আবরার ফাহাদকে শেরেবাংলা হলের দোতলায় ছাত্রলীগ বুয়েট শাখার উপ-আইনবিষয়ক সম্পাদক অমিত সাহার ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়। তাকে শিবির করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আবরার অস্বীকার করেন। পরে ইফতি ও তানভীরকে আবরারের কক্ষে পাঠিয়ে দেন অনিক সরকার। তারা আবরারের কক্ষ থেকে তার দুটি মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ নিয়ে আসেন। অনিক একটি মোবাইল ফোনে আবরারের ফেসবুক ঘেঁটে কিছু উসকানিমূলক বক্তব্য পান। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘ক্যাম্পাসে কারা শিবির করে, তুই তাদের নাম বল।’ আবরার চুপ থাকেন। তখন তিনি আবরারকে কিল-ঘুষি মারতে থাকেন। এরপর ছাত্রলীগ বুয়েট শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন তাকে চড়-থাপ্পড় মারেন। ছাত্রলীগ বুয়েট শাখার উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশারফ সকালও চড়-থাপ্পড় মারতে থাকেন। একপর্যায়ে সামসুল আরেফিন ক্রিকেট স্টাম্প নিয়ে আসেন। অনিক সেই স্টাম্প নিয়ে আবরারের হাঁটুতে পেটাতে থাকেন। এভাবে দুই দফা পেটান অনিক।
আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রিমান্ডে থাকা বুয়েট ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার গতকাল শনিবার এভাবেই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গত ৬ অক্টোবর আবরার খুন হওয়ার পরপরই ঐ রাতে বুয়েট ক্যাম্পাস থেকে যে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তাদের একজন অনিক। তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পঞ্চদশ ব্যাচের শিক্ষার্থী। গ্রেপ্তারের পর এই ১০ জনের সঙ্গে অনিককেও পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছিল পুলিশ।
এদিকে আবরার হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার আরেক আসামি মাজেদুল রহমান নওরোজকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল শনিবার পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি। এই হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আরেক আসামি বুয়েটের ছাত্র মোয়াজ আবু হুরায়রাকে ঢাকার উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টর থেকে গতকাল গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মোয়াজের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের ওসমানপুরের পীরপুর গ্রামে। মোয়াজের বাবার নাম মাশরুর-উজ-জামান। এ নিয়ে ঘটনার পর থেকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত মোট ১৯ জন গ্রেপ্তার হলেন। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি ১৫ জন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ, তথ্য ও প্রসিকিউশন বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার ফজলুর রহমান জানান, অনিক সরকার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। মহানগর হাকিম আতিকুল ইসলাম তার খাসকামরায় আসামির জবানবন্দি নেন। জবানবন্দি নেওয়ার পর অনিককে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ নিয়ে এ ঘটনায় মোট তিন জন আদালতে জবানবন্দি দিলেন। এর আগে জবানবন্দি দেন বুয়েট ছাত্রলীগের উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল ও ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন। তাদেরও কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
জবানবন্দিতে যা বললেন অনিক :অনিক জানিয়েছেন, ঘটনার চার-পাঁচ দিন আগে আবরার আমাদের টার্গেটে ছিল। ঘটনার দিন সে (আবরার) গ্রামের বাড়ি থেকে আসার পর সন্ধ্যায় তাকে ২০১১ নম্বর কক্ষে ডাকা হয়। আবরারকে প্রথম চড়-থাপ্পড় মারেন মেহেদী। এরপর আমি তাকে কিল-ঘুষি দেই। বলি যে ক্যাম্পাসে কারা কারা শিবির করে। তখন ইফতিও চড়-থাপ্পড় মারতে থাকে। এরপর আমি (অনিক) ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে তার পায়ে পেটাতে থাকি। দুই হাত টান টান করে স্টাম্প দিয়ে আঘাত করি আবরারকে। আবরার তখন চিত্কার করে কাঁদতেও পারেনি। কারণ অন্যরা আবরারের মুখ চেপে ধরে রেখেছিল। এভাবে থেমে থেমে স্টাম্প দিয়ে পেটাতে থাকে ইফতি, মেফতাহুল জিয়ন। এভাবে মার চলছিল রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত। এরপর আবরারকে কক্ষে রেখে দিয়ে ইফতি, জিয়ন, আমিসহ অন্যরা ক্যান্টিনে খেতে যাই। খাবার খেয়ে ফিরে এসে দেখি আবরার মেঝেতে পড়ে আছে। বমি করেছে। আমি ভাবি, সে ভান করেছে। আবারও স্টাম্প দিয়ে আমি তাকে পেটাই। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে মেঝের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা আবরারের পিঠে স্টাম্প দিয়ে পেটানো হয়। একপর্যায়ে আবরার নিস্তেজ হয়ে পড়ে। পরে আবরারকে ঐ কক্ষ থেকে বের করে পাশের ২০০৫ নম্বর কক্ষে নেওয়া হয়। ঐ কক্ষে আবরার বমি করে। মেহেদী তখন আবরারকে পুলিশের হাতে দেওয়ার জন্য নিচে নামাতে বলে। এরপর আমি, জেমি, মোয়াজ, শামীমসহ তিন-চার জন তাকে কোলে করে সিঁড়িঘরের পাশে নিয়ে যাই। পরে পুলিশ ও চিকিত্সকদের খবর দেওয়া হয়। চিকিত্সক এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আবরার মারা গেছে আমরা বুঝতে পারিনি। এ ঘটনায় আমি অনুতপ্ত।’
