শীর্ষ সন্ত্রাসীর দেহরক্ষী থেকে শত কোটি টাকার মালিক রানা মোল্লা

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৯, ২২:২২

এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর দেহরক্ষী থেকে এখন শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন ল্যাংড়া রানা মোল্লা। বিএনপির সাবেক দুই মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। এখন যুবলীগ নামধারী নেতা। ক্যাসিনো পরিচালনাকারী কৃষক লীগ থেকে বহিষ্কৃৃত সফিকুল আলম ফিরোজের মাঠ নিয়ন্ত্রক হিসেবেও পরিচিত রানা মোল্লা। সম্প্রতি ক্যাসিনো-দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য ও রানা মোল্লার গ্রামের বাড়ির আশপাশের মানুষের সঙ্গে কথা বলে এসব জানা গেছে।

আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ-কারীদের অন্যতম রানা মোল্লা। ঢাকা শহর যুবলীগের নেতা পরিচয় দিয়ে নানা অপকর্মে লিপ্ত থাকতেন। রানার সন্ত্রাসী বাহিনীর মাধ্যমেই বায়রা দখল, ক্যাসিনো দখল, বাড়ি ও ফ্ল্যাট দখল, গরুর হাট দখল- এক কথায় সকল অপকর্ম করাতেন ফিরোজ। তার সন্ত্রাসী বাহিনীতে রয়েছে লালবাগের পিন্টুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী যুবদল নেতা বাবু, ধনিয়ার পলাশ, শামিম, মুগদার পিয়াস। এরা নিজেদের বিভিন্ন ওয়ার্ডের যুবলীগ নেতা দাবি করেন। মূলত এরা অনুপ্রবেশকারী।

ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সালে আন্ডারওয়ার্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও রানা মোল্লার মধ্যে গোলাগুলি হয়। গোলাগুলিতে খালেদ ও রানা দুজনেই পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। সেখান থেকে দুই জন ল্যাংড়া নামে পরিচিত।

ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ মডেল থানার হযরতপুর ইউনিয়নের ঢালীকান্দি গ্রামের বাসিন্দা রানা মোল্লা (৪৫)। শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশের দীর্ঘদিন দেহরক্ষী থেকে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড, নিউ মার্কেট ও গাউছিয়া মার্কেট এলাকায় প্রতিদিন ৪ লাখ টাকা চাঁদা তুলতেন। ২০০৬ সালে চাঁদা তুলতে গিয়ে রানা মোল্লা  অপর পক্ষের গোলাগুলিতে আহত হন। এরপর থেকে টাইটেল পান ল্যাংড়া রানা মোল্লা নামে। বিকাশের পতন ঘটলে ২০০৮ সালে রানা মোল্লা যোগ দেন পুরান ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী ডাকাত শহীদের দলে। ডাকাত শহীদের দলে থেকে পুরান ঢাকার নবাবপুর, ধোলাইখাল ও ইসলামপুর মার্কেট থেকে প্রতিদিন ১০ লাখ টাকা চাঁদা তুলতে থাকেন। এ চাঁদা তোলায় ছাত্রদল নেতা সাগীর, বিনা ও হোসেন কমিশনার ব্যবসায়ীদের পক্ষ নিয়ে ডাকাত শহীদ ও রানা মোল্লাকে ওই তিন মার্কেট থেকে চাঁদা তোলা বন্ধ করার জন্য হুঁশিয়ারি দেন। মাত্র ৯ মাসের ব্যবধানে ডাকাত শহীদের নির্দেশে রানা মোল্লা প্রথমে ছাত্রনেতা সাগীরকে ধোলাইখাল এলাকায় গুলি করে হত্যা করে। এরপর নবাবপুর এলাকায় মোহাম্মদ হোসেন কমিশনারকে গুলি করে হত্যা করে। এর তিন মাস পরে তাঁতীবাজার এলাকায় ছাত্রদল নেতা ও কমিশনার বিনয় সরকার বিনাকে, রানা মোল্লা গুলি করে হত্যা করলে ডাকাত শহীদ ও রানা মোল্লার আধিপত্য আরো বেড়ে যায়। তখন বিএনপি নেতা ও সাবেক এক মেয়য় রাজনৈতিক আশ্রয় দেন ডাকাত শহীদ ও রানা মোল্লাকে।  তাদের দিয়ে ওই মেয়র কোতোয়ালী থানার পাশে ও সদরঘাট ফায়ার সার্ভিসের বিপরীতে ৬৫ কাঠার ( নুরু মিয়ার টিনসেড) মার্কেট  দখল করে নিয়ে ১৩ তলা বিশিষ্ট গ্রেট ওয়ার্ল্ড মার্কেট তৈরি করে। এছাড়া নবাবপুর, ধোলাইখাল ও সুত্রাপুর এলাকায় ৩০ টি মার্কেট ও ৩৫ টি বাড়ি সাবেক মেয়রকে দখল নিয়ে দেয়। উল্লেখ্য, ওই মেয়র ও ডাকাত শহীদের গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান থানা এলাকায় এবং তারা দুজনে সম্পর্কে চাচাতো ভাই। ২০১৪ সালে পুরান ঢাকার কবি নজরুল সরকারি কলেজের সামনে ক্রসফায়ারে ডাকাত শহীদ নিহত হলে রানা মোল্লা ভারতে পালিয়ে যায়। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ এসে মোহাম্মদপুর আশ্রয় নিয়ে বিএনপির সাবেক দুই মন্ত্রীর শেল্টার নিয়ে আবারো চাঁদাবাজি ও হত্যাসহ বিভিন্ন অপকর্ম চালায় রানা মোল্লা।

রানা মোল্লা এক সময় স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু হযরতপুর থেকে শুরু করে পুরো কেরানীগঞ্জে তিনি ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হয়ে উঠলে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং বাড়িঘরে আগুন দেওয়াসহ ২০টির বেশি ভয়ঙ্কর সব অপরাধের সঙ্গে জড়িত রানা মোল্লা। তার বাহিনীতে আরও আছে বাবু, আলমগীর, তাজু, মজিবর, রাজন, জাহিদুল, রায়হান, এমারতসহ ২৫ থেকে ৩০ জন। ধলেশ্বরী নদীসহ আশপাশের নদীর বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন তারা। জমি দখল করে, কেনাবেচায় কমিশন নেয় তারা। শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ নেতা কেউই রেহাই পায় না তাদের চাঁদাবাজি থেকে। কেরানীগঞ্জ মডেল থানা ও সাভার মডেল থানাসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলাও রয়েছে তাদের নামে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে রানা মোল্লা রাজধানীর শাহজাহানপুরের ভয়ঙ্কর ত্রাস হয়ে ওঠে। ২০১০ সালের আগস্টে রানা ও তার বাহিনী কেরানীগঞ্জের জগন্নাথপুর গ্রামের আলী চৌকিদারের বাড়ির পাশে সিরাজ, পারভীন, আসমা, শিউলিসহ ৮ জনের বাড়িতে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আলাউদ্দিন মিয়া সাভারের বাড়িতে ফেরার পথে ব্যাংক টাউন এলাকায় হামলার মুখে পড়েন। তার দুই ঊরুতে ৪টি গুলি লাগে। অভিযোগ রয়েছে, আলাউদ্দিনকে সরিয়ে দিতেই রানা মোল্লা তাকে হত্যার চেষ্টা করে। কারণ হযরতপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের সময় তারা দুই জনেই সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ছিল। রানা মোল্লা চরআলগীর চর গ্রামের জালাল মেম্বার মোড়ে মসজিদের ভেতর ঢুকে হত্যা করে একই প্রামের আতাবর মিয়ার ছেলে নামাজরত ইয়ার হোসেনকে। এ ঘটনায় এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে রানা মোল্লার গ্রেফতারসহ বিচার দাবি করলেও কিছুই হয়নি তার। ঢালিকান্দির ধলেশ্বরীর এলাকার আনু মিয়াকে গুলি করে খুন করেন রানা মোল্লা।