শেরপুরে গ্রামবাংলার স্বকীয় রূপের এমন কিছু নিদর্শন পাওয়া যাবে, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। প্রথমেই ধরা যাক তিনানির হাটের কথা। সপ্তাহে দুদিন হাট বসে এখানে, তিনানির হাটের প্রবেশ পথেই দেখা মিলবে গাছ আলুর। শিমুল গাছের সদৃশ এক রকমের ডালা মাটিতে পুঁতে রাখলে গাছ জন্মে এবং তার মূলে মাটির নীচে এক রকমের আলু জন্মে। যাকে গাছ আলু বলে। এই আলুগুলো কাঁচা এবং তরকারি রান্না করেও খাওয়া যায়। দুই কদম ফেলে হাটের দিকে প্রবেশ করলেই এক সারি মানুষ মুখোমুখি বসে আছেন। আসলে এরা চুল কাটছেন, এরা নরসুন্দর। আরো সামনে গেলে পশু আর পাখির হাট। অভিনব পদ্ধতিতে মোরগ-মুরগি, কবুতর, হাঁস বেচতে আনা হয়েছে। কলার খোলের খাঁচা বানিয়ে তার মধ্যে করে হাটে নিয়ে আসা হয়েছে। আছে বাঁশের প্রয়োজনীয় নানা জিনিস।
বাজার থেকে বের হলে পথে আপনার চোখে পরবে এক্কা গাড়ি। একটা ঘোড়ায় টানা গাড়ি। পথ শেষ করে যখন বারোমারীতে পৌঁছেছি, তখন দুপুর ছুঁই ছুঁই। দূর থেকেই ঠাহর করা যায় মেলার আবহ। খেলনা বেহালার সুরের মুর্ছনায় মুখরিত হচ্ছে। আরো একটু সামনে যেতেই মেলা শুরু। আছে বাঁশের নানা জিনিসপত্র, এখানকার বিভিন্ন আকারের বাঁশের খাঁচিগুলো আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। কাঠের তৈজসপত্রও আছে। আছে বেত, লোহার জিনিসপত্র। আর আছে তিনানি কুমারবাড়ির হাঁড়ি-পাতিল-খেলনা।
বারোমারী শেরপুরের শেষ মাথায়। একেবারে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে। এই এলাকাটা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী গারো অধ্যুষিত। কাজেই মেলার শেষ মাথায় আছে গারোদের নিজস্ব বাজার। এখানে পাওয়া যাচ্ছে বালতিতে রাখা কুচিয়া, কুচিয়া শুকানো শুঁটকি। এইমাত্র জবাই করা শুকরের মাংস, পাহাড়ি আলু। আছে গারোদের জন্য হোটেল। দুপুর শেষ প্রায় পেট খালি। হোটেল চোখে পড়তেই খিদাটা আরো চনমন করে উঠল। খাবারের হাঁড়ির ঢাকনা খুলে দেখছি। চাক চাক তেলতেলে রান্না করা মাংস, সঙ্গে আলু। দেখেই খিদে কয়েকগুণ বেড়ে গেল। সেই গতকাল থেকে ভাত খাওয়া হয়নি। হোটেলের ছেলেটা বলতে শুরু করল, ‘এটা শুকরের মাংস, এটা কচ্ছপ, এটা কুইচ্ছা, এটা কুইচ্চার শুঁটকি, এটা ফার্মের মুরগির মাংস।’ থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘থাক বাবা আর বলতে হবে না। খিদা চলে গেছে।’ এখন উপায়! আশপাশে কোনো হাট বাজার থাকলে খুঁজে কিছু খাবার বের করা যেতো। এখন দেখি না খেয়ে মরতে হবে।
কিছুদূর হাঁটতেই পথের পাশে একটা বাড়ি পাওয়া গেল। বাড়ির গিন্নি রান্নার তৈয়ারি করছেন। গিয়ে কিছুটা ভাব জমানো গেল প্রথমে। আমার সঙ্গে আছেন শিল্পী জাহিদ হোসেন। জাহিদ ভাই ‘খালা খালা’ বলে পুরাই পটিয়ে ফেললেন। খালার হাতে একশ টাকার একটা নোট দিয়ে একটু ঘুরে আসার কথা বলে বেরিয়ে পড়লাম। খালার ব্যবহারে মনে হলো এই রকম ঘটনার তার কাছে খুবই পরিচিত।
পাহাড় বেয়ে উঠে গেলাম গারো পাড়ায়। মাটির ঘর, বাড়ির আঙ্গিনায় লম্বা করে চিরে, রোদে শুকাতে দেওয়া কুইচ্চার শুঁটকি। ঘরের বারান্দায় আছে ঢেঁকি। মাটির ঘরের দাওয়ায় বাঁশের খাঁচায় ঝুলিয়ে রাখা শালিক পাখি। ধান তোলার মৌশুম, সবাই ধান কাটা, মারাই আর ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত। তবে পুণ্য যাত্রাকে কেন্দ্র করে প্রতি বাড়িতেই সাজ সাজ রব। ছেলেমেয়েরা নতুন জামা কাপড় পরে ঘুরছে। বড়োরা তরা করছে, কখন কাজ শেষ করে পুণ্য যাত্রায় যোগ দেবে। পাহাড় ঘোরা শেষ করে ফিরে এলাম খালার বাড়ি। খালা খুব যত্ন করে চৌকির ওপর নতুন শীতল পাটি বিছিয়ে আমাদের খেতে দিলেন। খালার রান্না করা শাক, মুরগির মাংস আর ডাল দিয়ে খাওয়া শেষ করে আশ্রমের পথ ধরলাম।
শেরপুরের নালিতাবাড়ির বারোমারী তীর্থস্থানে প্রতি বছর বসে পুণ্যবন্দনা। সারা দেশের ক্রিশ্চিয়ানরা একত্রিত হয় এই বারোমারীতে। পুণ্যযাত্রায় এবছর চিত্রায়িত হবে যিশুর পবিত্র ক্রুশ বহনের কাহিনি। ময়মনসিংহ থেকে কুশিলবরা এসেছে নাট্য চিত্রায়িত করতে। রাজা, রাজার লাঠিয়াল বা সৈন্য যাদের হাতে তলোয়ার ও ডাল, গায়ে লাল পোশাক। যিশু ও তার সঙ্গীরা। এই হলো চিত্রণের কুশীলবগণ। আর চারদিকে হাজার হাজার মানুষ অবলোকন করার জন্য দাঁড়িয়ে। ঘটনা শুরু।
জঙ্গলের এক প্রান্তে যিশু তার সঙ্গীদের নিয়ে সত্যের পথ চর্চা করছেন। এমন সময় রাজা তার সৈন্য বাহিনী নিয়ে সেই পথেই যাচ্ছিলেন। রাজার এক সৈন্য এসে খবর দিল সামনের বনে যিশু তার সত্যধর্ম প্রচার করছে। তার রাজ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরির কাজ করছে যিশু, রাজা রেগে গিয়ে হুকুম দিলেন ওকে ধরে নিয়ে এসো। রাজার পাইক পেয়াদারা হাত পিছ মোড়া করে বেঁধে যিশুকে রাজার সামনে হাজির করল। রাজা হাজারো মানুষের সামনে যিশুর অপকর্মের কথা প্রচার করে, তাকে হত্যা ঘোষণা দিলেন। তিনি বললেন যিশু যেহেতু ক্রুশের বন্দনা করে তাকে ক্রুশে চড়িয়ে মৃত্যু কার্যকর করা হবে। রাজার হুকুমে সৈন্যদল দড়ি দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে, চাবুক দিয়ে, তলোয়ার দিয়ে আর বল্লম দিয়ে মারতে মারতে মরুভূমিতে নিয়ে গেল। পথে মাতা মরিয়ম ছেলেকে পানি খাওয়াতে গেল, রুমালে চোখ মুছিয়ে দিতে গেল, সৈন্যরা বৈমুখ করল। মরিয়ম ও তার সহযোগীরা সেই রুমালে যিশুর মুখের ছবি দেখতে পেলেন। সকলে কেঁদে যারে যার, তবুও রাজার দয়া হলো না। অবশেষে বসন সব খুলে পবিত্র ক্রুশে পেরেক দিয়ে হাত পা গেঁথে ঝুলিয়ে রাখা হলো। মৃত্যু নিশ্চিত হলে তার মা মরিয়মের কাছে পাঠানো হলো মরদেহ।
কাহিনি চিত্রায়ণ শেষ করে সৈন্যরা যিশুর বড় মূর্তির সামনে ক্ষমা চাইলেন কল্পিত যিশুকে আঘাত ও হত্যা করার জন্য। কাহিনিচিত্র পরস্ফুিটনের প্রয়োজনে এটা তাদের করতে হয়েছে।
সন্ধ্যায় বাকি ছিল আরো একটা যাত্রা। যাকে পুণ্য যাত্রার মূল আনুষ্ঠানিকতা বলা চলে। বারোমারী আশ্রমের গেট থেকে মোমবাতি হাতে নারী-পুরুষ-যুবা সকলে দুইটি পাহাড় ঘুরে স্ট্যাচু যিশুর পদতলে গিয়ে সেই মোমবাতি অর্পণ করেন। এই সময় তারা মুখে উচ্চারণ করতে থাকেন।
ধন্যা ধন্যা মাগো
এই ভব মাঝে
আরো ধন্যা তুমি
ভবলীলা মাঝে।
আবার—
প্রণাম মারিয়া প্রাসাদ কন্যা
প্রভু তোমার সহায়
তুমি নারী কুলের ধন্যা
তোমার গর্ভের ফল
যিশু হয়ে ধন্য।
