দুরন্ত টিভিতে জামাল হোসেন আবির ও পার্থ প্রতিম হালদার পরিচালিত ধারাবাহিক ‘দুরন্ত সময়’ প্রচারিত হয় রবি থেকে বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় এবং একই দিনে সকাল ৯টায়। এ অনুষ্ঠানের কল্যাণে শিশু-কিশোরদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ‘মূকাকু’রূপী নিথর মাহবুব। পরিচিতদের অনেকেই এখন তাকে ডাকেন মূকাকু বলে। মূকাকু নিয়ে এই আয়োজন। লিখেছেন মাহমুদুল আমিন
‘দুরন্ত সময়’-এর প্রচারের সময় হলে ঘরে ঘরে শিশু-কিশোররা এখন টিভির সামনে অনেক আগ্রহ নিয়ে বসে থাকে নতুন পর্বে মূকাকুর কাণ্ডকারখানা দেখতে। মূকাকু বোকাসোকা মানুষ। বাচ্চাদের বলে সে সবই পারে। যখন বাচ্চারা বলে, ‘তুমি কৃষক চেন?’ তখন সে বলে, ‘হ্যাঁ, চিনি।’ কিন্তু কৃষক সাজতে গিয়ে ভুল করে বসে। চাষাবাদের জন্য নিয়ে আসে উল্টাপাল্টা উপকরণ। তখন বাচ্চারা তার ভুল ধরিয়ে দেয়। ভুল করতে করতে একসময় সে সঠিক জিনিসটি নিয়ে আসে। আর এভাবে ‘দুরন্ত সময়’-এর প্রতি পর্বেই মূকাকুর মাধ্যমে বিভিন্ন পেশা ও জিনিসপত্রের সঙ্গে শিশু-কিশোরদের পরিচয় ঘটে। মূকাভিনয়ের ‘মূ’-এর সঙ্গে ‘কাকু’ যোগ করে এই চরিত্রের নামকরণ করা হয়েছে ‘মূকাকু’। আর এই মূকাকুর ভূমিকায় আছেন নিথর মাহবুব।
এই অনুষ্ঠানে পাঁচটা গ্রুপে মোট ১০ জন শিশুশিল্পী আফরা, পারিশা, ঋদ্ধি, প্রহর, রোজা, মেধা, আরবিন, লারিসা, নোরা, ফাবিহা, আতিকা অভিনয় করেছে। প্রতি পর্বে দুজন শিশু থাকে। তাদের সঙ্গে খালামণি অথবা চাচ্চু চরিত্রে একজন থাকেন। আর মূকাকু থাকে প্রতি পর্বেই।
নারায়াণগঞ্জ, নরসিংদী আর ঢাকায় এই তিন জেলায় বেড়ে উঠেছেন নিথর। কখনো কেটেছে গ্রামে কখনো শহরে। তাই গ্রাম কিংবা শহরের সব পেশার সঙ্গেই তার ভালো পরিচিতি আছে। কৃষক, জেলে, কামার—কে কী করেন এগুলো যেমন তার জানা, তেমনি এসব কাজ অনায়াসে করতেও পারেন। কিন্তু ‘দুরন্ত সময়’ অনুষ্ঠানের সুবাদে তাকে এসব কাজ না-পারার অভিনয় করতে হয় এবং উল্টাপাল্টা জিনিস আনতে হয়। পরে বাচ্চাদের কাছে তাকে শিখতে হয়। আর এভাবেই গ্রাম ও শহরের বাচ্চারা টিভিতে অনুষ্ঠানটা দেখতে গিয়ে অনেক নতুন কিছু শিখতে পারছে। মোট ৬৫টি পেশা দেখানো হবে ‘দুরন্ত সময়’ অনুষ্ঠানে।
নিথর মাহবুব বলেন, ‘যখন এর কাজ চলছিল, তখন মূকাকু চরিত্রটি নিয়ে সেটের শিশুরা খুবই এক্সাইটেড ছিল। পর্দার বাইরেও ওরা আমাকে মূকাকু বলে ডাকত। যখন আমার শুটিংয়ের ডাক পড়ত শিশুরা দৌড়ে গ্রিনরুমে চলে আসত মূকাকুকে সেটে নিতে। শুধু শিশুরাই নয়, পুরো ইউনিটের আলোচনায় ছিল মূকাকু। তার দাপটে আমার আসল নামটাই যেন তখন হারিয়ে গিয়েছিল। শুধু তখন কেন, এখনো একই অবস্থা। চরিত্রটা এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে, এখন আশপাশের মানুষগুলো মূকাকু বলেই আমাকে ডাকছে। কেউ দূর থেকে মূকাকু বলে ডাক দিলে আমি দাঁড়িয়ে যাই, কেননা চরিত্রটিতে আমি অভিনয় করছি, তাই বুঝি আমাকেই ডাকা হচ্ছে। এটা আমার জন্য অনেক আনন্দের যে চরিত্রের নাম ধরে লোকেরা আমাকে ডাকছে।’
মূকাভিনয় নিয়ে বাংলাদেশের টিভিতে কখনো এমন ধারাবাহিক আয়োজন হয়নি। মূকাকুর সুবাদে শত শত ছেলে মেয়েরা এখন আগ্রহী উঠছে মূকাভিনয়ের প্রতি। দুরন্ত টিভির এই অনুষ্ঠানের পর অন্য চ্যানেলও মূকাভিনয় নিয়ে অনুষ্ঠান তৈরিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে, এরমধ্যে নিথর মাহবুব বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের কয়েকটি অনুষ্ঠানের কাজও করেছেন বলে জানালেন।
নিথর বলেন, ‘দুরন্ত টিভি মূকাভিনয়ে এনেছে দুরন্ত গতি। বর্তমানে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে মূকাভিনয় নিয়ে ব্যাপক কর্মকাণ্ডই তার প্রমাণ। গত ৮ ডিসেম্বর শিল্পকলা একাডেমিতে হয়ে গেছে নবীন-প্রবীণ মূকাভিনেতাদের মিলনমেলা। এর আগে শিল্পকলা একাডেমিতে হয়ে গেছে মূকাভিনয়ের মেকআপের কর্মশালা। একই সময়ে রংপুর জেলায়ও মূকাভিনয় নিয়ে মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারও আগে মূকাভিনয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরির ওপর একটি কর্মশালা হয়েছে শিল্পকলা একাডেমিতে।
বাংলাদেশের বিখ্যাত মূকাভিনেতারা আছেন ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডায়। এই শিল্পের বেশ কদর আছে এসব দেশে। তাই যারাই মূকাভিনয়ে আসছে, তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা। এমন অনেক দলই আছে, যারা দেশে তেমন শো করছে না, দলে দক্ষ কর্মীও নেই কিন্তু নানা উপায়ে বিদেশ যাচ্ছে শো করতে। এর ফলে বিদেশিদের ভুল ধারণা জন্মাচ্ছে বাংলাদেশের মূকাভিনয়ের প্রতি। বাংলাদেশের মূকাভিনয়কে আধুনিকায়ন ও জনপ্রিয় করে তোলার পিছনে বড় ভূমিকা রয়েছে নিথর মাহবুবের। দেশে মূকাভিনয় শিল্পের ভালো অবস্থান তৈরি করতে তিনি প্রায় একযুগ ধরে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মূকাভিনয়কে যুক্ত করছেন শিল্পের নানা মাধ্যমের সঙ্গে। দীর্ঘ এই পথচলায় তিনিও বিদেশ যাওয়ার অনেক প্রস্তাব পেয়েছেন, কিন্তু তিনি দেশের মাটিতে থেকেই শিল্পের চর্চা করতে চান। নিথর বলেন, ‘বর্তমানে দেশে যারা মূকাভিনয় চর্চা করছে, তাদের যে কারও চেয়ে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ আমার অনেক বেশি। চেষ্টা করলেই বিদেশে স্থায়ী হতে পারতাম। কিন্তু আমি আমার দেশকে ভালোবাসি, ভালোবাসি এই দেশের মানুষকে। এই ভালোবাসা ছিন্ন করে কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে আমার নেই। আর আমি যদি চলে যাই আবার হয়তো মূকাভিনয়ের অগ্রগতিতে ভাটা পড়বে।’
এই অভিনেতা বলেন, ‘একটা সময় ছিল যখন বিটিভির নাটকে কোনো চরিত্র ভালো করলে সেই চরিত্রের অভিনেতাকে রাস্তাঘাটে দেখলেই মানুষ চরিত্রের নাম ধরে ডাকত। অনেক বছর পর যেন আবার সেই দিন ফিরিয়ে আনল দুরন্ত টিভি। পথেঘাটে শিশু-কিশোররা আমাকে ‘বজলু চোর’ হিসেবেই চিনেছে, এটা আমার জন্য অনেক বড় একটি পাওয়া। বজলু চোর থেকে এখন আবার হয়েছি মূকাকু। কাজের গুণে এভাবেই মানুষদের হূদয়ে ঠাঁই পেতে চাই। সামনে অনেক ভালো ভালো কাজ করতে চাই।’
