ভারতে দুই দিনের সফর শেষ করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তামিলনাড়ুর প্রাচীন শহর মামাল্লাপুরমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ঐ দুই দিন অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হন তিনি। দুই নেতার মধ্যে এটি ছিল দ্বিতীয় অনানুষ্ঠানিক বৈঠক। এর আগে গত বছরের এপ্রিলে মধ্য চীনের উহানে দুই নেতা প্রথম অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হন। ঐ বৈঠকে বৈশ্বিক ও দ্বিপাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন তারা। তবে এবারের বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বিষয় অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে একমত হয়েছেন দুই নেতা। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যোগাযোগ উন্নত করতে, সীমান্তে নতুন করে আস্থা বৃদ্ধিতে নতুন পদক্ষেপ নিতে সম্মত হয়েছেন তারা। দুই প্রতিবেশী দেশ বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ দমনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ককে আরো জোরদারে একমত হয়েছে দুই দেশ। একটি বিষয় জোর দিয়ে নেতারা বলেছেন, এই বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কে নতুন যুগের সূচনা করেছে।
বিশ্লেষকরাও এবারের সম্মেলনকে ফলপ্রসূ বলছেন। তাদের মতে, এই ধরনের বৈঠকে বহু বিষয়ে আলোচনার সুযোগ থাকে। সে কারণে কখনো কখনো এই আলোচনা আনুষ্ঠানিক আলোচনার চেয়েও বেশি ফলপ্রসূ হয়। এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক সম্মেলনগুলোতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি, মুক্ত ও অকপট আলোচনা হয়ে থাকে। যা দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক পূর্ব নির্ধারিত বিষয় স্থিরীকৃত বৈঠকে সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো প্রয়োজন অনুভব করলেই এ ধরনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে পারে। যেমন: আন্তঃসরকারি সংস্থা আসিয়ান ১৯৯৬, ১৯৯৭, ১৯৯৯ এবং ২০০১ সালে চারটি অনানুষ্ঠানিক সম্মেলন আয়োজন করেছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৮ সালের নভেম্বরে সিঙ্গাপুরে আয়োজিত আসিয়ান-ইন্ডিয়ান অনানুষ্ঠানিক সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন।
চীনই একমাত্র দেশ নয় যাদের সঙ্গে ভারতের অনানুষ্ঠানিক সম্মেলন হয়ে থাকে। ২০১৮ সালের মে মাসে, মোদি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে রাশিয়ার সোচিতে এমন সম্মেলনে মিলিত হন এবং সেখানে বৃহত্তর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক বিষয়ে আলোচনা করেন। ২০১৯ সালের জুন মাসে জি-২০ সম্মেলনের পাশাপাশি রাশিয়া, চীন ও ভারত একযোগে অনানুষ্ঠানিক সম্মেলন আহ্বান করে এবং সেখানে দেশের আর্থিক, নিরাপত্তাজনিত এবং রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা হয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের উদ্যোগ অনেকটাই ফলপ্রসূ। শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, আমরা প্রতিজ্ঞা করেছি, নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ বাড়িয়ে তাকে গোটা বিশ্বের আলোচ্য বিষয় করে তুলব না। ‘উহান স্পিরিট’ আমাদের সম্পর্ককে নতুন গতিবেগ দিয়েছিল। ‘চেন্নাই কানেক্ট’ নতুন যুগের সূচনা করল। একই সুরে চীনা প্রেসিডেন্ট বলেছেন, আমরা বন্ধু হিসেবেই হূদয় খুলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে স্পষ্ট আলোচনা করেছি। গভীর এবং ভালো আলোচনা হয়েছে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, এই সফর ফলপ্রসূ হয়েছে। তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন চীনা ড্রাগন ও ভারতের হাতির একসঙ্গে নাচের!
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের বৈঠকে সীমান্ত সংঘাত, পাকিস্তান ও কাশ্মীরের মতো বিতর্কিত ইস্যুতে দুই নেতার মধ্যে কথা হয়নি। বরং দুই নেতা বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ দমনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ভারতের জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ স্কুলের অধ্যাপক রাজন কুমার বলেন, সীমান্ত ইস্যুর রাতারাতি সমাধান হবে সেটা ভারত বা চীন কেউই আশা করে না। কিন্তু তারা জানে যে, এক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বা সংঘাত দুই দেশের স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ কারণে তারা এই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।
দিল্লির কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, অতীতে বৈঠকের পরেও চীনের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু এবার চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যমে শি-র সফর সংক্রান্ত প্রতিবেদনে কাশ্মীর ইস্যুতে কিছু বলা হয়নি। বরং তাতে বলা হয়েছে, সীমান্ত-সমস্যার ক্ষেত্রে দুই পক্ষের গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজতে হবে। পরস্পরের মূল বিষয়গুলো নিয়ে সতর্কভাবে এগোতে হবে। যে সমস্যাগুলোর একবারে সমাধান সম্ভব নয়, সেগুলোকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই বিষয়টি এবারের অনানুষ্ঠানিক সম্মেলনের বিশেষ প্রাপ্তি বলেই নয়াদিল্লি মনে করছে। এবারের সফর ফলপ্রসূ হওয়ায় চীনে তৃতীয় অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মোদিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন শি জিনপিং।
চীনা প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন নরেন্দ্র মোদি। এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক বৈঠক নানা ইস্যুর সমাধান করে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
