ভূ-রাজনৈতিক তথা আঞ্চলিক অবস্থানের দিক থেকে এশিয়া মহাদেশে আফগানিস্তান একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। আফগানিস্তানে উত্তর-পূর্বে চীন, পশ্চিমে ইরান ও দক্ষিণে পাকিস্তান। যার কারণে আঞ্চলিক গুরুত্বটা একটু বেশি। ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর দেশটি বারবার বিদেশিদের নগ্ন হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট থেকে শুরু করে ব্রিটিশ, চেঙ্গিস খান, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সর্বশেষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার শিকার হয় দেশটি। এমনকি স্বাধীনতার ১০০ বছর অতিক্রম করলেও আজও বিদেশির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করতে পারেনি। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যেসব দেশ খোঁড়া অভিযোগের ভিত্তিতে হামলা চালিয়েছে তারা সবাই যুদ্ধে পরাজিত হয়ে লেজ গুটিয়ে একরকম পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগান যুদ্ধের দীর্ঘ ১৮ বছর অতিক্রম হলেও আজও শান্তির পথ প্রশস্ত হয়নি। ফিরে আসেনি সুষ্ঠু ধারার গণতন্ত্র, নির্মূল হয়নি জঙ্গি সংগঠনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম। একটু পিছনে ফেরা যাক, ২০০১ সালে জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার টুইন টাওয়ার হামলার সঙ্গে তত্কালীন তালেবান সরকার জড়িত ও সহযোগিতার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো আগ্রাসন চালায়। একে তো ক্ষমতাচ্যুত তালেবান সরকার আর বিপরীতে আফগানিস্তান পরিণত হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত লীলাভূমিতে। তৈরি হয় নতুন নতুন জঙ্গি সংগঠন, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি লাভ করে তালেবান জঙ্গি নামে। জঙ্গি দমনে ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে মার্কিনি ও ন্যাটোবাহিনী আফগানিস্তানে হামলা চালালেও তার উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ। বরং সময়ের পরিক্রমায় দেশটিতে বেড়েছে জঙ্গি সংগঠনের তত্পরতা। যা এখন পর্যন্ত বিদ্যমান।
দীর্ঘ ১৮ বছর আফগান যুদ্ধে ইতি টানতে ও শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত এক বছরে ৯ দফা শান্তি আলোচনায় বসে এবং তালেবানদের দেওয়া শর্ত মেনে আসছিল খোদ যুক্তরাষ্ট্র। ভেবে নেওয়া হয়েছিল, হয়তো বা এবার আফগান যুদ্ধে ইতি ঘটতে যাচ্ছে। এমন সময় গত ৫ সেপ্টেম্বর কাবুলে অভিযানে একজন মার্কিন সেনাসদস্যসহ ১২ জন নিহত হওয়ার ঘটনা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তালেবানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি ও আলোচনা বন্ধ করে দেন। এতে উদ্বেগ জানায় বিশ্ব নেতারা। ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ। তারা প্রশ্ন রাখেন দীর্ঘ ১৮ বছরের যুদ্ধে প্রাণহানির দায়ভার কে নিবে? যদি মাত্র ১২ জনের নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শান্তিচুক্তি বাতিল হয়।
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে আফগান যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৫৮ হাজার সেনার বিপরীতে ৪২ হাজার তালেবান সেনার মৃত্যু হয়। এছাড়াও প্রায় ২ হাজার ৩০০ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়। জাতিসংঘের তথ্যমতে এ যাবত্ আফগানিস্তানে ৩২ হাজার বেসরকারি লোক মারা গেছে। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রচুর। বর্তমান আফগানিস্তানে ১৪ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন আছে। যারা জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছে। এ দীর্ঘ যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ৯৭৫ বিলিয়ন ডলার।
বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন হচ্ছে শান্তি আলোচনার ভবিষ্যত্ কী? এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে তালেবানের সঙ্গে শান্তি ছাড়া আফগান যুদ্ধে ইতি টানা বা শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কারণ আফগানিস্তানে ৩৫ শতাংশের অধিক তাদের দখলে এবং শক্তিশালী ঘাঁটি রয়েছে। এছাড়াও রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তালেবানের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তাই আফগান সরকারকে তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শত বাধা-বিপত্তি শর্তেও যে কোনো মূল্যে এগিয়ে নিতে হবে। যদিও তালেবানরা বারবার আফগান সরকারের সঙ্গে বৈঠকে বসতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তালেবানদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মূলধারা রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে তালেবানদের ওপর চাপ দিতে হবে। বর্তমান আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন চলছে, এরই মধ্যে সেই নির্বাচন বর্জন ও আরো বেশি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তালেবান। সুতরাং আগামী দিনের প্রধান চ্যালেঞ্জ তালেবানদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে শান্তিচুক্তি ও মূলধারা রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা। অন্যথায়, ভবিষ্যতে তালেবানরা যদি আফগানিস্তান দখল করে আবার মধ্যযুগীয় শাসন ব্যবস্থায় ফিরে আসে তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
