‘মাথাগরম’ প্রেসিডেন্ট

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ২০:৫০

তখন তিনি ম্যানিলার ক্যাথলিক কলেজে ল স্কুলের শেষ বর্ষের ছাত্র। অস্পষ্ট উচ্চারণের কারণে সতীর্থদের কাছে হাসি-তামাশার পাত্র। কিন্তু তার যে এসব সওয়ার অভ্যাস নেই। পরিহাসের সীমা অতিক্রম করলে তরুণ রডি (ফিলিপিনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে বন্ধুদের কাছে তখন এ নামেই পরিচিত) সেদিন এক সহপাঠীকে সোজা গুলি করে বসলেন। এতে অবাক হওয়ার মতো কিছুই ছিল না। কারণ তিনি যে তখন ফিলিপিনের দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপ মিন্দানাওয়ের প্রাদেশিক গভর্নরের উদ্ধত ছেলে। রাজনৈতিকভাবে দেশের গণ্যমান্য লোকদের অনেক সন্তানের মতো তিনিও বহু বাড়তি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে প্রতিপালিত হচ্ছিলেন। বড়ো হচ্ছিলেন বন্দুক ও দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত থেকে। নিজ শহরে থাকাবস্থায় একদিন উড়িয়ে বসলেন নিজের বাবার বিমান। পাদ্রীদের দ্বারা পরিচালিত সেখানকার এক বয়েজ’স স্কুলে পড়ার সময় তার চলাফেরা ছিল সেখানকার হোমড়াচোমড়াদের ছেলেদের সঙ্গে। আমজনতার সঙ্গে মেশার কোনো আগ্রহই দেখাতেন না। অথচ রাজনীতিতে জনপ্রিয়তাবাদ বেছে নিয়ে তিনি আজ ফিলিপিনের খোদ রাষ্ট্রপতি। কিন্তু কথা বলতে গিয়ে এখনো লুকাতে পারেন না মিন্দানাওয়ের আঞ্চলিক টান।

প্রেসিডেন্ট হওয়ার দৌড়ে অংশ নেওয়ার এক নির্বাচনী বক্তৃতায় ৪৫ বছর আগের সেই গুলি ছোড়ার কাহিনী সগর্বে শুনিয়েছিলেন উত্সাহী জনতাকে। সেজন্য বিন্দুমাত্রও দ্বিধান্বিত ছিলেন না রদ্রিগো দুতার্তে পরিহাস করা সহপাঠীকে নিজ হাতে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলেন ভেবেচিন্তেই। এ ঘটনার আরো আগে আরেক কাণ্ড ঘটিয়ে গ্র্যাজুয়েশান সম্পন্ন করার জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়ে বিকল্পস্বরূপ আইনের ডিগ্রি অর্জন করতে হয়েছিল তাকে। গুলি হজম করা সেই বন্ধুটি শেষপর্যন্ত বেঁচে গেলেও তার কাছে কোনোদিনই অনুতাপ প্রকাশ করেননি তিনি। উপরন্তু নির্বাচনী বক্তৃতায় দুতার্তে উচ্চারণ করেছিলেন, আমি লোকজনকে গুলি করতে অভ্যস্ত। এজন্য আমার হাত বিন্দুমাত্র কাঁপে না। আর অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, এসব শোনার পর লোকজনের হাততালি যেন শেষই হতে চাচ্ছিল না। সম্মান রক্ষার্থে বন্দুকই যে সবচেয়ে কার্যকর উপায়, তা তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন। প্রমাণস্বরূপ বিদ্রূপকারীদের কাছ থেকে তিনি ঠিকই আদায় করে নিয়েছিলেন সমীহ। নির্বাচনী প্রচারাভিযান এবং প্রেসিডেন্ট জীবনের শুরুতে সতীর্থকে গুলি করার ঘটনাটি মাঝেমধ্যেই শোনাতেন।

বছর তিনেক আগে হিলারি ক্লিনটন যখন নির্বাচনী দৌড়ে লড়ার চুড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক সেসময়েই ফিলিপিনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যানুয়েল রক্সান (মার নামে যিনি অধিক পরিচিত) তার দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। ফিলিপিনের ক্ষমতাসীন অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে জয়ের ব্যাপারে তিনি ছিলেন যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। এর পেছনে কারণও ছিল পর্যাপ্ত— প্রাণবন্ত অর্থনীতি, তার ওপর রক্সানের বস বেনিগনো একুইনো থ্রি ছিলেন অর্থনীতি ও সামাজিক সংস্কার ঘটানো তুলনামূলকভাবে সফল রাষ্ট্রপতি। ২০১৬ সালে নির্বাচনী প্রচার শুরু করে দেওয়ার পর অনেকটা আচমকাই তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন জাতীয় রাজনীতিতে খানিকটা অপরিচিত দুতার্তে। তিনি রক্সানকে শুধু চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি, মূল প্রতিদ্বন্দ্বীকে অযোগ্য পর্যন্ত বলতে শুরু করেন। অভিযোগ তোলেন, অপরাধের প্রতি দুর্বল এবং সাধারণ লোকজনের সঙ্গে কোনো সংস্পর্শ নেই। তিনি নিজেকে তুলে ধরেন পপুলিস্ট রূপে। স্থানীয় রাজনীতির বস দুতার্তে দাভাও শহরের মেয়র থাকাকালীন বৃহত্ পরিসরে বিচারবহির্ভূত সব হত্যাকাণ্ডকে এড়িয়ে যেতেন সুকৌশলে। নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের মতো ম্যানুয়েল রক্সানের শুধু পরাজয়ই ঘটেনি, দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন ব্যাপক ব্যবধানে।

    ফিলিপিনের স্থিতিশীল নির্বাচনী গণতন্ত্রকে দুতার্তে লৌহমানব ও জনপ্রিয়তাবাদী ইমেজের সামনে মনে হলো ভঙ্গুর। ওপরে সবকিছু ঠিকঠাক দেখা গেলেও বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক শৃঙ্খলায় পদ্ধতিগত সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছিল। একুইনো নিজে জনপ্রিয় হলেও প্রশাসনিক অনৈপুন্য, কাঠামোগত সমস্যা  চিহ্নিত না করা এবং প্রতিষ্ঠানিকৃত দুর্নীতি নির্মূল করতে না পারার ব্যর্থতায় তার সংস্কারবাদী এজেন্ডা ক্রমেই শুষে নিচ্ছিল ক্ষমতায় থাকার বৈধতা। এসবের সঙ্গে তার অন্তত একটি কেলেঙ্কারি যুক্ত হয়েছিল। এসব সুযোগ বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছিলেন ডুটের্ট।

   ১৯৮৬ সালে ফার্ডিনান্ড মার্কোসের দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরতন্ত্র অবসানের পর থেকে ফিলিপিনের রাজনীতিতে যে রাজনৈতিক এজেন্ডার প্রাধান্য ছিল, তাকে বলা যায় উদার সংস্কারবাদ। এই এজেন্ডা অসমতা ও পুনর্বিন্যাস বিষয়ক অনেক মৌলিক প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে আসে। শক্তিশালী সুবিধাভোগী গোষ্ঠী যেমন ক্যাথলিক চার্চ ও বড়ো ব্যবসাসহ ফিলিপিনের অভিজাতদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠাটাই তার বড়ো প্রমাণ। আমজনতার স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ায় অনেকে সমালোচনা করলেও দুতার্তে কিন্তু নির্বিকারই থাকছেন। তাইতো নিশ্চিন্ত মনে ঘুরে বেড়ান ডেনিম জিন্স, চেককাটা শার্ট ও অ্যাভিয়েটর সানগ্লাস পরে। আমি লোকজনকে গুলি করতে অভ্যস্ত, তার এ কথা বিবেচিত হতে পারে কৌতুক, সত্য ঘটনা কিংবা হুমকি হিসেবে। কিন্তু এর শক্তি ও সৌন্দর্য রহস্যময়তার মধ্যেই নিহিত।