চলতি বছর ইলিশের প্রজনন মৌসুম পালটালেও পালটায়নি নিষেধাজ্ঞার সময়। গত বুধবার থেকে ২২ দিন পর্যন্ত জেলেদের ইলিশ শিকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এই নিষেধাজ্ঞার সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ বিবিধ কারণে গত কয়েক বছর ইলিশের ডিম ছাড়ার সময়ের তারতম্য সৃষ্টি হচ্ছে। গত আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সাগর ও নদীতে ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা পড়েছে; কিন্তু গত ১৫-২০ দিন ধরা পড়া ইলিশের পেটে ডিম ছিল না। আর নদীর ইলিশের আকৃতিও ছিল জাটকা বা তার থেকে একটু বড়ো। বাজারে ডিমওয়ালা ইলিশ খুঁজে পাওয়া যেত অতি সামান্য। তার আগে বিশেষ করে ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর গত ২৫ জুলাই থেকে জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ডিমওয়ালা ইলিশ উঠে আসে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারগুলো ডিমভরা ইলিশে সয়লাব হয়ে যায়। সাগরে ধরা পড়ে প্রচুর মা ইলিশ। তখন এসব ইলিশ ডিম ছাড়ার জন্য উপকূলের নদনদীতেও আসে।
বরগুনার পাথরঘাটা সংবাদদাতা জানান, বলেশ্বর ও বিষখালী নদীর মত্স্যজীবীরা বলছেন, ১২-১৪ দিন আগেও নদীতে প্রচুর মা ইলিশ ধরা পড়েছে। তারপর ধরাপড়া ইলিশের সিংহভাগই জাটকা বা তার থেকে কিছুটা বড়ো আকৃতির। জেলেদের ধারণা—প্রজননের উপযুক্ত সময় গেছে সেপ্টেম্বরে; কিন্তু তখন মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা ছিল না। এখন মা ইলিশ খুবই কম হওয়া সত্ত্বেও নিষেধাজ্ঞায় কতটা সুফল আসবে তা বলা যাচ্ছে না।
বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সরোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, সাগর থেকে নদীতে ইলিশ আসে ডিম ছাড়ার জন্য। তবে এক্ষেত্রে সময়ের তারতম্য ঘটছে। একারণে সংশ্লিষ্টদের প্রধান কর্তব্য—সবকিছু বিশ্লেষণ করে সঠিক সময় নির্ধারণ করা। আগে ইলিশকে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়ার সময় ১৫ দিন থাকলেও এখন ২২ দিন করা হয়েছে। এরপরেও দেখা যায়, নদীতে জেলের জালে প্রচুর ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা পড়ছে। আসলে ইলিশ কখন ডিম ছাড়বে তা কয়েকটি পরিস্থিতি ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। তিনি জানান, ইলিশ ডিম ছাড়তে সাগর থেকে নদীতে চলে আসবে। তবে নদীতে আগমনে বাধা সৃষ্টি হলে বিশেষ করে নদীতে প্রয়োজনীয় স্রোত ও গভীরতা না পেলে ইলিশ ফিরে যায়। নদীতে আসার পথে যদি ডুবোচরে বাধাপ্রাপ্ত হয় তাহলেও ইলিশ পুনরায় সাগরে ফিরে যায়। এক্ষেত্রে ডিম ছাড়ার স্থান ও সময়ের তারতম্য ঘটতে পারে। তখন বাধ্য হয়ে ইলিশ সাগরে ফিরে গিয়ে ডিম ছেড়ে দেয়। সেক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত সময় এবং নির্দিষ্ট করা নদীতে যেখানে ইলিশের জন্য অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হয়েছে সেখানে ইলিশ আসেও না, ডিমও ছাড়ে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবছর নিষেধাজ্ঞা হওয়া উচিত ছিল সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে। সরকারিভাবে চান্দ্র মাসের ভিত্তিতে প্রধান প্রজনন মৌসুম ধরে এ বছর আশ্বিন মাসের শেষ পূর্ণিমার দিন এবং তার পরের মোট ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ করেছে। অনেক অভিজ্ঞ জেলেদের মতে—ইলিশ প্রজনন মৌসুম মূলত শুরু হয়েছে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত। এই সময়ে মা ইলিশ ডিম ছাড়ার জন্য উপকূলের নদনদীতে আসে; কিন্তু পুরো সেপ্টেম্বর জুড়ে সাগরে মা ইলিশ ধরা পড়েছে। ঐ ইলিশগুলোই ডিম ছাড়ার জন্য স্বাধু পানির নদনদীতে প্রবেশ করার উপযুক্ত সময় ছিল সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে।
এদিকে জানা যায়, সরকার দেশে ইলিশের জন্য আগে মোট পাঁচটি অভয়াশ্রম নির্ধারণ করে দিলেও বরিশালের আশপাশের ৮২ কিলোমিটার নদীপথকে নিয়ে নতুন অভায়শ্রম ঘোষণা করেছে। এই ছয়টি অভয়াশ্রম হচ্ছে—পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় আন্ধারমানিক নদীর ৪০ কিলোমিটার, চর ইলিশার মদনপুর থেকে ভোলার চরপিয়াল পর্যন্ত মেঘনা নদীর ৯০ কিলোমিটার, ভোলার ভেদুরিয়া থেকে চররুস্তম পর্যন্ত তেঁতুলিয়া নদীর ১০০ কিলোমিটার, চাঁদপুরের ষাটনল থেকে চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনার ১০০ কিলোমিটার, শরীয়তপুরের নড়িয়া থেকে ভেদরগঞ্জ পর্যন্ত পদ্মার ২০ কিলোমিটার এবং বরিশাল সদরের কালাবদর নদীর হবিনগর পয়েন্ট থেকে মেহেন্দীগঞ্জের বামনীরচর পয়েন্ট পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার, মেহেন্দীগঞ্জের গজারিয়া নদীর হাটপয়েন্ট থেকে হিজলা লঞ্চঘাট পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার এবং হিজলার মেঘনার মৌলভীরহাট পয়েন্ট থেকে মেহেন্দীগঞ্জ সংলগ্ন মেঘনার দক্ষিণ-পশ্চিম জাঙ্গালিয়া পয়েন্ট পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার। এছাড়া আড়িয়াল খাঁ, নয়নভাঙ্গুলি ও কীর্তনখোলা নদীর আংশিক অভয়াশ্রমটির অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু বলেন, সরকার ইলিশের উত্পাদন বৃদ্ধি ও সংরক্ষণে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। সরকারের নানামুখী উদ্যোগের ফলেই ইলিশের উত্পাদন বেড়েছে। আর মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়েছে ইলিশ। আমাদের এবারের উদ্যোগের ফলেও ইলিশের উত্পাদন বাড়বে।
