বিস্ময়কর নৈঋতা...

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ১৯:৩৫

তার নাম নৈঋতা হালদার। বয়স কতই বা হবে, ১৩ কী ১৪! এই বয়সে তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনেক পদক-পুরস্কার। নৈঋতা হালদার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শিক্ষামন্ত্রীর হাত থেকে চারবার পুরস্কার গ্রহণ করেছে। তার সফলতা অর্জন শিশুদের নয়, বড়দেরও মন কেড়েছে। এর মধ্যে এতিম-বৃদ্ধাদের দুয়ারে নতুন প্রত্যুষ এনে দেওয়ার স্বপ্ন ও অঙ্গীকারেও জীবন উত্সর্গ করেছে নৈঋতা। এখন নৈঋতার স্বপ্ন কল্পনা ও বাস্তবতায় নারীবাদী আদর্শ রয়েছে অনেক। জাতীয় অঙ্গনে প্রতিবছর বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জনে অনেক জাতীয় রেকর্ডও যুক্ত হচ্ছে তার ঝুঁলিতে। প্রতিবছরই রোমাঞ্চ ঘিরে ধরে তাকে।  

স্কুল পড়ুয়া মেয়েটি স্কুলের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে সঞ্চয় করছেন! এ সঞ্চয় তার নিজের জন্য নয়, এ সঞ্চয় একই ছাদের নিচে বৃদ্ধাশ্রম ও এতিমখানা বানানোর। কতটা মানবিক আর মানববাদী আষ্টেপিষ্টে ধরলে একজন কিশোরীর ভেতর এই গভীর জীবনবোধ সৃষ্টি হতে পারে!

হেমেন্দ্রনাথ হালদার তার নাতনির নাম রেখেছেন নৈঋতা। নৈঋতা শব্দের অর্থ মহীয়সী নারী। দাদুর রাখা নামের সম্মান রাখতে যেন বদ্ধপরিকর নাতনি নৈঋতা। টাঙ্গাইল পুলিশ লাইনস আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী নৈঋতা। নৈঋতা হালদার এবারের জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ ২০১৯-এ জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থীর (বিদ্যালয়) মর্যাদা পেয়েছে। শুধু তাই নয়, এই প্রতিযোগিতায় সে জাতীয়ভাবে তাত্ক্ষণিক অভিনয়ে দ্বিতীয় এবং লোকনৃত্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, এক বর্ষে জাতীয়ভাবে ৩টি পুরস্কার পাওয়া দেশের একমাত্র শিক্ষার্থী হলো নৈঋতা হালদার।

বাবা অরিন্দম হালদার ও মাতা চিনো রানি বিশ্বাসের একমাত্র মেয়ে নৈঋতার জন্ম ২০০৫ সালের ৪ মে মির্জাপুর উপজেলার বহনতলী গ্রামে মামার বাড়িতে। পৈত্রিক নিবাস গোপালগঞ্জ জেলা শহরে। নৈঋতার বাবা একজন ব্যবসায়ী এবং মা সরকারি সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষিকা।

মায়ের চাকরির সুবাদে নৈঋতার বেড়ে ওঠা টাঙ্গাইলে। সে ২০১৫ সালে কুর্নি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মির্জাপুর উপজেলায় প্রথম স্থান অধিকার করে। এরপর টাঙ্গাইল পুলিশ লাইনস আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৮ সালে জেএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করে। 

নিয়মমাফিক জীবনযাপন একবারেই অপছন্দ নৈঋতার। কিন্তু সময়ের মূল্য দিতে দারুণ অভ্যস্ত সে। বিদ্যালয়ের পড়া শেষ করেই ছবি আঁকে, আবার ছবি আঁকা শেষ করেই মনোনিবেশ করে গান-নৃত্যে। এভাবে চলে তার মনের আলোর নাচন!

সে প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০১৪ সালে জাতীয়ভাবে অভিনয়ে প্রথম, ২০১৫ সালে উপস্থিত বক্তব্যে দ্বিতীয় এবং আবৃত্তিতে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে। এছাড়া ২০১৮ সালে শাপলা কাপ অ্যাওয়ার্ড এবং তাত্ক্ষণিক অভিনয়ে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। সব মিলিয়ে নৈঋতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শিক্ষামন্ত্রীর হাত থেকে চারবার করে পুরস্কার গ্রহণ করেছে। ২০১৯ সালের সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় ভাষা ও সাহিত্যে টাঙ্গাইল জেলায় প্রথমস্থান অধিকার করে। এছাড়া জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে পেয়েছে অসংখ্য পদক-পুরস্কার।

এই বয়সে বাংলা, ইংরেজির পাশাপাশি সে বুঝতে পারে আরো কয়েকটি ভাষা। কার্টুন দেখে শিখেছে হিন্দি, উর্দু আর জাপানি ভাষা। অবসরে কবিতা গল্প লিখতে পছন্দ তার। ২০১৯ সালে ফেব্রুয়ারিতে নৈঋতার লেখা ‘ময়না আমার বাবুই সোনা’ নামের একটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। টাঙ্গাইলের জেলা শিল্পকলা একাডেমি, সিডিসি ক্লাব এবং জেলা শিশু নাট্যদলের তত্ত্বাবধায়নে নিয়মিত গান, নাচ ও অভিনয় চর্চা করে থাকে।

টাঙ্গাইলের পুলিশ লাইনস আর্দশ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আব্দুল কাদের বলেন, নৈঋতার মতো অল সাইডে এত মেধাবী শিক্ষার্থী আমাদের স্কুলে কখনো আসেনি। আমার জানা মতে, এতগুলো জাতীয় পুরস্কার পাওয়া দেশের একমাত্র ছাত্রী সে। আমার বিশ্বাস মেধা মনন ও সৃষ্টিশৈলীতে একদিন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে নৈঋতার সুনাম সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। জাতীয় প্রতিযোগিতায় ১১টি বিষয়ে যাচাই-বাছাই শেষে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী নির্বাচিত করা হয়। আমরা ওর জন্য গর্বিত। 

টাঙ্গাইল জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লায়লা খানম বলেন, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, নৈঋতা ও তার মায়ের সার্বিক প্রচেষ্টার ফলে এই শ্রেষ্ঠত্ব এসেছে। অর্জন ধরে রেখে আগামীতে আরো ভালো করবে এবং একজন ভালো মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে এই প্রত্যাশা করি। 

নৈঋতার গর্বিত মা চিনো রানি বিশ্বাস। সন্তানের সফলতার মধ্য দিয়ে অনেক মা খুঁজে পান আত্মতৃপ্তি। তিনি বলেন, ‘ওর চিন্তা-ভাবনা সবসময় প্রগতিশীল এবং ছোটবেলা থেকেই একটু বেশি পরিপক্ক মানসিকতার। একজন মা সন্তানের সাফল্যেই প্রকৃত সুখ পান। আমি চাকরি-সংসার ম্যানেজ করে ওর জন্য অনেক কষ্ট করি। দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী হওয়ায় আমি আনন্দিত। আমি অবাক হই নৈঋতা যখন টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে জমা রাখে ওর স্বপ্নের বৃদ্ধাশ্রম ও এতিমখানার জন্য। ও যেন একজন ভালো মানুষ হয়ে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারে তার জন্য সকলের আশির্বাদ চাই।’  

নৈঋতা হালদার ইত্তেফাককে বলেন, ‘এই প্রাপ্তিতে আমি খুবই খুশি। আর এই প্রাপ্তির কৃতিত্ব আমার মায়ের। যিনি আমাকে বন্ধুর মতো সবকিছুতেই আগলে রাখেন।’ নিজের স্বপ্ন নিয়ে নৈঋতা দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘আমি বড় হয়ে পররাষ্ট্র সচিব হতে চাই। কারণ আমার প্রিয় বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। বিশ্বের সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক যত শক্তিশালী এবং পারস্পরিক বিনিময় তরান্বিত হবে এদেশ ততই উন্নত হবে। আমি সেই কাজে অংশ নিতে চাই। আর আমি একই ক্যাম্পাসে বৃদ্ধাশ্রম ও এতিমখানা বানাবো। আমি কখনো সময় অপচয় করি না। প্রকৃতিকে ভালোবাসি, প্রকৃতিকে নিয়ে লিখি। এতে মন উদার হয়।’

জেলায় একজন কিশোরী কন্যা নানা বিষয়ে দেশসেরা শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর বয়ে এনেছেন! এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের অনেক নামীদামি প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের পেছনে ফেলে টাঙ্গাইলের মেয়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী হওয়া অত্যন্ত গৌরবের বিষয়। এ অর্জন পুরো টাঙ্গাইলবাসীর। এ সাফল্যে টাঙ্গাইলের অন্য ছাত্রছাত্রীরা অনুপ্রাণিত হবে এবং আমরা নৈঋতা হালদারকে আরো উত্সাহ দেবো।’

নৈঋতা হালদারের ঝুলে থাকা স্বপ্নগুলো আরো উজ্জ্বল, বর্ণিল হোক। স্বপ্নতাড়িত স্বপ্নের আলোয়, তার স্বপ্ন বেঁচে থাকুক! ইচ্ছেগুলো পূরণ হোক।