প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টা মামলার আসামি হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান বিদেশে পালানোর সময় গ্রেফতার হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার ভোররাত ৫টায় র্যাবের একটি বিশেষ টিম মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে গুহ রোডের হামিদা আবাসিক গেস্টহাউজের সামনে বান্ধবীর বাসা থেকে তাকে আটক করে। সেখান থেকে একটি পিস্তল, চার রাউন্ড গুলি ও একটি ম্যাগাজিন ও নগদ ২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক এএসপি মিজানুর রহমান ভুঁইয়া জানিয়েছেন, তিনি ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। পাগলা মিজানের ঢাকায় চারটি বাড়ি ও যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে একটি বাড়ি রয়েছে।
পাগলা মিজান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে স্বীকার করেছেন, তার কোনো ব্যবসা নেই। চাঁদাবাজি, মাদক ও ক্ষমতার অপব্যবহারই তার অর্থ-সম্পদের মালিক হওয়ার উত্স। যে বান্ধবীর বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, ঐ বান্ধবীর স্বামী ছয় বছর আগেই মারা গেছেন। এরপর থেকে তার সঙ্গে থাকেন পাগলা মিজান। এছাড়া তার আট জন গার্ল্ডফ্রেন্ড আছেন। তার মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে ৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকার চেক, এক কোটি টাকার এফডিআর উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আসাদ গেট প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে বৃহস্পতিবার ৬৮ লাখ টাকা উত্তোলন করেন পাগলা মিজান। তার বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় মানিলন্ডারিং ও শ্রীমঙ্গল থানায় অস্ত্র মামলা দায়ের করা হয়েছে।
১৯৮৯ সালে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশে বাসায় হামলাকারীদের একজন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মিজান। ঘটনার সময় তিনি ছিলেন ফ্রিডম পার্টির বড়ো নেতা। শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টাকারীদের অন্যতম ছিলেন মিজানুর রহমান মিজান। পাগলা মিজান নামেই সবাই তাকে চেনে। হত্যাচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি নাম বদলিয়ে রাখেন হাবিবুর রহমান মিজান। পরে এক সময় ফ্রিডম পার্টি থেকে গিয়ে ভেড়েন আওয়ামী লীগে। তিনি এখন মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের আলোচিত-সমালোচিত নেতা। আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতাকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে মিজান দলে ভিড়েন। প্রতি মাসে ঐ নেতাদের নির্ধারিত হারে মাসোহারা দিয়ে থাকেন পদ টিকিয়ে রাখার জন্য।
১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট মধ্যরাতে ফ্রিডম পার্টির সদস্য কাজল ও কবিরের নেতৃত্বে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে হামলা চালায় ১০/১২ জনের একটি চক্র। তারা সেখানে গুলি করে এবং বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এ সময় শেখ হাসিনা বাড়ির ভেতর অবস্থান করছিলেন। বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীরাও পালটা গুলি চালায়। এক পর্যায়ে হামলাকারীরা চলে যায়। এ ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা হয়। ১৯৯৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলার অভিযোগপত্র দেয়। এতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) সৈয়দ ফারুক, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) আবদুর রশিদ ও মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) বজলুল হুদা এবং নাজমুল মাকসুদ মুরাদসহ ১৬ জনকে আসামি করা হয়। অভিযোগপত্রে মিজানুর রহমান ওরফে পাগলা মিজানকে হামলার পরিকল্পনাকারীদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মিজানের ছোটো ভাই মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাও ছিলেন হামলাকারী দলের সদস্য। গতকাল র্যাবের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক ক্ষুদেবার্তায় মিজানকে আটকের খবর জানানো হয়। বার্তায় বলা হয়, চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে হাবিবুর রহমান মিজানকে পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে শ্রীমঙ্গল থেকে আটক করা হয়েছে। এর আগে মিজানকে আটকের জন্য বুধবার রাতেও মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব রোডের বাড়িতে অভিযান চালায় র্যাব। সে সময় তাকে পাওয়া যায়নি।
এক সময় ফ্রিডম পার্টি করা মিজানের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। সিটি করপোরেশনের ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি থেকে শুরু করে মানুষ হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে পাগলা মিজানের বিরুদ্ধে। ভয়ংকর এই সন্ত্রাসী মোহাম্মদপুরে গড়ে তুলেছেন অপরাধ সাম্রাজ্য। মানুষ হত্যা ছাড়াও কোটি কোটি টাকার টেন্ডারবাজি, ভূমি দখল, চাঁদাবাজিসহ মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্পে মাদক ও চোরাই গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবসার নিয়ন্ত্রক তিনি। চলমান সন্ত্রাসবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান শুরুর সময় তাকে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেলেও কয়েকদিন আগে থেকে তার খোঁজ মিলছিল না। দুই দিন বাড়িতে অভিযান চালিয়েও তাকে পায়নি র্যাব। এর মধ্যে গতকাল তাকে আটকের খবর জানানো হয়।
এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল থানার ওসি আবদুস সালেক বলেন, টিভি দেখে জানতে পেরেছি আমাদের এলাকা থেকে র?্যাব ঐ কাউন্সিলরকে আটক করে নিয়ে গেছে। তার এখানে অবস্থানের বিষয়ে বা র?্যাবের অভিযানের বিষয়ে আমাদের কিছু জানা ছিল না। গুহ রোডের বাসিন্দা হাজী ফরিদ আহমেদ জানান, কয়েকদিন ধরে ঐ এলাকায় মিজানকে আনাগোনা করতে দেখেছেন তারা।
