প্যালিয়েটিভ সেবার সহজলভ্যতা

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৯, ২১:১৩

কিছু কিছু রোগ এমন একটি পর্যায়ে চলিয়া যায় যে, রোগীর আরোগ্যের বিষয়টি চিকিত্সার অযোগ্য হইয়া পড়ে। কিন্তু সেই মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ভোগ করিতে থাকে নিদারুণ যন্ত্রণা। নিরাময়-অযোগ্য অসুখে কেবল আত্মীয়স্বজন নহে, তাহাদের পাশে প্রয়োজন কুশলী ও দক্ষ চিকিত্সক এবং চিকিত্সাকর্মীদের যাহারা এইসব রোগের যন্ত্রণার উপশম কীভাবে দিতে হয়, সেই সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। আর এইক্ষেত্রেই বিশেষভাবে গুরুত্ব বহন করে প্রশমন তথা প্যালিয়েটিভ সেবা। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্যালিয়েটিভ বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, বর্তমানে দেশে ১০ লক্ষাধিক রোগী রহিয়াছেন, যাহাদের প্যালিয়েটিভ সেবা প্রয়োজন। কিন্তু দেশে বর্তমানে প্যালিয়েটিভ সেবাদানে কাজ করিতেছে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান, যাহার পুরোটাই আবার ঢাকাকেন্দ্রিক।

সংশ্লিষ্টরা বলিতেছেন, দেশে ক্যানসার, হূদেরাগ, ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়িতেছে। তাহার সহিত পাল্লা দিয়া বাড়িতেছে নিরাময়-অযোগ্য রোগীর সংখ্যাও, যাহাদের আরোগ্য লাভের আর কোনো সম্ভাবনা নাই। সুতরাং এই মানুষগুলির জীবনের শেষ দিনগুলির যন্ত্রণা কমাইতে প্যালিয়েটিভ সেবার গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান দি ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট পরিচালিত কয়েক বত্সর পূর্বের একটি জরিপ হইতে জানা যায়—প্যালিয়েটিভ সেবা প্রাপ্যতার বিচারে ৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৯তম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুধু বাংলাদেশ নহে, সারা বিশ্বে প্রতি বত্সর প্রায় ৪ কোটি মানুষের জীবনের শেষ দিনগুলিতে প্যালিয়েটিভ সেবার দরকার হয়। এর মধ্যে ৭৮ শতাংশের বসবাস নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে। বিশেষ করিয়া যেই সকল শিশুর প্যালিয়েটিভ সেবার প্রয়োজন পড়ে, তাহাদের ৯৮ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের। অন্যদিকে সারা বিশ্বে প্রতি বত্সর প্রয়োজনীয় প্যালিয়েটিভ সেবা ছাড়াই প্রচণ্ড যন্ত্রণা লইয়া মৃত্যুবরণ করিতেছে আড়াই কোটিরও অধিক রোগী।

ব্যথা-বেদনা ও দুর্ভোগ প্রশমিত হইয়া স্বস্তি ও মর্যাদার সহিত বাঁচিয়া থাকাটাও মানুষের অধিকারের পর্যায়ে পড়ে। জানা যায়, মরণরোগে আক্রান্ত মানুষের শতকরা ৭০ জন তীব্র শারীরিক ব্যথা সহ্য করিয়া থাকেন মৃত্যুর আগে। অথচ খুব অল্প প্রশিক্ষণে তাহাদের ব্যথাহীন মৃত্যু নিশ্চিত করা যায়, শ্বাসকষ্টে আরাম দেওয়া যায়, দুর্গন্ধযুক্ত ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আর্টিকেল ৬৭.১৯-এও প্যালিয়েটিভ কেয়ারকে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করিবার সুপারিশ করা হইয়াছে। ইহাতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলির অন্যতম বাংলাদেশ। তাহা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায়ও (এসডিজি) সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের প্রধান শর্ত ধরা হইয়াছে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের প্রাপ্যতাকে। সুতরাং এই প্রশমন স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করিতে হইবে। কারণ এই সেবা প্রাপ্যতার বিষয়টি দেশের উন্নয়ন ধারার অন্যতম সূচক বলা যায়। সুতরাং সময় আসিয়াছে প্যালিয়েটিভ কেয়ারকে স্বাস্থ্যনীতিতে অন্তর্ভুক্তি করিবার। অনেক অনিরাময়যোগ্য মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর নিকটাত্মীয় বোঝেনই না যে, রোগীর যন্ত্রণা প্রশমনে প্যালিয়েটিভ কেয়ার প্রয়োজন। এইজন্য এই সেবার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাটাও জরুরি।