অয়েজুল হক
হামিদ সাহেব ঝানু সাংবাদিক। রিপোর্ট লিখতে লিখতে আঙুল ক্ষয় হওয়ার নিয়ম থাকলে আরো দশ বছর আগে তার ডান হাতের আঙুলগুলো নেই হয়ে যেত। আঙুল তার আপন জায়গায় থাকলেও মাঝখান থেকে মাথার চুলগুলো নেই হয়ে গেছে। হামিদ সাহেব নিজ পেশা নিয়ে যথেষ্ট গর্বিত। বেশ অনেক দিন পর ইন্টারভিউয়ের একটা ভালো বিষয় পেয়েছেন তিনি। খুলনায় বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ছে। কেন বাড়ছে? কারণ, যুক্তি ও সমাধানের উপায়। কমলাপুর ট্রেনে ওঠার পর থেকে তার মাথায় প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। মানুষ বিবাহ করে স্বপ্ন নিয়ে। এই স্বপ্নের শেষ নেই। এ রকম ভাবনা ভাঙে তার পাশে হুড়মুড় করে কিছু একটা পড়ার পর। প্রথমে ব্যাগ, তারপর নিজেই সিটে আছড়ে পড়ে। কিকবোর্ড, পুলবয়েজ, ফিন, কাঁধব্যাগ নিয়ে যেন সুইমিংপুলে সাঁতার দিতে লাফিয়ে পড়েছে! হামিদ সাহেব বাঁকা চোখে তাকান। অল্পবয়স্ক তরুণী। পঁচিশ বছরের মতো হতে পারে।
—ট্রেনের সিট কি সুইমিংপুল?
—কেন?
—এই যে সুইমিংপুলে লাফিয়ে পড়ার মতো সিটের ওপর ধুপধাপ করে লাফিয়ে পড়লে।
—আমি খুব ব্যস্ত। কিছু মনে করবেন না, সরি।
—সিটের ওপর লাফিয়ে পড়লে যদি আগে যাওয়া যায়... তো আমিও না হয় বের হয়ে তোমার ঘাড়ের উপর দিয়ে সিটের ওপর লাফিয়ে পড়ি। সিট ক্রস করে জানালা দিয়ে বাইরে পড়লেও দুঃখ থাকবে না।
মেয়েটা কিছুক্ষণ থ হয়ে বসে থাকে। সামান্য সময় পরই সে তার ব্যস্ততা দেখাতে শুরু করে। বড় ব্যাগ থেকে বের হয় মাঝারি ব্যাগ। তার ভেতর ভ্যানিটি ব্যাগ। তিন ব্যাগ থেকে তিনটা মোবাইল। ভ্যানিটি ব্যাগেরটা সবচেয়ে দামি। সম্ভবত বিদেশ থেকে আনা হয়েছে। একটায় গান চলে, একটা দিয়ে কথা, আরেকটা দিয়ে ফেসবুক চ্যাট। বিরাট ব্যস্ত। মেয়েটার আরো দুটো করে হাত, পা, কান থাকলে বোধহয় সে পরিপূর্ণ সুখী হতো! ব্যস্ততা দেখাও আরেক ব্যস্ততা। ব্যস্ততার ভেতর দিয়ে খুলনা চলে আসা।
খুলনা বেশ পরিচ্ছন্ন শহর। নগর উন্নয়ন ভবনের পাশেই রেলস্টেশন। ট্রেন থেকে নেমে হামিদ সাহেবের নিজেকে স্পাই স্পাই মনে হয়। তার কাছে লিস্ট আছে। মোবাইল নম্বরসহ তাদের ছবিও আছে। বিচ্ছেদের ঘটনা, ঠিকানা পেপার থেকে নেওয়া। মোবাইল নম্বর গোপনে সংগ্রহ করা হয়েছে। আপাতত শম্পার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। গরিব ঘরের মেয়ে। ডিভোর্স বড়োলোকদের কাজ! এই মেয়েটার বাবা রিকশা চালায়। দুই ছেলেমেয়ে ফেলে সে স্বামীকে ডিভোর্স দিয়েছে। স্বামীর অপরাধ—ঠিকঠাক মতো খোঁজ নেয় না। মোবাইল বের করে কল দিতেই মিষ্টি গলার মেয়ে কণ্ঠ শোনা যায়, ‘হ্যালো...’
—হু। শম্পা কেমন আছ?
—আপনি কে বলছেন?
—আমার নাম আব্দুল হামিদ।
—ও, হামিদ ভাই। এতদিন পরে আমার কথা মনে পড়ল! যাও তোমার সাথে কথা নেই।
‘কথা নেই’ বললেও শম্পা লাইন কেটে দেয়নি। তার একজন হামিদ ভাই আছে। সে খোঁজ না নিলে শম্পার রাগ হয়। অভিমান করে। কথা নেই বলেও লাইন কেটে দেয় না। কিছুদিন অতিবাহিত হলে তার কণ্ঠস্বর সে ভুলে যায়!
—শম্পা স্বামীকে ছাড়লে কেন?
শম্পা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘ওই যে তারিক, রিজু, হেলাল...’
লম্বা কাহিনি। ‘আচ্ছা পরে কথা হবে’ বলে হামিদ সাহেব লাইন কেটে দেন। পাশেই জাতিসংঘ পার্ক। পরিবেশ খুব ভালো না হলেও জমজমাট অবস্থা।
একটা মেয়ে বসে বসে বাদাম চিবাচ্ছে। ভঙ্গি বলছে, সে বাদাম নয়, একটা আস্ত পাথর গালে নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সেটা কুচিকুচি করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। অথবা হাতের কয়েকটা বাদাম নিয়ে পাশে বসা ছেলেটার সঙ্গে ইহজীবন পার করে দিতে চায়। দূরে বসে থাকার কারণে তাদের ফিসফাস কথার কিছু বোঝা না গেলেও প্রেমালাপ সেটা নিশ্চিত। হঠাত্ কী কারণে মেয়েটা উঠে দাঁড়ায়। ক্ষোভ, ক্রোধ মিশ্রিত গলায় চিত্কার করে বলে, ‘এই তোমার শেষ কথা?’
—হু।
—স্বামী-সংসার সব ছাড়লাম, এখন বলিস বিয়ে করবি না! আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।
কথা শেষ করেই মেয়েটা জুতা খুলে আচ্ছামতো পেটাতে শুরু করে। হামিদ সাহেব দৌড়ে এগিয়ে যান। মারপিট থামাতে সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘দয়া করে একটু থামুন।’ কথার ভেতর ছেলেটা সুযোগ বুঝে কেটে পড়েছে। সেই রাগ তুলতে মেয়েটা হামিদ সাহেবকে জুতাপেটা করতে শুরু করে। পার্কের লোকজন হইচই করে ছুটে আসে। কিছুক্ষণ মারপিট। মেয়েটা যখন চিত্কার করে বলে ‘ওনার কোনো দোষ নেই’ কেবল তখনই ক্ষীপ্ত জনতা শান্ত হয়। ততক্ষণে মাথার ভেতর হইচই শুরু হয়েছে। রাতের ট্রেনেই হামিদ সাহেব বিদায় হন। বাড়ি ফিরে ক্লান্ত-শ্রান্ত গলায় ভাবেন, বিচ্ছদের ইন্টারভিউটা হলো না। গায়ে জ্বরজ্বর ভাব। শম্পা মেয়েটা সেই একভাবে কল দিয়ে যাচ্ছে।
—হামিদ ভাই, তুমি এরকম করছ কেন?
—দেখ, আমি খুব সমস্যায় আছি। আমার স্ত্রী তোমার হ্যালো শুনে হ্যাং হয়ে গেছেন। তার চোখে আগুন। লাল নীল আগুন!
—ভাবিকে নাকি ছেড়ে দেবে। এখনো দাওনি?
—পাগলের মতো কী সব বলছ। আমি তোমার হামিদ ভাই না। অন্য হামিদ। সাংবাদিক।
—ও, আচ্ছা। সমস্যা নেই। আমি কিন্তু তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
—দেখ, আমি কিন্তু তোমার ছবিসহ পত্রিকায় রিপোর্ট করে দেব।
—বারে তাতে কি আমি মরে যাব? আর মরে গেলেও যে আমি তোমাকে ভুলতে পারব না।
হামিদ সাহেব ঘামছেন। অসহায়ের মতো বলেন, ‘স্টুপিড!’
হামিদ সাহেবের স্ত্রী মিতা কখন যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন টের পাননি। পট করে হামিদ সাহেবের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে কানে ধরেন। ওপাশে শম্পা কান্না মিশ্রিত গলায় বলছে, ‘হামিদ ভাই, আমার জীবনটা এভাবে নষ্ট করে দেবে...।’ মিতা মোবাইলটা ছুড়ে ফেলেন। কিছু একটার সঙ্গে বাড়ি খেয়ে বিকট শব্দ হয়। সে শব্দের সঙ্গে যোগহয় আরেকটি শব্দ। ধপাস। হামিদ সাহেব ফ্লোরের ওপর চিতপটাং। দুঃস্বপ্নের ঘোরে মুখ থেকে অস্পষ্ট শব্দ বের হয়, ‘বিচ্ছেদের ইন্টারভিউ’।
