এসব জুয়ার আসরে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকার খেলা চলে।
আর মাসে হাতবদল হয় প্রায় ৯ কোটি টাকা
হাবিবুর রহমান বাদল, নারায়ণগঞ্জ
রাজধানী ঢাকার বড়ো বড়ো জুয়ার আসর বন্ধে সরকার ও প্রশাসন যখন তত্পর ঠিক এমন একটা সময়ে রাজধানীর লাগোয়া রূপগঞ্জসহ নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে গোপনে বসছে জুয়ার আসর। জানা গেছে, রূপগঞ্জে শতাধিক স্পটে রাজধানীর বন্ধ হওয়া ডিজেসহ জুয়ার আসর জমজমাট হয়ে উঠেছে। রূপগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে ছোটো-বড়ো অন্তত ২০০ জুয়ার স্পট রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেছেন, জুয়াসহ অপরাধের সাথে আমার কোনো আপস নেই। তিনি এ ব্যাপারে পুলিশকে সহায়তার জন্য নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আমরা খবর পাওয়ামাত্র জুয়ার আসরে অভিযান চালাচ্ছি।
অভিযোগ রয়েছে, রূপগঞ্জে জুয়ার স্পটগুলো রাজধানী ঢাকার মতো কোনো ক্লাবে নয়, চলছে ভিন্ন পন্থায়। সম্প্রতি কাঞ্চন পৌরসভার কুশাব এলাকা থেকে শুল্ক গোয়েন্দা পুলিশ জুয়া খেলার সামগ্রী উদ্ধার করেছে। অন্যদিকে অনলাইন ক্যাসিনো হোতা সেলিম প্রধানকেও গ্রেফতার করেছে র্যাব। তার বাড়ি রূপগঞ্জের ভুলতা প্রধান বাড়ি এলাকায়। অনুসন্ধানে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলায় ছোটো-বড়ো মিলিয়ে প্রায় ২০০ স্পটে প্রতিদিন জুয়ার আসর বসে। এসব জুয়ার আসরে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকার খেলা চলে। আর মাসে হাতবদল হয় প্রায় ৯ কোটি টাকা। এসব জুয়ার স্পট বন্ধের ব্যাপারে এলাকাবাসী থানা পুলিশের সহযোগিতা চাইলে কোনো প্রকার সহায়তা পায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। উপজেলার ১০০ স্পটের ব্যাপারে থানা পুলিশ অবগত রয়েছে। তাই এসব স্পটকে বলা হয় ‘পারমিটেড’। আর বাকিগুলোকে বলা হয় চোরাই বোর্ড। অভিযোগ রয়েছে, এসব স্পট থেকে বখরা পায় পুলিশ, কথিত সাংবাদিক, ক্ষমতাসীন দলের নামধারী নেতা ও সন্ত্রাসীরা। তবে পুলিশের ভাষ্যমতে, ‘জুয়ার স্পটে অভিযান চালালে সমস্যা আছে। জুয়াড়িদের ধরতে গেলে বিপদ হয়। জুয়াড়িদের ধাওয়া করলে তারা লাফালাফি করে পানিতে পড়ে। এতে কেউ মারা গেলে বিপদ হতে পারে। তাই জুয়ার স্পটে অভিযান চালানো হয় না।’
রূপগঞ্জ থানার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, রূপগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে জুয়ার আসর বসে। এদের গ্রেফতার করতে গেলেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা তদবির করে। পুলিশও মাসোহারা পায়। সরেজমিনে রূপগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, জুয়াড়ি ও জুয়ার আসরের কয়েকজন আয়োজকের সঙ্গে কথা বলে মিলেছে চমকপ্রদ তথ্য। জানা যায়, উপজেলার কায়েতপাড়া, দাউদপুর, ভোলাবো, মুড়াপাড়া, ভুলতা, রূপগঞ্জ সদর ও গোলাকান্দাইল ইউনিয়নে রাতে-দিনে ১০০ স্পটে জুয়ার আসর বসে। এছাড়া তারাবো ও কাঞ্চন পৌরসভা এবং চনপাড়া বস্তিতে বসে আরো ১০০ স্পট। এসব স্পটে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকার খেলা চলে বলে জানান জুয়াড়ি ও জুয়ার আসরের কয়েকজন আয়োজক। এ হিসাবে প্রতিমাসে জুয়াড়িদের কাছে হাতবদল হয় প্রায় ৯ কোটি টাকা। বছরে যা দাঁড়ায় ১০০ কোটি টাকার ওপরে। জুয়ার টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে বাড়ছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের ঘটনা। মাদকের মতো রূপগঞ্জের ১২৮ গ্রামের ঘরে ঘরে বেড়ে চলছে জুয়াড়ির সংখ্যা। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে না পেরে ও অভিভাবকদের কাছে টাকা চেয়ে না পেয়ে বিভিন্ন গ্রামে গত তিন মাসে জুয়াড়ি সন্তানের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন অর্ধশতাধিক পরিবারের মা-বাবা ও অভিভাবক। জুয়ার টাকার জন্য চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি করতে গিয়ে গত দুই মাসে আটক হয়েছেন ২২ জন। জুয়া খেলতে গিয়ে বউ বাজির ঘটনাও ঘটেছে। জুয়া খেলার সময় হেরে গেলে অনেকে বউকে বাজি ধরে জুয়া খেলেন। এসব জুয়ার আসরে একশ্রেণির সুদখোর মহাজনরা জুয়াড়িদের চড়া সুদে টাকা দেন বলেও জানা গেছে। তারপরও পুলিশ এসব জুয়ার আড্ডা বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না। থানা পুলিশের ভাষ্য, জুয়াড়িদের গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই জামিনে বেরিয়ে আসে। জুয়ার বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো আইন না থাকায় জুয়ার আসর বন্ধ করা যায় না। ফলে রূপগঞ্জে জুয়ার আসরগুলো এখনো জমজমাটভাবে চলছে।
সরেজমিনে জানা যায়, জুয়ার আসর বসে বাড়িতে, জঙ্গলে, বড়ো গাছের তলায়, পুকুর পাড়ে, ঝোপের আড়ালে। আবার খোলা আকাশের নিচে, নয়তো তাঁবু টানিয়ে বসে জুয়ার আসর। কোথাও বসে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার কিংবা নৌকাতে। কখনো রাতে, আবার কখনো দিনে চলে ঐ সব আসর। উপজেলার কামশাইর, নগরপাড়া, তালাশকুর, বরুণা, চনপাড়া বস্তি, বরাপা, মাসাবো, হাটাব, ইছাপুরা, গুতিয়াবো, উত্তরপাড়ার বাগানবাড়িতে, গন্ধবপুর চরে, ব্রা?হ্মণখালীর মাঠে, আধুরিয়া, কাঞ্চন, কালনি, গোবিন্দপুর, কান্দাপাড়া, তেতলাবো, মাহনা, মিরকুটিরছেও, নোয়াপাড়া, ভুলতা মিয়াবাড়িসহ উপজেলার ৭০০ স্পটে চলে জুয়ার আসর। এসব জুয়ার আসরে প্রতিদিন সর্বস্বান্ত হচ্ছে শত শত লোক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে গুতিয়াবো এলাকার জুয়ার আসরের এক আয়োজক বলেন, ‘ভাই আসর বসাইলে টাকা পাই। বিনে পয়সার ব্যবসা। এ সুযোগ কে ছাড়ে। এ টাকার ভাগ পায় পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। শুধু আমাদের দোষ দিয়ে কি লাভ?’
রূপগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মাহমুদুল ইসলাম বলেন, জুয়ার আসরের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে খোঁজ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
