওয়ের তিন বিঘা জমির ওপর পুরোহিত ভবন (ফাদারকুঠি) নির্মাণ করে। তখন ফাদার ফ্রান্সিস বোক্কা লিমে প্রভু যিশু খ্রিষ্টের ভক্ত-অনুরক্তদের নিয়ে আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ইংরেজ ও অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা নিজ নিজ দেশে ফিরে গেলেও কিছু সংখ্যক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান এ শহরে থেকে যান। এছাড়াও বাঙালি ও অন্যান্য খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোক বলতে ঢাকা, মানিকগঞ্জ, বরিশাল, পাবনা, কুষ্টিয়াসহ প্রভৃতি জেলার অধিবাসী রেলওয়েতে চাকরি করতে এসে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন বলে জানান খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের তরুণ এলবার্ট সিং। 

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের আগ পর্যন্ত এখানে খ্রিস্টযোগ সংঘবদ্ধভাবে বাইবেল পাঠ, উপদেশ, প্রার্থনা পরিচালনা করতেন অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর কিছুদিন আগে অনেকে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান।

১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৬ এপ্রিল সৈয়দপুরে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু হলে অবাঙালি ও পাকসেনাদের হাতে শহিদ হন বেশ কজন খ্রিস্টান। যুদ্ধের সেই ভয়াবহ সংকটকালেও ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়ের বহু খ্রিস্টভক্ত গির্জা ও সিস্টারদের কনভেন্টে অবরুদ্ধ জীবনযাপন করেন। ব্রিটিশ ও অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা চলে যাবার পর সৈয়দপুরে বাঙালি খ্রিস্টভক্ত ও খ্রিস্টানদের বিভিন্ন বিপদে যারা এগিয়ে আসেন তারা হলেন—ফাদার কালিন্তস কোডাইয়া, ফাদার পরিবলদি, ফাদার রায়ার বয়েন ও ফাদার প্যাট্রেক গমেজ অন্যতম।

সৈয়দপুর শহরে নতুন বাবুপাড়ায় (খ্রিষ্টানপাড়া) বসবাসকারী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সিলভিয়া অ্যানি মল্লিক জানান, ‘সৈয়দপুর শহরের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয় দর্শনীয় গীর্জা দুটি। আমরা এতে উপাসনা করছি। সম্প্রীতির বন্দনা করছি। এদেশে আমরা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই মিলেমিশে থাকতে চাই।’