ওয়াহিদা বানু
আমাদের দেশে অনেক অনেক অর্জন আছে। শিশু শিক্ষায় ও মেয়েশিশুদের শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। নবজাতক শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচি, অনলাইন জন্মনিবন্ধন জাতীয়ভাবে শুরু করা হয়েছে। ৮৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ জন্মনিবন্ধন করা হয়েছে ইত্যাদি। বাংলাদেশের শিশুদের সুরক্ষার ও সহায়তা করার লক্ষ্যে তদানীন্তন সরকার শিশু আইন, ১৯৭৪ প্রণয়ন করে। উক্ত শিশু আইনের প্রায়োগিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার লক্ষ্যে এবং বর্তমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে শিশু আইন, ১৯৭৪ ‘শিশু আইন, ২০১৩ (২০১৮ সংশোধনী) দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে যাচ্ছে। এই আইনে শিশুদের সুরক্ষাকে আরো গুরুত্ব দিয়ে জোরদার কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এই আইনে বাংলাদেশের সব শিশুর বয়স ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধ করতে, জোর বা বলপূর্বক শ্রম বন্ধ করতে, আধুনিক দাসত্ব ও মানব পাচার বন্ধে অঙ্গীকার, জাতীয় শিশুনীতি, ২০১০ এবং শিশু সুরক্ষা ও চাহিদাগুলো পূরণের জন্য সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে অনুস্বাক্ষরের প্রায় ২৫ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এখনো শিশুদের অধিকারগুলো নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশে অনেক শিশু পরিবারের দারিদ্র্য, পরিবারের বিচ্ছিন্নতা, যৌন হয়রানিসহ নানা ধরনের বৈষম্যের কারণে এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে পথশিশুতে পরিণত হচ্ছে। অনেক শিশু পরিবারে আর্থিক অনটন ও স্বল্প আয়ের কারণে নগরের বস্তিতে অমানবিক জীবন যাপন করছে। এসব শিশু বাধ্য হয়ে অল্প বয়সেই নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণ করে। এসব কর্মক্ষেত্রে শারীরিক-মানসিক নির্যাতনসহ নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়ে থাকে। নানাবিধ অত্যাচার-বঞ্চনায় উপায়হীন শিশুরা বাঁচার তাগিদে চুরি, অবৈধ পণ্য বিক্রিসহ নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়। এসব শিশু অল্প বয়সেই অপরাধের কারণে শারীরিক নির্যাতন, আটক, গ্রেফতারসহ নানা আইনি দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। অভিভাবকহীন, পরিবারের বিচ্ছন্নতা ও পরিবারের দারিদ্র্যের কারণে প্রয়োজনীয় কোনো আইনি সহায়তা বা সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে এসব পথশিশু ও দরিদ্র শিশু আইনি সহায়তা ছাড়া থানা ও কারাগারে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আটকসহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ভোগ করছে। প্রতিনিয়ত বিভাগীয় ও বড়ো বড়ো শহরে পথশিশুদের এ বিষয়ে আইনি ও সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের শিশুদের বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এ শিশুরা কেমন পরিবেশে বেড়ে উঠছে। শিশুরা রাষ্ট্রের বা সমাজের বোঝা নয়; সম্পদ, সামাজিক নেতিবাচক পরিবেশে শিশুটি কখনোই জাতির জন্য আগামীর বাংলাদেশের জন্য সম্পদ হয়ে উঠবার সুযোগ পাবে না বরং সমাজের জন্য বড়ো বোঝা এবং কখনো বা বড়ো চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারবে সহজেই এ শিশুরা। তাদের দরকার প্রতিদিনের প্রতি বেলা বেঁচে থাকার তাত্ক্ষণিক খাবারের ব্যবস্থা। এক বেলা খেলে দুই বেলা হয়ত না খেয়েই সূর্য ডুবে যায়। আবার পরের দিন সকালে একইভাবে সূর্য উঠে।
কিশোর বিচারব্যবস্থা শিশু অধিকারের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে পারছে না বিধায় প্রায় প্রতিদিন অনেক শিশু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য সন্দেহভাজন বা অভিযুক্ত হিসেবে সাজা পাচ্ছে। যে বিষয়টি শাশ্বত ও সার্বজনীন তা হলো—বিচারব্যবস্থা কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকেই আইনের চোখে নিরপরাধ ও মর্যাদা পাবার অধিকার রাখে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, কোনো (৯৯%) শিশুই অপরাধী হয়ে জন্মগ্রহণ করে না; এই শিশুরা যখন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে তা আমাদের সমাজব্যবস্থার কারণে। কাজেই সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের আওতায় আনতে হবে প্রতিটি শিশুকে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় ও ইতিবাচক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর ব্যক্তিত্ব ও আগ্রহের ওপর আস্থা রাখুন। শিশুদের ওপর অহেতুক বা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কিছু চাপিয়ে দেবেন না। এতে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বিঘ্নিত হয়। শিশুদের বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুস্থ ও নিরাপদ শৈশব ও কৈশোরকালীন অন্তত ৬-১০টি বছর সুষ্ঠু পরিবেশের মাধ্যমে বেড়ে ওঠার সুযোগ এবং অধিকার নিশ্চিত্ করতে পারলে আমরা যেমন একটি বর্ণাঢ্য ও ধনাঢ্য আগামী প্রজন্ম পাব, তেমনি এ শিশুরাও শিক্ষিত, দক্ষ ও উত্পাদনক্ষম সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে তাদের জীবন-মান। তার ফলশ্রুতিতে তারা তাদের পূর্ণাঙ্গ জীবনের অন্তত ২৫-৩০ বছর দক্ষ ও কর্মক্ষম সময় দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেবে সমৃদ্ধির পথে।
আমরা আনন্দিত যে অতি সম্প্রতি তরুণদের প্রতি অবদানের জন্য পুরস্কার পেলেন বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের অসামান্য সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ‘চ্যাম্পিয়ন অব স্কিলস ডেভেলপমেন্ট ফর ইয়্যুথ’ পুরস্কারটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর—বিগত বৃহস্পতিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ইউ এন প্লাজার ইউনিসেফ ভবনে। বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাক্সিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই) তাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ সম্মাননায় ভূষিত করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।
বর্তমানে বাংলাদেশকে বলা হয় তারুণ্যের দেশ। আর তাই এ শিশু-কিশোররাই তারুণ্যের পতাকা বহন করবে—এটাই আমাদের আকাঙ্ক্ষা। রাষ্ট্র ব্যবস্থার সব প্রতিষ্ঠান এখন শিশুবান্ধব ও তারুণ্যের জন্য নিরাপদ ও সহজ অভিগম্যতার পথ তৈরি রাখতে হবে। যাতে করে এ তরুণ সমাজ, তাদের নব নব স্বপ্ন জাগাতে কিংবা হারানো স্বপ্ন পুনর্বার জাগাতে পারলে তারা তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।
n লেখক :মানবাধিকার কর্মী, নির্বাহী পরিচালক, অপরাজেয়-বাংলাদেশ
