আবরার হত্যা অতঃপর

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৯, ২১:১৯

প্রজ্ঞা আহম্মদ জ্যোতি

বাংলাদেশে অতিরিক্ত পরিশ্রমী ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটি বিরাট অংশই বুয়েটের শিক্ষার্থী, যা আমার ধারণা। ভ্যানচালক বাবার যে সন্তানটি আবরারের খুনি, সেও একদিন হয়তো পত্রিকার খবর হয়েছিল এক ঝুড়ি স্বপ্ন এবং হারিকেনের আলোতে পড়ার জন্য। আজ সে খুনি। আমাদের সামাজিক অবস্থা তার মেধাকে দানবীয় রূপ দিল। ২০১৩-এর কারান জোহর নির্দেশিত ‘মাই নেইম ইজ  খান’ চলচ্চিত্রটি নিশ্চয় অনেকের দেখা হয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে আমি সিনেমাটি দেখেছিলাম আবরারের মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে।

মাই নেইম ইজ খানের গল্প অবতীর্ণ হয় মানুষিকভাবে অসুস্থ রিজোয়ানকে নিয়ে। যে ছোটোবেলা থেকে সমাজেরই মানসিক অসুস্থতার মধ্যে মায়ের দেওয়া সুশিক্ষায় বড়ো হয়েছিল। মায়ের মৃত্যুর পর মায়ের স্বপ্ন অনুযায়ী পাড়ি দিয়েছিল আমেরিকায়। আর সেখানেই সে তার প্রিয়তম মন্দিরার খোঁজ পায়। বিয়ের পর মন্দিরা এবং তার ছেলে রিজোয়ানের পদবি অনুযায়ী তাদের পদবি রাখে ‘খান’। এই ‘খান’ পদবিই নাইন-ইলেভেনের ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে কাল হয়ে দাঁড়ায় তাদের জন্য। হামলাকারী জঙ্গিরা যেহেতু ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করেছিল, তাই আমেরিকা জুড়ে শুরু হয় ইসলাম বিদ্বেষ। খান পদবি শুধু মুসলমানদেরই হয়। রিজোয়ান এবং মন্দিরার ছেলে স্যাম খুন হয় তার খুব কাছের বন্ধুর সহযোগিতায় ফুটবল মাঠে সিনিয়রদের হাতে। খুনের জায়গা ছিল খুনিদের এবং স্যামের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ফুটবল মাঠ। মানসিক প্রতিবন্ধী অবুঝ রিজোয়ান তখন ঘর থেকে বের হয়ে যায়, শুধু একটা কথা আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে জানাতে। তাহলো—‘আমার নাম খান, আমি টেরোরিস্ট না’। কিন্তু এই মতামত জানানোর ইচ্ছেই তার জীবনে দ্বিতীয় ঝড় হিসেবে আসে। সরকারি লোকজনের কানে শুধু টেরোরিস্ট কথাটি যায়। বন্দি করা হয় রিজোয়ানকে। অত্যাচার করা হয় স্বীকার করাতে রিজোয়ান টেরোরিস্ট। জনতার আন্দোলন এবং একটি টিভি চ্যানেলের সাহসিকতায় রিজোয়ানকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় আমেরিকান পুলিশ।

আবরারেরও মৃত্যু হয়েছিল স্যামের মতো, তার প্রিয় জায়গায় তার বন্ধুদের হাতে। আবরারের দোষটা ছিল রিজোয়ানের মতো। কারণ আবরার তার মতপ্রকাশ করেছিল। এখন আমি আবরারের মতামত ভুল নাকি সঠিক ছিল, সে আলোচনায় যাব না। শুধু আমি বলব, একজন স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আবরার মতপ্রকাশের অধিকার নিয়েই জন্মেছে। সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারো নেই। যদি তার মতামত দেশের জন্য ক্ষতিকর হতো, তাহলে আইন ছিল ব্যবস্থা নেওয়ার। তাকে নির্মমভাবে হত্যা করার মাধ্যমে শুধু মৃত আবরারের নয়, হুমকি দেওয়া হয়েছে সমস্ত নিরপরাধ জনগণের বাকস্বাধীনতাকে। এখন অনেকেই বলছেন, এর জন্য ছাত্ররাজনীতি দায়ী। ছাত্রদের প্রতিবাদই আমাদের ইংরেজ এবং পাকিস্তান শাসন থেকে রক্ষা পাওয়ার অন্যতম হাতিয়ার ছিল। ভাষা আন্দলোনের সৃষ্টি হয়েছিল সেই ছাত্ররাজনীতির হাত ধরেই। ছাত্ররা যদি তাদের যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাজে না লাগায়, তাহলে কারা করবে তাদের এই কাজগুলো। তাই ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করে বা কলুষিত করে আবরারের খুনের বিচার হবে না। বরং যারা এই ছাত্ররাজনীতিকে কলুষিত করে, ছাত্রদের তাদের ভাইয়ের খুনি বানাচ্ছেন তাদের কাছে অনুরোধ রইল। দয়া করে কলুষিত রাজনৈতিক  জ্ঞান এই মেধাবীদের ওপর প্রয়োগ করবেন না । ছাত্রদের ‘জানোয়ার’ নয় মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সহযোগিতা করুন।

n  লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়