আবরারকে মারার নির্দেশ আসে ম্যাসেঞ্জারে

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ২২:৩১

 ‘আবরার ফাহাদ একজন শিবিরকর্মী। সবসময় সরকারবিরোধী কথাবার্তা বলে। তার আসলে একটা শিক্ষা হওয়া দরকার।’ এই কথা বেশ কিছুদিন দিন ছাত্রলীগ নেতাদের বলে আসছিলেন গতকাল বৃহস্পতিবার গ্রেফতার হওয়া অমিত সাহা ও মিজানুর রহমান মিজান। এরপর থেকে ছাত্রলীগ নেতারা তাকে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মিজান নিহত আবরারের রুমমেট। আর অমিত সাহা ২০১১ নম্বর রুমের বাসিন্দা ও ছাত্রলীগ বুয়েট শাখার আইনবিষয়ক উপসম্পাদক। এছাড়া হুসেইন মোহাম্মদ তোহা নামে আরেকজন ছাত্রকে গ্রেফতার করেছে ডিবি। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত ১৬ জন গ্রেফতার হলেন।

গতকাল ইফতি মোশাররফ সকাল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি নিজের দোষ স্বীকার করে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে আবরারকে মারার নির্দেশ দেন রবিন। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, মেহেদি হাসান রাসেল, অনিক সরকার, ইফতি মোশারফ সকাল, মেহেদী হাসান রবিন, মেফতাহুল ইসলাম জিওন, মুনতাসির আলম জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভির, মুজাহিদুর রহমান, মুহতাসিম ফুয়াদ, মনিরুজ্জামান মনির, আকাশ হোসেন, ইসতিয়াক আহম্মেদ মুন্না ও শামসুল আরেফিন রাফাত।    যাদের মধ্যে তিন জনের  নাম এজাহারে ছিল না। তারা হলেন, অমিত সাহা, মিজানুর রহমান ওরফে মিজান ও শামসুল আরেফিন রাফাত। এ ঘটনায় আটক সাখাওয়াত ইকবাল অভিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আবরাব হত্যাকাণ্ডে এখনো কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ডিবি।

ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে হত্যার নির্দেশ : বুয়েটের শের-ই-বাংলা হলের ছাত্রলীগ শাখার একটি সিক্রেট ম্যাসেঞ্জার গ্রুপ রয়েছে। এটির নাম এসবিএইচএসএল (শের-ই-বাংলা হল ছাত্রলীগ)। শনিবার রাতে ছাত্রলীগ নেতাদের সিক্রেট গ্রুপে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন লেখেন, ‘সেভেন্টিনের আবরার ফাহাদ। মেরে হল থেকে বের করে দিবি দ্রুত। এর আগেও বলছিলাম।  তোদের তো দেখি বিগার নাই। শিবির চেক দিতে বলেছিলাম। দুই দিন টাইম দিলাম।’ এরপর একজন সেখানে লিখেন, ‘ওকে ভাই’। মেহেদী আবারও লিখেন, ‘দরকারে ১৬তম ব্যাচের মিজানের সাথে কথা বলবি। ও তার সঙ্গে শিবিরের ইনভলভমেন্ট থাকার প্রমাণ দিবে।’ ম্যাসেঞ্জার গ্রুপেই রবিবার রাত ৭টা ৫২ মিনিটে সবাইকে হলের নিচে নামার নির্দেশ দেন মনিরুজ্জামান মনির। রাত ৮টা ১৩ মিনিটে আবরারকে নিজ কক্ষ থেকে ডেকে করিডোর দিয়ে দোতলার সিঁড়ির দিকে নিয়ে যান সাদাত, তানিম, বিল্লাহসহ কয়েকজন। এরপর রাত ১টা ২৬ মিনিটে ইফতি মোশাররফ সকাল ম্যাসেঞ্জারে লেখেন, ‘মরে যাচ্ছে, মাইর বেশি হয়ে গেছে। এখন আমরা কী করব?’ রবিন বলে, ‘শিবির বলে পুলিশের হাতে তুলে দে।’

আলোচিত অমিত সাহা গ্রেফতার :গতকাল গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিয়ারিং বিভাগের ছাত্র অমিত বুয়েট ছাত্রলীগের আইন বিষয়ক উপসম্পাদক। আবরার হত্যাকাণ্ডে অন্যতম সন্দেহভাজন হিসেবে তার নাম না থাকায় গত তিন দিন ধরেই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছিল। অমিত সাহা হিন্দু সংগঠন ইসকন মতাদর্শের। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর সবুজবাগ এলাকায় এক আত্মীয়র বাসা থেকে অমিতকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত রবিবার রাতে বুয়েটের শের-ই-বাংলা হলের যে ২০০১ নম্বর কক্ষে প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে ব্যাপক নির্যাতন চালিয়ে আবরারকে হত্যা করা হয়, ওই কক্ষেরই আবাসিক ছাত্র ছিলেন অমিত। অমিত আবরার হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে ডিবি। ডিবি সূত্র জানিয়েছে, সেদিন আবরারকে ওই কক্ষে ডেকে নেওয়ার আগে অমিত মেসেঞ্জারে তার এক সহপাঠীর কাছে আবরারের খোঁজ করেন, যার স্ক্রিনশট পরে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।

গতকাল বেলা ১২টার দিকে শের-ই-বাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে আবরারের রুমমেট মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। মিজান বুয়েটের ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তবে আবরারের বাবার করা হত্যা মামলায় ১৯ জনের মধ্যে মিজানের নাম ছিল না। ওই মামলার এজাহারের ১১ নম্বর আসামি হোসাইন মুহাম্মদ তোহাকে গতকাল বিকাল ৩টার দিকে গাজীপুরের মাওনা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তোহা থাকতেন শেরেবাংলা হলের ২১১ নম্বর কক্ষে। তিনি হল শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতির পাশাপাশি আবরার হত্যার ঘটনায় জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছে ডিবি।

হত্যায় গ্রেফতারকৃতদের সম্পৃক্ততা মিলেছে : ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এজাহারে নাম না থাকলেও তদন্তে গ্রেফতারকৃত তিন জনের সঙ্গে হত্যার সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ কারণে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া প্রথম দফায় গ্রেফতার হওয়া বুয়েটের ১০ শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহযোগিতা নিয়ে তারাও ঐ হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। গ্রেফতারকৃতদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বেশির ভাগ ছাত্রলীগের রাজনীতি করেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ সময় এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, কে কোন দলের সঙ্গে জড়িত, কার পদবি কী তা আইনে দেখার সুযোগ নেই, তদন্তে এটি দেখাও হচ্ছে না, এ ক্ষেত্রে কারো সামাজিক অবস্থান তদন্তের ক্ষেত্রে যেন প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সে ব্যাপারে চৌকস টিমগুলো কাজ করছে।

অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ঘটনাস্থলে হয়তো অমিত সাহা উপস্থিত ছিল না। কিন্তু প্রাথমিক তদন্তে আবরার হত্যায় তার প্রত্যক্ষভাবে না থাকলেও পরোক্ষ দায়-দায়িত্ব রয়েছে। শুধুই ফেসবুক স্ট্যাটাস তাকে হত্যার মূল কারণ কি না, সে ব্যাপারে বলেন, ‘মোটিভটা আমরা পরে ক্লিয়ার করব।’

পুলিশ আগেই উপস্থিত হয়েছিল এমন একটি বিতর্কের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এখানে কাউকে গুরুতর আহত করা হয়েছিল, এই তথ্য পুলিশের কাছে ছিল না। ফলে রেওয়াজ হচ্ছে, প্রাধ্যক্ষকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশকে হলে ঢুকতে হয়। টহল টিম সেখানে গিয়েছিল, কিন্তু তাদের বলা হয়েছে কিছু ঘটেনি। তিনি বলেন, ‘আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি, আমরা জানতে পারলে হয়তো এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটত না। কিন্তু জানার পরপরই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

ঐ রাতে আসলে আবরার হত্যায় কতজন জড়িত ছিল? টর্চারসেলে কারা ছিল? জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তদন্তে ক্লিয়ার পিকচার নেয়ার চেষ্টা করছি। কারা ছিল কারা ছিল না তা যাচাই করা হচ্ছে। যেহেতু মারার কোনো সুনির্দিষ্ট ছবি কিংবা ভিডিও  নেই। তবে এমনও তো হতে পারে যে আশপাশের রুমের  কেউ ঘটনা শুনে আসছে। আবার কেউ কেউ এমনও থাকতে পারে যে, ছবিতে নেই কিন্তু ঘটনাস্থলে ছিল বা মারের সঙ্গে জড়িত। এর সবই তদন্ত করা হচ্ছে। ক্লিয়ার পিকচার পেতে কিছুটা সময় লাগছে। অপরাধী সবাই ধরা পড়বে।’

শিবির সন্দেহে মারধর করা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে শিবির সন্দেহে ডেকে নিয়ে মারধর করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ঐটাই একমাত্র কারণ কিনা তদন্তের এই পর্যায়ে বলা যাচ্ছে না। কারণ আরো কারণ থাকতে পারে। একটিমাত্র কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে, তা এখনই বলা যাবে না। ঘটনার মোটিভ সম্পর্কে জানতে আমাদের আরো কয়েকদিন সময় লাগবে।

উল্লে­খ্য, বুয়েটের শেরে বাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে আবরার ফাহাদকে রবিবার (৬ অক্টোবর) রাতে ডেকে নিয়ে যায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। এরপর রাত ৩টার দিকে হলের নিচ তলা ও দুই তলার সিঁড়ির করিডোর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ হত্যার ঘটনায় সোমবার আবরারের বাবা বাদী হয়ে ১৯ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের ১৩ জনসহ ১৬ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।