আজকে জানো

একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ১৯:৫৩

ভূমিকা: ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’ একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাতীয় জীবনে এক গৌরবময় ও ঐতিহ্যবাহী দিন। বাঙালির জাতীয় জীবনের সকল চেতনার উত্স হচ্ছে এ দিনটি। বাঙালির গৌরব ও বেদনার ইতিহাস জড়িয়ে আছে  এ দিনটির সাথে।

                                      

একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক পটভূমি: বাংলা ভাষার ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামের নামই একুশে ফেব্রুয়ারি। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট তত্কালীন ভারতবর্ষ দুভাগে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান। প্রায় দুশো বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাও বাঙালির জন্য সুফল বয়ে আনেনি। ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানের তত্কালীন গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার কার্জন হলের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঘোষণা করেন, “Urdu and Urdu shall be the only state language of Pakistan.” অর্থাত্ উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু বাংলার জাগ্রত জনতা জিন্নাহর এ স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি। বাঙালির লাখো কণ্ঠ সোচ্চার হয়ে তখন প্রতিবাদ করেছে। এরপর ১৯৫২ সালের ৩০শে জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনও এক জনসভায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জোরালো ঘোষণা দেন। ফলে ছাত্রদের মধ্যে শুরু হয় ধর্মঘট পালন। ধীরে ধীরে এ আন্দোলন সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ২১শে ফেব্রুয়ারি পরিষদ ভবনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত হয়।

 

সরকার ছাত্রদের এ আন্দোলনকে নস্যাত্ করার জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু এ আন্দোলনের ওপর সরকার যতই দমননীতি চালাতে থাকে আন্দোলন ততই প্রকট আকার ধারন করে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করা হয়। এ আন্দোলনকে প্রতিহত করতে পুলিশ মেডিকেল কলেজের সামনে ছাত্রদের ওপর বেপরোয়া গুলি ছোঁড়ে। পুলিশ নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর বন্দুক, বেয়নেট, টিয়ারগ্যাস, লাঠিসোঁটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছাত্ররাও পুলিশের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ফলে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরো অনেকে নিহত হন। এ হত্যাকাণ্ডের কথা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে সমগ্র বাংলাদেশ বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। ফলে বিক্ষুব্ধ জনতার সামনে আতঙ্কিত সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

 

স্বীকৃতি: পৃথিবীর মানুষের কাছে আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ফলে পৃথিবীর সব ভাষাভাষী মানুষ এখন এ দিনটাকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকে।

 

জাতীয় চেতনায় একুশ: একুশে ফেব্রুয়ারির প্রেরণা থেকেই পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থান ঘটে। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার বাঙালির সংগ্রামচেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ফলে বাঙালির মধ্যে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটে, যা পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশেষভাবে কার্যকরী ছিল। মূলত একুশের চেতনাই বাঙালিকে পরবর্তী সব সংগ্রামের প্রেরণা যুগিয়েছে।

 

উপসংহার: একুশ আমাদের গর্ব, অহংকার এবং বেদনাদায়ক অধ্যায়। তাই আজ এ কথা সর্বজনবিদিত যে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভাষা ‘বাংলা’ ততদিন থাকবে, যতদিন পৃথিবীর মানচিত্র থাকবে।