নারীদের আলোর পথ দেখাচ্ছেন জাহানারা বেগম

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:১২

  মো. আমিরুজ্জামান

 

প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলের অতি সাধারণ একজন গৃহবধূ। যার প্রধান কাজ মূলত ঘরসংসার সামলানো, ঘরের বাইরে টুকটাক কাজকর্ম করে সাংসারিক ব্যয় মেটানো। গ্রামবাংলার চিরায়ত প্রথায় এমন দৃশ্য এখনো বহমান। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে অনেক। গ্রামের নারীরা এখন শুধু চুলোতেই আগুন দিতে নয়, বরং সব ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করছেন। আলোকিত বাংলাদেশ গড়ার পথে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তেমনি একজন আলোর পথের দিশারি হলেন নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের খালিশা বেলপুকুর গ্রামের জাহানারা বেগম (৫১)।

তিন সন্তানের জননী জাহানারা দরিদ্রতার কারণে খুব বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারেননি। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে তার বিয়ে হয়ে যায়। এরপর আর পড়াশোনার সুযোগ হয়নি। স্বামী-সংসার নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অন্যসব নারীর মতো তাকেও মাথানিচু করে থাকতে হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি সোচ্চার হয়ে ওঠেন। সময়ের সঙ্গে স্বনির্ভরতা অর্জন করেন। তারপর আর পেছনে ঘুরে তাকাতে হয়নি জাহানারকে। এখন তিনিই খালিশা বেলপুকুর গ্রামের অস্বচ্ছল নারীদের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা।

জাহানারা বেগম এখন তার এলাকায় বাল্যবিবাহ রোধে কাজ করে যাচ্ছেন। বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে গ্রামবাসীকে অবহিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সেই সঙ্গে গ্রামের মেয়েদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে অভিভাবক সমাজকে জোর আহ্বান জানাচ্ছেন। সেই সঙ্গে নিরক্ষরমুক্ত গ্রাম গড়তে অক্ষরজ্ঞানহীন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের মাঝে তিনি অক্ষরদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। এর ফলে এখন খালিশা বেলপুকুর গ্রামে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামের সহজসরল স্বভাবের মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরজমিনে খালিশা বেলপুকুর গ্রামের সেতুবন্ধন পাঠাগারে গিয়ে দেখা যায়, জাহানারা বেগম পাঠাগারে আগত গ্রামের শিশু-কিশোরদের মাঝে বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করছেন। তাদের আরো বেশি বেশি বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি নিজেও এই পাঠাগারে নিয়মিত আসেন। বই পড়েন, পত্রিকা পড়েন। দেশ ও দেশের বাইরের যাবতীয় খবরাখবর রাখেন। তার মতে, নিজেকে একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে বই পড়ার বিকল্প নেই।

এছাড়াও তিনি গ্রামের নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছেন। ২০১৮ সালে ৫০ জন নারীকে নিয়ে সেতুবন্ধন মহিলা উন্নয়ন সমিতির যাত্রা শুরু করেন। বর্তমানে জাহানারা বেগম এই সমিতির সভাপতি। এই সমিতির মাধ্যমে গ্রামের নারীরা যেমন তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় একত্রিত করতে পারছেন। তেমনি সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা উত্পাদনমুখী কাজে লাগাতে পারছেন। পাশাপাশি সমিতির মাধ্যমে তিনি পাড়া-মহল্লায় মাদক ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করছেন। গ্রামকে কুসংস্কারমুক্ত করতে সমিতির পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। এর ফলে জাহানারা বেগমের হাত ধরে পথচলা সেতুবন্ধন মহিলা উন্নয়ন সমিতি এখন গ্রামের নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে ওতপ্রতভাবে ভূমিকা রাখছে।

জাহানারা বেগমের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ‘এ দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, সংসদের স্পিকার সবাই নারী। কিন্তু তার পরও আমাদের দেশের গ্রাম অঞ্চলের সমাজব্যবস্থার কারণে নারীরা এখনো অনেক পিছিয়ে। যার ফলে গ্রামের নারীরা কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না।’ তিনি নারীশিক্ষার ওপর জোর দিয়ে আরো জানান, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে যাবতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীদেরও ভূমিকা রাখতে হবে।