ঝুলে আছে সরল সুদ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০১৯, ২২:১৫

ব্যাংক ঋণে সুদের হার গণনায় সরল হিসাব চালুর (সিম্পল রেট) বিষয়টি ঝুলে গেছে। গত মে মাস থেকেই এটি কার্যকর করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। কিন্তু তা কার্যকরে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ব্যাংকিং সূত্রগুলো বলেছে, এ ধরনের কোনো নির্দেশনা এখনো আসেনি। তবে ব্যাংকারদের অনেকেই একমত যে, সরল সুদ চালু করা যৌক্তিক। সরল সুদ প্রথা চালু না হওয়ায় উদ্যোক্তাদের ওপর বোঝা বাড়ছে। যা অন্যায্য।

বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত সুদহার এবং দণ্ডসুদ প্রথার কারণে উদ্যোক্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খোদ ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক ঋণের সুদের হার এক অঙ্কে আনার দাবি করেছিলেন। কিন্তু সেটি কার্যকর হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, অর্থমন্ত্রী নিজেও একজন ব্যবসায়ী হওয়ায় তার মুখ থেকে সরল সুদ চালুর ঘোষণায় অনেকেই আশান্বিত হয়েছেন। সরল সুদ চালু হলে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণও কমে আসত। বাড়তি সুদের বোঝা বইতে হতো না উদ্যোক্তাদের। এখন সুদের ওপর সুদ-দণ্ডসুদ আরোপের ফলে উদ্যোক্তার অবস্থা ত্রাহি। শিল্প উদ্যোক্তারা এমনিতেই জ্বালানি সংকটে ভুগছেন। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় কলকারখানা সক্ষমতা অনুযায়ী চালু রাখাও সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় উত্পাদন বাধাগ্রস্ত হয়ে উদ্যোক্তার ব্যবসা খারাপ হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে তার আয়ে; যা নিয়মিত ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা হারাচ্ছে। উদ্যোক্তা অনিচ্ছাকৃতভাবেই খেলাপির তকমা পেয়ে যাচ্ছেন।  

উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে গ্যাস, বিদ্যুতের সংকটের মধ্যে শিল্প টিকিয়ে রাখা যখন দুষ্কর, তখন উচ্চ সুদহার এবং দণ্ডসুদ আরোপের মাধ্যমে উদ্যোক্তাকে স্থায়ী ভাবে ‘রুগণ্’ করার পন্থা অব্যাহত রয়েছে। দণ্ড সুদের কারণে এ দেশে নতুন উদ্যোক্তা বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের মতে, বিশ্বের কোথাও এত বেশি হারে ব্যাংক ঋণের সুদ নেওয়া হয় না। এমনকি সুদের ওপর সুদ আরোপের মাধ্যমে শিল্পকে রুগণ্ করে দেওয়ার নজিরও বিশ্বে নেই। সেবাখাত কিংবা ভোক্তাখাতের ঋণের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য।

ফিনান্সিয়াল ইকনোমিস্ট ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, উদ্যোক্তা বিকাশের জন্য সুদ গণনায় ‘সিম্পল রেট’ চালু সময়ের দাবি। ২০২৩ সালের মধ্যে বর্তমান সরকারের কর্মসৃজনের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে সরল সুদ ও সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

প্রসঙ্গত, সিঙ্গেল ডিজিটে সুদহার নামিয়ে আনার ঘোষণাও কার্যকর করেনি ব্যাংকগুলো। সরকারি দু-একটা ব্যাংক এটি কার্যকর করলেও অধিকাংশ ব্যাংকেই সুদহার ডাবল ডিজিটে রয়েছে। অথচ সুদহার কমানোর জন্য ব্যাংকগুলোকে বেশ কিছু সুবিধাও দিয়েছেন। সরকারি তহবিল প্রাপ্তির শর্ত হিসাবেও সিঙ্গেল ডিজিট সুদহারের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তার পরও বাস্তবায়ন করা যায়নি সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার। যেখানে উন্নত দেশগুলো তাদের স্বল্প সুদের মধ্যেও সুদহার কমাচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও সুদের হার কমানো হয়েছে।

ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবির কাছ থেকে সব ঋণের ক্ষেত্রেই সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে করতে হবে এমন ঘোষণাই এসেছিল। গত ১ জুলাই ’১৮ থেকে যা কার্যকর করার কথা। এ নিয়ে একাধিক বৈঠকও হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, বাস্তবায়ন না করলে ব্যবস্থা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলেছে, যারা সুদ কমাবে না তাদের করপোরেট ট্যাক্স কমানো হবে না। কিন্তু ব্যাংকগুলো কারো কথার তোয়াক্কা করেনি। বরং ব্যাংকগুলো তাদের পরিচালন মুনাফার উল্লম্ফন দেখিয়ে শেয়ারবাজারে প্রভাব ফেলতে তত্পর। বেশি সুদ, মুদ্রাবাজার ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে মুনাফার পথে হাঁটলেও শিল্পে পুঁজি জুগিয়ে কর্মসংস্থানমুখী প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে ব্যাংকগুলোর নজর ছিল কম।

ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তথ্য-বিশ্লেষণ করেই দেখা যায়, শিল্প ঋণে মূলধনী ও মেয়াদি উভয় ঋণের ক্ষেত্রে অধিকাংশ ব্যাংকই সিঙ্গেল ডিজিটে সুদের হার নামিয়ে আনার নিয়ম মানছে না। এসব ব্যাংক মাঝারি ও বড়ো শিল্পের জন্য কিছুটা কম সুদ নিলেও ছোটো শিল্পের জন্য অনেক বেশি সুদ নিচ্ছে। ফলে ছোটো শিল্পগুলোর জন্য ব্যবসা পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। আর নতুন বেশি সুদ পরিশোধ করেন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠা করাও সম্ভব হচ্ছে না।

সরকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকে উত্সাহ দিতে বদ্ধপরিকর। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) প্রতিষ্ঠান উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসায় টেকসই হতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে এসএমই খাতে সুদের হার বরং বেশি। অথচ এখাতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। শ্রমঘন অর্থনীতির জন্য এসএমইকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে অন্যান্য খাতেও উচ্চ সুদহার মারাত্মক প্রভাব ফেলে। যেখানে দেশে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস—বিদ্যুত্ সরবরাহও নেই। জ্বালানি সংকট, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা প্রভৃতি মোকাবিলা করে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের টিকে থাকতে হয়।