হ্যারল্ড পিন্টারের খোঁজে

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ১৯:২৪

হ্যারল্ড পিন্টারের খোঁজ যদি কেউ নিতে চান তাহলে স্বয়ং তার যাপিত জীবনটাই যথেষ্ট হবে। পিন্টারের নিজের জীবনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমন সব গল্প, যা থেকে সহজেই ছেঁকে ফেলা যায় তাকে। এগুলো এখন সব গল্পের পর্যায়ে উঠে এসেছে। অসংখ্য গল্প তিনি নিজেই বলেছেন বিভিন্ন সময়ে। নিজের বিরুদ্ধে নিজেই এমন সব স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, যা তারই চরিত্রের একান্ত অংশ।

সান্দিনিস্তা আন্দোলনের সমর্থক এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির গোড়া সমালোচক পিন্টার আশির দশকের মাঝামাঝি একবার নিকারাগুয়া থেকে ফিরছিলেন। ফেরার পথে তাকে মিয়ামি হয়ে আসতে হয়েছিল। মহা শয়তানের মাটিতে রাতভর কাটানো তার জন্য ছিল চরম বিরক্তির, যদিও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় ছিল না।

‘সুতরাং মায়ামি বিমানবন্দরে হাজির হই এবং বিশালদেহী এক মহিলাকে ইমিগ্রেশন ডেস্কে দেখি। মনে মনে ভাবছি আমি, সে আমার পাসপোর্ট দেখে বলতে যাচ্ছে, ‘নিকারাগুয়ায় কী করছিলে তুমি?’ উত্তরও সাজিয়ে রেখেছিলাম, ‘তাতে তোমার কী? ধীরে ধীরে ডেস্কের কাছে হাজির হয়ে আমি পাসপোর্ট তুলে ধরি এবং ডেস্কের মহিলাটি বলে ওঠে, ‘আপনি কি হ্যারল্ড পিন্টার?’ হতচকিয়ে আমি বলি, ‘হ্যাঁ’। মহিলাটি বলে, ‘আমেরিকায় তোমাকে স্বাগতম।’

সমস্যা খুঁজে বেড়ানো পিন্টারের চিরাচরিত অভ্যাস এবং তার জীবনের প্রতিদিনকার অভিজ্ঞতা শুষে নাটকের উপাদান উন্মোচন করা ছিল তার স্বভাব। রাশান-ইহুদি যুগলের সন্তান হিসেবে অ্যান্টিসেমেটিক মনোভাবের মুুখোমুখি তাকে হতে হয়েছে। যুদ্ধের পর তিনি ছিলেন কড়া সমালোচক। তার পরিবার এটা থেকে তাকে বিরত থাকতে যথেষ্ট চেষ্টা করেছিল। কিন্তু, তার ইংরেজ গুরু, যাকে পিন্টার রীতিমতো শ্রদ্ধা করতেন, একবার বলেছিলেন, ‘সে যদি জেলে যেতে চায় তাহলে সে যাবেই, তা আপনার পছন্দ হোক বা না হোক।’ সুতরাং যথারীতি পিন্টার একবার কোর্টে গিয়েছিলেন এবং জরিমানা গুনতে হয়েছিল তাকে।

ইরাক আক্রমণের সময় এ অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে আচ্ছন্নময় ও অসাধারণ এক প্রচারণা চালিয়েছিলেন তিনি। তার আগে, বলকান এলাকায় ন্যাটো অপারেশনেরও বিরুদ্ধাচরণ করেন তিনি। একসময় বলেছিলেন, ‘যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ব্লেয়ারের বিচার হওয়া উচিত।’ তার পরিণত হয়ে ওঠার সময়কার কথা প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন, ‘নিজেকে পছন্দমাফিক উপায়ে বিপদগ্রস্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি।’

হ্যাঁ, তখন থেকেই তিনি এসবেরই মধ্যে ছিলেন। তীব্র রস ও আক্রোশ মিশিয়ে তিনি যা লিখেছেন, তাতে সেটাই প্রতিধ্বনিত হতো বারবার। তিনি সবসময়ই ছিলেন হ্যারল্ড পিন্টার, নিজের শো’র তারকা, খুবই একা কিন্তু ভয়াবহভাবে খাঁটি, সত্যিকারের এক শিল্পী।

ইংলিশ মঞ্চ প্রথায় মহত্তম সৃষ্টিগুলোর মত, যেখানে তিনি ছিলেন জীবন্ত উপাদান, পিন্টার নাটক লেখার আগেই ছিলেন একজন কবি। তার প্রায় সবগুলো থিম, যেগুলো তার প্রথমদিকের নাটক যেমন ‘দ্য বার্থডে পার্টি’, ‘দ্য কেয়ারটেকার’, ‘দ্য হোমকামিং’ থেকে স্বতন্ত্র; সেগুলো ছিল যুদ্ধপরবর্তীদিনগুলো নিয়ে। অদ্ভুত ও দারুণ গীতিময় তার প্রথম উপন্যাস ‘ডোয়ার্ফস’ এগিয়ে গেছে বিদ্রোহী এক বইপাগল কিশোরকে কেন্দ্র করে, যে তার বন্ধুদের নিয়ে হ্যাকিনির রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, সমমনা এ চক্রের সবাই শিল্পী হতে চায় এবং সবচেয়ে আরাম বোধ করে চালবাজ ও বহিরাগতদের সঙ্গে সময় কাটাতে।

যুবক বয়সে কবিতা প্রকাশের পাশাপাশি পেশাজীবী অভিনেতা হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি। ডেভিড ব্যারন এই মঞ্চনাম নিয়ে তিনি পঞ্চাশের দশকে রেপারটরি (যেসব নাটকের দল সবসময় নতুন নাটক ও অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে হাজির হয়) গোষ্ঠীতে কাজ করতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সবধরনের চলচ্চিত্র, টিভি চিত্রনাট্যে চুম্বক অংশে আবির্ভূত হতেন তিনি। তাছাড়া নিজের নাটক নিজেই পরিচালনা করতেন এবং তাতে অংশও নিতেন। শেকসপিয়ারের মতো দর্শকদের সামনে হাজির হওয়ার ম্যাজিক তিনি আত্মস্থ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার প্রথম নাটক ‘দ্য রুম’ দর্শক ও সমালোচকদের খেপিয়ে তুলেছিল। এ নাটকে কী এমন ছিল যা তাদের খেপিয়ে তুলেছে, জিজ্ঞেস করলে তার উত্তর ছিল, ‘ককটেল কেবিনেটের নিচে বেজির খোঁজ করুন।’

মঞ্চনাটক যারা দেখেন, তাদের ক্ষেত্রে নতুন একটি চরিত্র বা ব্যক্তিত্ব খুঁজে পেতে স্বাভাবিকভাবেই বেশকিছু সময় লেগে যায়। কিন্তু বেশ দ্রুতই পিন্টার দর্শকদের মাতিয়ে তোলেন। ষাটের দশক থেকে তার কাব্যিক নাটকগুলো মঞ্চস্থ হতে থাকলে অডিটোরিয়ামগুলো থাকত দর্শক-ভর্তি।

পিন্টারের দর্শন বেড়ে উঠেছে স্যামুয়েল বেকেটের অনুপ্রেরণায়। তাকে তার গুরুও বলা যায়। তবে, ‘হোমকামিং’-এ আমরা তার নতুন মতবাদ দেখতে পাই এবং বেকেটের তুলনায় সম্ভবত আরো প্রশ্নমূলক কাজ ছিল ‘বিটুইন দ্য নোন অ্যান্ড দ্য আননোন, হোয়াট এলস ইজ দেয়ার।’

যদিও তার কাজগুলো বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে, তারপরও তিনি ছিলেন একান্ত একজন ইংরেজ এবং একইসময় সমাজের নানা অসঙ্গতি প্রসঙ্গে সবসময় ছিলেন সোচ্চার। উদাহরণ হলো—ক্রিকেট। খেলোয়াড় ও দর্শক হিসেবে তিনি ক্রিকেট খুবই পছন্দ করতেন। সাধারণভাবে তিনি এটাকে দেখতেন, ‘যুদ্ধের দারুণ সভ্য এক উপায়’ হিসেবে। আশ্চর্যজনকভাবে, তার সহজাত প্রবণতা ছিল নিয়ম ভাঙার। তবুও খেলার নিয়ম তিনি মেনে নিতেন একথা বলে যে, ‘সবসময় কিছু ভালো ও কিছু খারাপ নিয়ম থাকে।’

সত্তরের দশকে তার কাছে ক্রিকেট ছিল মঞ্চের অনুকরণে সৃষ্টি কোনো খেলা, যেখানে তিনি আয়েশ বোধ করতেন। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর যা যা তৈরি করেছেন, তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ খেলা হলো ক্রিকেট... যৌনমিলনের চেয়েও মহত্।’

মধ্যবয়সে ‘নো ম্যান’স ল্যান্ড’ ও ‘বিট্রেয়াল’-এর মতো অসামান্য কাজ তিনি হাজির করেন। আশির দশকে, অ্যান্তোনিয়া ফ্রেজারকে বিয়ের পর, একটু বেশি রাজনৈতিক হয়ে ওঠেন তিনি। থেচারের কঠোর সমালোচনাসহ সালমান রুশদির পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।

এরপর মঞ্চে প্রায় এক দশক কোনো কাজ করেননি তিনি। কিন্তু কুদ্দিদের বিরুদ্ধে অভিযান তাকে ‘মাউন্টেন ল্যাঙ্গুয়েজ’ নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের নাটক লিখতে উদ্বুুদ্ধ করে। তবে, পিন্টারের নৈপুণ্য মোটাদাগে রাজনৈতিক নাটকের ক্ষেত্রে তেমনটা খাপ খায় না। তারপরও তিনি একের পর এক লিখে যান ‘মুনলাইট’, ‘অ্যাশেজ টু অ্যাশেজ’, ‘সেলিব্রেশন’ ইত্যাদি নাটক। পিন্টার বলতেন, ভালো লেখা তাকে উদ্দীপ্ত করে এবং বেঁচে থাকাকে সার্থক করে। কিন্তু তিনি যে শৈলীতে ভালো শব্দ লিখতে অভ্যস্ত ছিলেন, রাজনৈতিক লেখালেখির ক্ষেত্রে তেমনটা খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ে যান। পরে একসময় তিনি বলেই বসেন, আর কোনো নাটক লিখবেন না।

২০০৩ সালে ক্যান্সার ধরা পড়ার পর কিছুটা বদলে যান তিনি। খুব বেশি হাসিখুশি থাকতেন না তিনি, কিন্তু মৃত্যুর ব্যাপারে আরো বেশি সচেতন ও আরো বেশি বিচ্ছিন্নতাবোধ তাকে ঘিরে ধরেছিল বলে স্বীকার করেন। মৃত্যুর আগে তার প্রধান বিবেচনা ছিল, তার ভাষায় ‘কেবল বেঁচে থাকা, বেঁচে থাকা, এখানে থাকা।’ কিন্তু গোটা জীবন যেভাবে কাটিয়েছেন তিনি, তাতে এই ভাষ্যটা তার জন্য কিছুটা বেমানানই ছিল।