লীলা মৈত্রী নারী
আইন করল জারি
আধি জমি তেফুটি ভাগ
জিন হলো সাত আড়িড়ে ভাই
জিন হলো সাত আড়ি।
এই গানটি এক সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল এলাকায় মানুষের মুখে মুখে ফিরত। গানের ‘লীলা মৈত্রী’ আসলে ইলা মিত্র। তেভাগা আন্দোলনের বীর নেত্রী, সংগ্রামী জনতার প্রিয় ‘রানী মা’। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তিনি তত্কালীন রাজশাহী জেলার নবাবগঞ্জ অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এই গান বা কবিতাটির মর্ম বুঝতে হলে আমাদেরকে তেভাগা আন্দোলনের ইতিহাস ও সেইসঙ্গে তখনকার ভূমিব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে হবে।
১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু করলে জমির মালিকানা জমিদারদের হাতে চলে যায়। জমিদাররা জমির পরিমাণ ও উর্বরতা অনুযায়ী সরকারকে খাজনা দিত। জমিদারদের সাথে চাষাবাদ বা ফসল উত্পাদনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এ সময় জমিদার ও কৃষকদের মাঝখানে জোতদার নামে এক মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। এরা পত্তনি প্রথার মাধ্যমে জমিদারদের কাছ থেকে জমি পত্তন বা ইজারা নিত। তারপর কৃষকদের তা চাষাবাদ করতে দিত। ফসল উত্পাদনের সম্পূর্ণ খরচ কৃষকেরা বহন করলেও তাদের উত্পাদিত ফসলের অর্ধেক তুলে দিতে হতো জোতদারদের হাতে। এ ব্যবস্থাকে বলা হতো ‘আধিয়ারী’। মোটকথা, জমিদারি ও জোতদারি প্রথার সুযোগ নিয়ে ক্ষুদ্র কৃষকদের ওপর চলত নিষ্ঠুর ও সীমাহীন শোষণ। চাষিদের ওপর জমিদার-জোতদারদের এই শোষণ ও অত্যাচার বাঙলার কৃষকদের মনে প্রচণ্ড ক্ষোভের জন্ম দেয়। ১৯৩৬ সালে গঠিত হয় ‘সর্ব ভারতীয় কৃষক সমিতি’। এই কৃষক সমিতির উদ্যোগে সারা দেশে ফসলের ওপর চাষিদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের ওপর জমিদারি-জোতদারি শোষণ ও অত্যাচার বন্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে।
নাচোলে তেভাগা আন্দোলনের সবচে বড়ো যে বৈশিষ্ট্যটি ছিল তা হলো নারীদের ভূমিকা। যা ইতিপূর্বে অন্য কোনো জায়গার তেভাগা আন্দোলনে সেভাবে দেখা যায়নি। নাচোলের বিদ্রোহে নারীদের এই অসাধারণ ভূমিকা ইলা মিত্রের কারণেই সম্ভব হয়েছিল। তাঁর সাংগঠনিক প্রতিভা ছাড়া কমিউনিস্ট পার্টি বা কৃষক সমিতির পক্ষে এটা করা সম্ভব হতো না। মেয়েরা যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল, সাড়া দিয়েছিল আন্দোলনের ডাকে, যুক্ত হয়েছিল প্রতিদিনের লড়াইয়ে-সংগ্রামে, সেটা এজন্য যে তারা ইলা মিত্রকে বিশ্বাস করত। এমনকি মুসলমান বাড়ির মেয়েরাও তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিল। নারীদের যে স্কোয়াড তিনি তৈরি করেছিলেন সেখানে হিন্দু, মুসলমান ও সাঁওতাল তিন সম্প্রদায়ের নারীদের একত্র অবস্থান ছিল এক অকল্পনীয় ব্যাপার। আরো বিশেষ করে সেদিনের সে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষময় পরিস্থিতিতে। তখন সবে দেশ ভাগ হয়েছে, সর্বত্র হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে টেনশন। নাচোল কিন্তু এক জায়গায় দাঁড়িয়েছিল। প্রত্যেক বাড়ি থেকে মেয়েরা এসে যোগ দিয়েছিল এই আন্দোলনে এবং মেয়েদের আলাদা সংগঠনও তৈরি হয়েছিল। পুরুষদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রীদেরও যেভাবে সেদিন এই আন্দোলনে যুক্ত করতে পেরেছিলেন ইলা মিত্র, আজ এত বছর পরেও তা বেশ কঠিন। ১৯৪৯ সালে তাঁদের নেতৃত্বে হাজার হাজার ভূমিহীন কৃষক সংগঠিত হয়। এর ফলে এলাকার জোতদার ও মহাজনরা ভীষণভাবে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সে বছর উত্পাদিত ধান জোতদারদের না দিয়ে সরাসরি কৃষক সমিতির উঠোনে তোলা হয়। ফলে দু পক্ষে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় নাচোলে সাঁওতাল ও ভূমিহীনদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে এক শক্তিশালী তীরন্দাজ ও লাঠিয়াল বাহিনী। এই বাহিনীর প্রধান ছিলেন মাতলা মাঝি। এভাবে ইলা মিত্র ও রমেন মিত্র নাচোল অঞ্চলে তেভাগার দাবিকে বাস্তব রূপ দেয়ার চেষ্টা করেন। আন্দোলনকারীদের চাপের মুখে জোতদার ও ভূমি মালিকেরা নাচোলে ও আশেপাশের এলাকায় তেভাগা কার্যকর করতে বাধ্য হয়। (অংশবিশেষ)
লেখকের ‘নারী সাহসিকা’ (অনুপম প্রকাশনী, ২০১২) বই থেকে
