শাহগুলের সিনেমা

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ১৯:২৫

লোকটি পাখির হাড় বিক্রি করে। দোকানটি অবস্থিত শহরের শেষ মাথায়। ভারি চশমা পরে সে অপেক্ষা করে ক্রেতার জন্য। পাখিদের কেটে-কুটে হাড় বিক্রি করার ব্যবসা প্রথম শুরু করেছিল তার বাবা। সবাই বলে, পাখিদের অভিশাপে লোকটির বাবা যুবক বয়সে মরে গিয়েছিল। পাখির হাড় গুঁড়ো করে দুধে মিশিয়ে খেলে, দূর হয়ে যায় চামড়ার বলিরেখা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, এ শহরের কারো অনন্ত যৌবনের অধিকারী হওয়ার শখ নেই। দোকানটি খালি পড়ে থাকে। মধ্যবয়স্ক দোকানদার তবু আশা করে, তার ভাঁজহীন চামড়া দেখে কেউ একদিন বিশ্বাস করবে তুকতাকে। তার ভাগ্য ফিরে যাবে।

একদিন দোকানে আসেন এক সময়ের বিখ্যাত চিত্রনায়িকা শাহগুল। লোকটি ছোটবেলায় ‘চিত্রালী’ পত্রিকাতে নায়িকার একটি ছবি দেখেছিল। এক চোখ টিপে তিনি হাসছিলেন। যৌবনে টিকেট কেটে সিনেমা হলে শাহগুলকে দেখতে যেত লোকটা। নায়িকা কোমড় বেঁকিয়ে কখনো সাপ হতো। জমিদার কন্যা সেজে চাবুক দিয়ে রক্তাক্ত করে দিত প্রজার পিঠ। নায়ক প্রজা কিন্তু শেষমেশ জমিদার কন্যার চাবুক চেপে ধরে চুমু খেত! তারপর ‘তুমি আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয়’ গানের তালে তালে দুইটা গোলাপ ফুলের ঠোকাঠুকি!

প্রাক্তন চিত্রনায়িকার চোখে আজকে সানগ্লাস। রিকশা থেকে নেমে মাথায় ঘোমটা দেন তিনি। তার দরকার নেই অবশ্য! এখনকার যুবকেরা তাকে চেনে না। লোকটি ড্রিম গার্লকে দেখে চমকে ওঠে। দুটো কারণে। এক, এই দোকানে ক্রেতার উপস্থিতি দুর্লভ। আর দুই, স্বপ্নকন্যা এখন মেদবহুল বয়স্কা নারী।

পাখির হাড়ের খোঁজ শাহগুল পেয়েছিলেন গত সপ্তাহে। সেদিন একজন বিখ্যাত সাংবাদিক অনেকদিন পরে তার বাড়িতে এসেছিল। সাংবাদিকের সাথে শাহগুলের পরিচয় অনেক আগের। তখন সিনেমা হলে লাইন দিয়ে দর্শক ‘বীণা বাজায় নাগিন’ দেখত। সুপার হিট ফিল্মস্টারের ইন্টারভিউ নিতে এসে সাংবাদিকটি প্রথমদিন কথা হারিয়ে ফেলেছিল। নায়িকার শরীরে হাসনাহেনা ফুলের গন্ধ। বাড়িতে ফেলে আসা মসলার গন্ধমাখা স্ত্রীকে মনে করে, সেদিন সাংবাদিকের কী ভীষণ মন খারাপ! পত্রিকার প্রথম পাতায় শাহগুলকে নিয়ে একের পরে এক সচিত্র সংবাদ ছাপিয়ে, নায়িকার নজরে পড়েছিল সাংবাদিক। কিছুদিনের মধ্যে একটি অখ্যাত পত্রিকাতে সম্পাদকের চাকরি পেয়ে গেল সে। টাটকা গসিপ ছাপাতে ছাপাতে অখ্যাত পত্রিকা অচিরেই প্রখ্যাত হয়ে ওঠে। প্রখ্যাত পত্রিকার প্রথম পাতা জুড়ে বৃষ্টিভেজা শাড়ি সামলাতে থাকে শাহগুল। নাভিতে ফোঁটা ফোঁটা পানি যেন পদ্মফুল! মাঝে মাঝে লাল লিপস্টিক দেওয়া ঠোঁট কামড়ে ধরে কামনামদির চোখের শাহগুল! যুবকেরা চুপি চুপি পত্রিকা কিনে বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখত তখন। সবাই ঘুমিয়ে গেলে বারবার স্বপ্নকন্যার ছবি দেখে ভিজে যেতে যেতে তারা কৃতজ্ঞ হূদয়ে ঘুমিয়ে যেত।

পরিচয়ের প্রথমদিকে চিত্রনায়িকা ড্রয়িংরুমে ইন্টারভিউ দিতেন। যুবতী শরীরের মিষ্টি ঘ্রাণে সাংবাদিক উত্তেজিত হতো। অবশেষে একদিন সাংবাদিক থেকে প্রেমিক পদে প্রমোশন পেয়েছিল সে। বেডরুমে ঢুকে শাহগুলের শরীর থেকে শিফনের শাড়ি কমলার খোসার মতো খুলে ফেলার যে স্বপ্ন ছিল তার, তা পূরণ হলো।

শাহগুল বিয়ে করেননি। বাজার ধরে রাখতে হলে, নায়িকাদের বিয়ে করার নিয়ম নেই। কিন্তু পুরুষের ঘামে ভেজা বিছানা-বালিশ কে না ভালোবাসে? তাই একজন কবিও বেডরুমে প্রবেশের অধিকার পেয়েছিল। ষোল বছর বয়স থেকে নায়কদের জড়িয়ে ধরে নাচতে শুরু করেছিলেন শাহগুল। প্রেমে পড়ার সময় ছিল না। সিনেমার সেটে প্রথম চুম্বন! এক ঘুষিতে নায়ক যেমন একশ খলনায়ককে ঘায়েল করে, প্রেমকে সেরকম এক অবাস্তব কিছু মনে হতো তার! তবু যখন শহরের প্রধানতম কবি এসে কঠিন বাংলাতে তার রূপের প্রশংসা করত, শাহগুলের খুব আনন্দ হতো। এদের কাউকে বিয়ে করে সংসারী হওয়ার ইচ্ছাও হয়েছে মাঝে মাঝে। কিন্তু বিয়ের প্রসঙ্গ এলে, প্রেমিকেরা গুটিয়ে যেত। ঘরের জন্য সুতির শাড়ি পরা মসলার গন্ধমাখা স্ত্রী মানানসই। লক্ষ পুরুষকে বুকের ভাঁজ দেখানো চিত্রনায়িকা সেখানে বেমানান!

শাহগুল ভেবেছিলেন, কিংবদন্তিতুল্য এক ভারতীয় নায়িকাকে অনুকরণ করে বেশকিছু ঘুমের ওষুধ খেয়ে মরে যাবেন। দেশে শোরগোল পড়ে যাবে! এতে তিনি ভালোবাসা না পাওয়ার কষ্ট ভুলবেন। কিন্তু সিনেমায় দস্যুরানির অভিনয় করলেও, আদতে তিনি ভীতু। তাই ঘুমের ওষুধ কেনার সাহস করতে পারেননি কখনো।

কয়েক বছর পরে একজন পরিচালক শাহগুলকে সিনেমাতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিলেন। প্রস্তাবটিতে নতুনত্ব না থাকলেও সিনেমার নাম নিঃসন্দেহে অভিনব ছিল! ‘মায়ের সম্মান’!

সেদিন আয়নায় তাকিয়ে, তিনি মুখের ভাঁজ দেখে কেঁদেছিলেন। মাখন চামড়ায় খসখসে কর্কশতা! সিঙ্গাপুর থেকে সংগ্রহ করলেন ফোলা ফোলা পুশ আপ ব্রা। বালিশ থেকে পুরুষের ঘামের গন্ধ শুকিয়ে গেল। প্রথমে যোগাযোগ বন্ধ করেছিল সাংবাদিকটি। পত্রিকার প্রথম পাতায় তখন ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ সিনেমার আঠারো বছর বয়সী টাটকা নায়িকার সাহসী ছবি! কিছুদিনের মধ্যে কবিটি নতুন কবিতা লেখা শুরু করে সদ্য সিনেমাতে আসা বিড়াল চোখের এক বিহারি নায়িকাকে নিয়ে। শাহগুল তবু হাল ছাড়লেন না। ফিরিয়ে দিলেন নায়কের মায়ের ভূমিকাতে অভিনয়ের প্রস্তাব। থাইল্যান্ড থেকে দামি ক্রিম এনে মাখলেন। নিয়মিত ব্যায়াম করা শুরু করলেন। তবু ধীরে ধীরে তার মুখ ভরে যায় মাকড়সার জালের মতো ভাঁজে। ব্লাউজের গলা দিয়ে বুকজোড়া জোর করে ওপরে টেনে তুললেও, নেই আগের সেই মন্ত্রমুগ্ধকর আভাস! পরিচালকদের ফোন আসে না আর!

প্রথমে গাড়িটি বিক্রি করলেন শাহগুল। পরিধানের জন্য তার প্রথম পছন্দ এখন বোরখা। মাঝে মাঝে ঘোমটা দিয়ে মাথা পেঁচিয়ে সানগ্লাস চোখে বাইরে বের হতেন। কাঁচা বাজারে গিয়ে বেছে বেছে লাল শাক কেনার জীবন খুব সাধারণ! দামি দামি শাড়ির খরচ নেই। মেকাপের ব্রাশে ধুলার স্তর! আলমারির প্রতিটি কোনায় খোঁজেন বিক্রয়যোগ্য অলংকার! শুধু বাড়িটি থেকে যায়। ব্যাংকের সঞ্চয় টিপে টিপে খরচ করে প্রাক্তন চিত্রনায়িকা বেঁচে থাকেন মসলার গন্ধমাখা একজন বয়স্কা নারী হয়ে। তখন তিনি আবারো ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার ব্যাপারটি বিবেচনা করলেন। যদিও এই পরিকল্পনা তাকে বাতিল করে দিতে হয়েছিল! আয়নার দিকে তাকিয়ে তিনি নিশ্চিত হলেন, একজন বিগতযৌবনা চিত্রনায়িকা মারা গেলে কোনো হইচই হবে না। বাড়ির সব আয়না কাপড় দিয়ে ঢেকে, শাহগুল বাস্তব থেকে পালাতে চাইতেন। সারাদিন বাড়িতে বসে থাকতে থাকতে কোমড়ের হাড় নড়বড়ে! অথচ এই কোমড় দুলিয়ে একদিন তিনি গেয়েছিলেন, ‘মধু ভরা যৌবন যায় যে একেলা/রসের বন্ধুরে তুমি কই চলিয়া গেলা?’।

দুঃসময়ে প্রাক্তন প্রেমিক সাংবাদিক দেখা করতে আসে। একজন বিস্মৃতপ্রায় চিত্রনায়িকাকে নিয়ে মর্মস্পর্শী প্রতিবেদন ছাপানোর উদ্দেশ্যে। শিরোনাম, ‘লাখো তরুণের স্বপ্নের নায়িকা শাহগুল এখন কোথায়?’! কিন্তু শাহগুলের বাড়িতে এসে সে দুঃখবোধ করে। সোফার ধুলো সরাতে সরাতে প্রতিবেদনের কথাটি জানায়। শাহগুল ঘাড় নেড়ে প্রাক্তন প্রেমিককে বলে, দুরারোগ্য কোনো ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে শুধুমাত্র তখনি পত্রিকাতে তার দুরবস্থার খবর ছাপা যেতে পারে। তার আগপর্যন্ত ফুরিয়ে যাওয়া নায়িকা হয়ে পত্রিকার প্রথম পাতাতে তিনি থাকবেন না!

সেদিন সাংবাদিক চলে যাওয়ার পরে, শাহগুল পত্রিকা পড়েন। পত্রিকাতে পাখির হাড়ের অনন্ত যৌবনা হওয়ার বিজ্ঞাপনে তার চোখ পড়ে। মরিয়া হয়ে রিকশা ডাকেন। গন্তব্য শহরের শেষ মাথা। চোখে সানগ্লাস। পরনে সাদা শাড়ি। মাথায় ঘোমটা। হঠাত্ দেখলে মনে হয়, স্বামীর কবর জিয়ারত করে একজন বয়স্কা বিধবা বাসায় ফিরছেন।

দোকানটিতে এসে তিনি সানগ্লাস খুলে ফেলেন। মাথা থেকে ঘোমটা সরিয়ে দেন। লোকটি চমকে চিত্রনায়িকাকে দেখে।

‘আপনি কি শাহগুল ম্যাডাম?’, প্রশ্ন করতে গিয়ে লোকটির গলা কেঁপে যায়। সেদিন লোকটির উচ্ছ্বাস শাহগুলকে স্পর্শ করে। অনেকদিন পর তার নিজেকে কাম্য মনে হয়। লোকটি জানতে চায়, ‘বীণা বাজায় নাগিন’ ছবিতে শাহগুল ম্যাডাম কীভাবে ঝুড়িভরতি সাপ হাতে নিয়ে নেচেছিলেন! পিস্তল চালিয়ে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার সময়ে তার কোমল মুখ অমন কঠিন হয়ে যেত-ই বা কীভাবে!

সুখের দিনের গল্প করতে করতে প্রাক্তন চিত্রনায়িকা একটি সুন্দর বিকেল কাটান পাখির হাড় বিক্রেতার সাথে। লোকটি তাকে বলে, শাহগুলের মতো রূপবতী নারী সে জীবনে আর দেখেনি! অনেকদিন পর রূপের প্রশংসা তাকে পাখির হাড়ের কথা ভুলিয়ে দেয়। সেদিন বাড়িতে এসে আয়না থেকে কাপড় সরিয়ে দেন তিনি। অনেক দিন পর নিজেকে তার সুন্দরীতমা মনে হয়।

পরদিন তিনি আবারও পাখির হাড় কেনার উদ্দেশে রিকশা ডাকেন। কিন্তু এবারো দোকানে গিয়ে ভুলে যান পাখির হাড়ের কথা। লোকটি সম্পর্কে তার জানতে ইচ্ছা হয়। চিরকুমার পাখি বিক্রেতা শাহগুলকে জানায়, গালের বাম পাশের কালো জড়ুলটির জন্য পছন্দের মেয়েটি লোকটিকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। প্রত্যাখ্যানের ভয় লোকটিকে এতটাই তাড়া করেছে যে, বিয়ে করার আর ইচ্ছা হয়নি। ঘরের দেয়ালে প্রিয় নায়িকার পোস্টারের দিকে তাকিয়ে সে রাতগুলো কাটিয়েছে।

শাহগুল মমতা অনুভব করেন। পাখির হাড় বিক্রেতার বাম গালের কালো জড়ুলে হাত বুলালে কী হয়?—এরকম এক প্রশ্ন তাকে তাড়া করে। লোকটিকে দুপুরের খাবার খাওয়ার দাওয়াত দেন। আচমকা সৌভাগ্যে ধুকধুক করে তাদের দুজনের বুক।

পরের দিন শাহগুল রান্না করেন আতপ চালের ঝরঝরে পোলাও। ডুবো তেলে বেগুন; কী চমত্কার মচমচে! ঝাল ঝাল মুরগির মাংস ভুনাতে দারুণ স্বাদ! পায়েশে বেশি করে চিনি মেশাতে তার খুব ভালো লাগে।

লোকটি নিমন্ত্রণে এসে হকচকিয়ে যায়। চোখের পানিতে পোলাও ভিজিয়ে বলে, এত আদর করে কেউ কখনো রান্না করে না একা মানুষদের জন্য! পাখির হাড় বিক্রেতাকে শাহগুলের বেডরুমে নিয়ে যেতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু তারপর তার মনে পড়ে যায় বিছানাতে লেগে আছে ঘাম। সাংবাদিক, কবি, চিত্রনায়ক এবং পরিচালকের ঘামে ভেজা বালিশে শুতে দিলে অপমান হবে কালো জড়ুলের!

একটি টিনের বাড়িতে শাহগুল রাতের খাবার খেতে যান পরের সপ্তাহে। সে রাতে বৃষ্টি হয় খুব! ঝড়ের রাতে তাকে বাসায় ফিরে যেতে লোকটি নিষেধ করে। টিনের বাড়িটিতে আগরবাতির মিষ্টি গন্ধ। দেয়ালে আঠা দিয়ে লাগানো নায়িকার পোস্টারে চুমুর দাগ! সেই প্রথম লোকটির হাত ধরে প্রাক্তন ফিল্মস্টার শাহগুল বলেন, ‘শাহগুল সিনেমার নকল নাম! আমি আসলে শুকতারা! আজ থেকে তুমি আমাকে শুকতারা বলে ডাকবে।’ তখন কালো জড়ুল আনন্দে চকচক করে। বৃষ্টি সত্ত্বেও আকাশে নক্ষত্রের ছায়া দেখা যায়।

সিনেমার প্রেম ঝমঝম করে লোকটির বাড়ির টিনের ছাদে আছড়ে পড়ে।