পিওন থেকে যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক হওয়া আনিস বহিষ্কার

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০১৯, ২২:১৭

ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ার পর আত্মগোপনে যাওয়া যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমান আনিসকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সংগঠনের পরিচয়ে আর্থিক তছরুপ ও অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তিনি বহিষ্কার হলেন। গতকাল শুক্রবার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের এক জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সংগঠনের সার্বিক পরিস্থিতি ও সপ্তম জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে সংগঠনের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে ছাড়াই যুবলীগের জরুরি প্রেসিডিয়াম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করেন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হারুনুর রশিদ। তবে আগামী ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য সপ্তম জাতীয় কংগ্রেস সামনে রেখে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তেই এ বৈঠক হয়েছে বলে দাবি করেন যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যরা। সূত্র জানায়, বৈঠকে সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্যরা বলেন, চেয়ারম্যান পদে ওমর ফারুক চৌধুরীকে তারা আর দেখতে চান না।                চেয়ারম্যানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে লিখিত আকারে চিঠি দেবেন যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যরা।

বৈঠক শেষে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ বলেন, আনিসকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়াও আসন্ন কংগ্রেস নিয়ে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেগুলো লিখিত আকারে নিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দেওয়া হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। সূত্র জানায়, বৈঠকে যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যরা চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তারা বলেন, চেয়ারম্যানকে নিয়ে পত্রপত্রিকায় নানা রকম খবর বেরিয়েছে। তার ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। তিনি সঙ্গতকারণেই উপস্থিত থাকতে পারেননি। আগামীতে দলের জাতীয় কংগ্রেসেও তিনি হাজির হতে পারবেন না। তাহলে আমাদের বিকল্প পথ দেখতে হবে। এ সময় প্রেসিডিয়াম সদস্য আতাউর রহমান আতা ও মাহবুবুর রহমান হিরন, মো. ফারুক হোসেন অভিন্ন সুরে বলেন, ‘যেহেতু উনি নেই, তাহলে সিদ্ধান্ত নিতে কেন পারবো না? ব্যক্তির দায় সংগঠন বহন করতে পারে না। উনি উপস্থিত না হলে কাউকে না কাউকে তো সভাপতিত্ব করতে হবে। তার নামে নানা ধরনের সংবাদ সংগঠনের সুনাম ক্ষুণ্ন করে। ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’ এ সময় আলতাফ হোসেন বাচ্চু বলেন, ‘যেহেতু উনি নেই, তাই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। কিন্তু আমাদের সাংগঠনিক নেত্রী হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সরিয়ে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু চেয়ারম্যান তো এখনো বহাল রয়েছেন। তার বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে পারি। এতে সংগঠনেরও শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।’

এ সময় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহবুবুর রহমান হিরন। তিনি বলেন, ‘আনিসের মাধ্যমে টাকা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা স্থান পেয়েছে। সঠিক লোক আসেনি দায়িত্বে। এ ব্যাপারে আপনি (হারুন) নীরব থেকেছেন। আপনি কোথায়ও না বললেও নেত্রীর কাছে গিয়ে বলতে পারতেন। সে সুযোগ আপনার ছিল। কিন্তু আপনি তা করেননি।’ এ সময় হারুনুর রশিদ কোনো কথা বলেননি। এ সময় অনেকে প্রেসিডিয়াম সদস্যই হারুনুর রশিদকে দোষারোপ করেন। 

জানা গেছে, ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ শাখা যুবলীগের সম্মেলন কেন্দ্রের আগে নাকি পরে হবে, জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতিত্ব কে করবেন, প্রস্তুতি কিভাবে নেওয়া হবে—এই তিন বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা নিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে শিগগিরই সাক্ষাত্ করবেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। এরপরই সম্মেলনের সামানে রেখে বিভিন্ন উপকমিটি গঠন করা হবে। এদিকে ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ার পর আত্মগোপনে চলে গেছেন কাজী আনিসুর রহমান আনিস। কি কারণে আনিসকে বহিষ্কার করা হয়েছে জানতে চাইলে যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক এ বি এম আমজাদ হোসেন বলেন, ‘কাজী আনিস আওয়ামী যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক। দুর্নীতির কথা আমরা পত্র পত্রিকায় দেখেছি এবং অর্থনৈতিক তসরুফের কারণে তাকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’ কাজী আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দরপত্র থেকে কমিশন আদায় এবং সংগঠনের বিভিন্ন কমিটিতে পদ-বাণিজ্য করে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। গত পনের দিন ধরে কাজী আনিস আত্মগোপনে আছেন। তিনি দলীয় কার্যালয়ে যাচ্ছেন না, বাড়িতেও তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। যুবলীগের কেন্দ্রীয় অফিসে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে ২০০৫ কাজ শুরু করেন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বাসিন্দা আনিস। এর আগে তিনি যুবলীগ কার্যালয়ে পিয়ন হিসেবে কাজ করেন। সাত বছর পর কর্মচারী থেকে কেন্দ্রীয় যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক পদে বসেন। এখন তিনি একাধিক গাড়ি-বাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমির মালিক। কম্পিউটারে নিয়মিত সারা দেশের যুবলীগ কমিটির তালিকা তৈরি করতে গিয়ে সব তথ্য তার মুখস্ত। ২০১২ সালে যুবলীগের নতুন কমিটি গঠনের সময় আনিসকে উপ-দপ্তর সম্পাদক করা হয়। দপ্তর সম্পাদক পদটি খালি থাকায় ছয় মাসের মধ্যে সে ওই পদ পেয়ে যায়।

গতকাল যুবলীগের বৈঠক শেষে সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্য শহীদ সেরনিয়াবাত সাংবাদিকদের বলেন, ‘সভায় চেয়ারম্যান উপস্থিত ছিলেন না। উনি বোধহয় ব্যস্ত ছিলেন। তাই আসতে পারেননি।’ তবে সভা শেষে সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।

যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠনে থাকতে পারবেন কিনা, সেই সিদ্ধান্তের জন্য আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করবেন যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যরা। ওমর ফারুক চৌধুরীকে ছাড়াই সংগঠনটির আগামী সম্মেলন করার পক্ষে প্রেসিডিয়াম সদস্যরা। গতকাল সভা শেষে যুবলীগের দফতর থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত থাকাসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজে সংশ্লিষ্টতার জন্য যুবলীগের দফতর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানকে সংগঠনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া আরও যাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সূত্র জানায়, গতকালের বৈঠকে প্রেসিডিয়ামের ২৯ সদস্যের মধ্যে ১৯ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন।