ক্যাসিনোবিরোধী চলমান অভিযানে ধরপাকড়ের মধ্যেই হঠাত্ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার, সরকারের পদত্যাগ ও জাতীয় সরকার গঠনের দাবি সামনে এনেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এমনকি জাতীয় সরকারের একটি রূপরেখাও উপস্থাপন করেছেন ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব। একাদশ সংসদ নির্বাচনের কিছুদিন পর থেকেই চুপ হয়ে যাওয়া ঐক্যফ্রন্ট অনেকটা হঠাত্ করে নীরবতা ভেঙে এসব দাবিতে সোচ্চার হওয়ায় বিষয়টি নতুন চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। বিশেষ করে, চলমান অভিযান এবং চারদিকে নানা গুজব-গুঞ্জনের মধ্যে সংসদ ভেঙে দিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের দাবিতে ঐক্যফ্রন্টের নড়েচড়ে ওঠার ভেতরে এক ধরনের রাজনৈতিক রসায়ন খোঁজার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। তবে সংসদ ভেঙে নতুন নির্বাচনের পক্ষে থাকলেও জাতীয় সরকার গঠনে সায় নেই বিএনপির।
৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনের কিছুদিন যেতে না যেতেই নীরব হয়ে যায় গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। কোনো কর্মসূচি তো ছিলই না, এমনকি ফ্রন্টের শরিক ও নেতারাও ছিলেন পরস্পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কিন্তু গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের ঠিক ১০ দিনের মাথায় ২৮ সেপ্টেম্বর অনেকটা আকস্মিক গণমাধ্যমে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে একটি বিবৃতি দেন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া। বিবৃতিতে বর্তমান সরকারকে ‘অবৈধ’ আখ্যায়িত করে অবিলম্বে পদত্যাগের দাবি জানানো হয়। সরকারের পদত্যাগের পাশাপাশি একটি জাতীয় সরকার গঠনেরও দাবি জানায় ঐক্যফ্রন্ট। বিবৃতিতে দুর্নীতি, লুটপাট তদন্তে একটি জাতীয় কমিশন গঠনেরও দাবি জানিয়ে বলা হয়, ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত শাসন-প্রশাসন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, সাংবিধানিক-গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনর্বহাল ও দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এ দাবি সরকারের মেনে নেওয়া উচিত।’ ঠিক একইদিন পৃথক এক বিবৃতিতে যতদ্রুত সম্ভব সংসদ ভেঙে দিয়ে ও পদত্যাগ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পুনর্নির্বাচনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সরকারের প্রতি দাবি জানান বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দল শরিক এলডিপি সভাপতি ও জাতীয় মুক্তিমঞ্চের সমন্বয়কারী ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। বিবৃতিতে অলি আহমদ বলেন, ‘অন্যায়কারী এবং জুলুমবাজদের ধ্বংস অনিবার্য। পাপের ভারে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হবে। এ সরকারের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।’
সরকারকে পদত্যাগ করে জাতীয় সরকার গঠনের জন্য ঐক্যফ্রন্টের দাবি এবং সংসদ ভেঙে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে অলি আহমদের আহ্বানের প্রেক্ষিতে পরদিন ২৯ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘সংসদ ভেঙে দেওয়া, সরকারের পদত্যাগ ও জাতীয় সরকার গঠনের দাবি কি মামার বাড়ির আবদার!’
ড. রেজা কিবরিয়ার স্বাক্ষরিত ২৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঐ যৌথ বিবৃতিতে তিনটি দাবি জানানো হয়। সেগুলো হলো- বর্তমান ‘অবৈধ’ সরকারকে পদত্যাগ করে জাতীয় সরকার গঠন, খালেদা জিয়াসহ সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তিসহ বিদ্যমান রাজনীতি ও শাসনতান্ত্রিক সংকট নিরসনে আন্দোলনরত রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে নিয়ে জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে পথ নির্ধারণ এবং বর্তমান সরকারের গুম-খুনসহ রাতের আঁধারে ভোট ডাকাতি এবং দুর্নীতি-লুটপাট তদন্তে গ্রহণযোগ্য জাতীয় কমিশন গঠন।
জাতীয় সরকার গঠনের দাবিতে শুধু বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি ঐক্যফ্রন্ট। গত ৪ অক্টোবর ঢাকায় জেএসডি আয়োজিত ‘বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জাতীয় সরকারের অপরিহার্যতা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় জাতীয় সরকারের রূপরেখাও তুলে ধরেন জেএসডি সভাপতি আ স ম রব। রূপরেখায় রব বলেন, ‘বিদ্যমান অবৈধ সরকারের পদত্যাগের পর সাংবিধানিক শূন্যতা ও সংকট পূরণ করবে জাতীয় সরকার। জাতীয় সরকার গঠন হবে রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সমাজ ও বুদ্ধিজীবী শক্তিসমূহের সংলাপের মাধ্যমে। জাতীয় সরকার রাষ্ট্রের ধ্বংসপ্রাপ্ত তিনটি মৌলিক স্তম্ভকে পুনরুদ্ধার-পুনর্গঠন করার উপায় নির্ধারণ করবে। এছাড়া গণতান্ত্রিক-শাসনতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যে সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাবনা উত্থাপন করবে জাতীয় সরকার।’
জেএসডির ঐ আলোচনা সভায় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, ‘দেশের অবস্থা নিয়ে সবাই গভীর উদ্বিগ্ন। এ সরকারকে আমরা কেউ ভোট দিইনি। সরকার দেশের শাসনব্যবস্থা ষোলআনাই নষ্ট করে দিয়েছে। তাদের এ কর্মকাণ্ডের জন্য আমরা তাদের প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য। এ নিয়ে কারোই দ্বিমত নেই।’
ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ কয়েক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারের পদত্যাগ ও জাতীয় সরকার গঠনের দাবিতে ঐক্যফ্রন্ট নতুনভাবে কর্মসূচি প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে আগামী ১৩ অক্টোবর ফ্রন্টের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠেয় আলোচনা সভার মূল এজেন্ডা হিসেবে রাখা হচ্ছে জাতীয় সরকারের তত্ত্বকে। জাতীয় সরকারের রূপরেখা নিয়ে আলোচনার জন্য সভায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট নাগরিকদেরও আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে আ স ম রব বলেন, এ সরকারের পদত্যাগ এবং একটা জাতীয় সরকার ছাড়া বর্তমান সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠেয় আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে আগামীদিনের করণীয় ঠিক করবে ঐক্যফ্রন্ট। ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, গত ১০ বছরে লুটপাটের মহোত্সব সৃষ্টি করেছে এ সরকার। মানুষ ভেতরে ভেতরে ক্ষেপে গেছে, কিন্তু কিছু বলতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট শিগিগরই সিদ্ধান্ত নেবে।
তবে ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শরিক দল বিএনপির কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি দলগতভাবে জাতীয় সরকার গঠনের তত্ত্বে বিশ্বাস করে না। বিএনপির দাবি সুস্পষ্ট, তা হচ্ছে— সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। জানা গেছে, জাতীয় সরকার ইস্যুতে মতপার্থক্যের কারণেই রবিবার ড. কামাল হোসেনের চেম্বারে অনুষ্ঠিত ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে বিএনপির কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।
