মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ
ফরিদপুর অঞ্চলের নারী কৃষক মনোয়ারা বেগম। তিনি কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত দীর্ঘদিন। কিন্তু তার কোনো জমি নেই। তিনি অন্যের জমিতে দিনমজুরি করেই তার সংসার চালান। মনোয়ারা বলেন, সারাদিন খেতে কাজ করে পুরুষ যেখানে মজুরি পায় ৩৫০ টাকা, নারীদের দেওয়া হয় ২৫০ টাকা। আমরা কাজ বেশি করলেও পুরুষরা তা মানতে চায় না। তাদের দাবি বেশি কাজ করে তারাই। উলটো অপবাদ দেয়, আমরাই নাকি কম কাজ করি। আমরা কাজ হারানোর ভয়ে প্রতিবাদ করি না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষমতায়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। উন্নয়নের ভিত মজবুত করতে হলে সমাজ থেকে যেমন বৈষম্য দূর করতে হবে, তেমনি নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় বৈষম্য দূর করতে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোতেও পরিবর্তন আনতে হবে। বৈষম্য কমিয়ে নারীর জন্য সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা না গেলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে না। তারা ভূমিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশ-১৯৮৪ তে নারীর অন্তর্ভুক্তি যোগ করার জন্য এর সংশোধন করার কথা বলেন। সেই সঙ্গে খাসজমি বিতরণ ও বন্দোবস্ত নীতিমালার প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং নারীর নিরাপত্তার জন্য সর্বস্তরে নারীবান্ধব সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন বলে জানান। সেই সঙ্গে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রগতি অর্জন করতে হলে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সব পর্যায়ে নারী-পুরুষের সমতা তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও শ্রমশক্তি জরিপ-২০১৭ এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৮ লাখ ৪৯ হাজার নারী দিনমজুর শ্রমিক রয়েছেন। অপরদিকে নারী শ্রমশক্তির ৭৮ ভাগ এখন কৃষি খাতে নিয়োজিত। পারিবারিক কাজে ৮০ ভাগেরও বেশি হচ্ছে নারীশ্রম। পুরুষের সমান কাজ করেও তারা মজুরি কম পান। প্রান্তিক যেসব নারীর নিজস্ব জমি নেই, তারা দিনমজুর হিসেবে অন্যের জমিতে কাজ করেন। পুরুষের তুলনায় নারীরা দীর্ঘ সময় কাজে নিয়োজিত থাকার পরও তারা মজুরি বৈষম্যের শিকার।
আপাতদৃষ্টিতে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির পেছনে নারীর ক্ষমতায়নের কথা মনে হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে স্বল্প মজুরি দিয়ে দীর্ঘক্ষণ কাজ করানোর সুবিধা। সরকারের কৃষিতথ্য সার্ভিসের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, কৃষিতে নারীরা যে পরিমাণ শ্রম দেন তার ৪৫ দশমিক ৬ শতাংশের ক্ষেত্রে নারীরা কোনো পারিশ্রমিক পান না। আর বাকি ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশের ক্ষেত্রে তারা যে পারিশ্রমিক পান, তা বাজারমূল্যের চেয়ে কম।
আইএলও কনভেনশন ১০০ এবং বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩) এর ৩৪৫ ধারা অনুসারে একই প্রকৃতি, একই মান বা মূল্যের কাজের মজুরি নির্ধারণের সময় নারী ও পুরুষ সকলের জন্য সমান মজুরি নীতি অনুসরণ করতে হবে। কেবল নারী ও পুরুষ ভেদে মজুরি বৈষম্য হলে সেটা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হবে।
জিডিপিতে নারীর অবদান ২০ শতাংশ, তবে নারীরা যে গৃহস্থালি কাজ করেন, তার আনুমানিক মূল্য আড়াই লাখ কোটি টাকা। সে হিসেবে জিডিপিতে নারীর অবদান দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ। সরকারের হিসাব মতে দেখা গেছে কৃষি, শিল্প ও সেবা অর্থনীতির বৃহত্তর এ তিন খাতে নারীর অংশগ্রহণ ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ তিন খাতের বাইরেও অন্যান্য ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে আসছে। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলেও নারীর জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
এদেশে ৮৫ শতাংশ নারী কোনো না কোনো কারণে বিভিন্নভাবে শারীরিক নির্যাতন, শ্লীলতাহানি, এমনকি ধর্ষণের শিকারও হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোশাক কারখানায় নিয়োজিত নারী, নির্মাণ কাজে নিয়োজিত নারী, ইট ভাটায়, চাতাল কলে, মাটি কাটা, চিংড়ি ঘেরে, অফিসে, আদালতে, কৃষিকাজে, জুম চাষে কর্মরত আদিবাসী নারীসহ সব পর্যায়ের নারীর জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ এখনো তৈরি করা সম্ভব হয়নি। নারীকে পদানত রাখা বা অধস্তন করে রাখার কৌশল হিসেবেই নানাভাবে নারীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষেত্রে আমাদের নৈতিকতা, চিন্তা ও দর্শনে পরিবর্তন না আনলে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব নয়। কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ ৮ শতাংশ বৃদ্ধি বনাম সম্পদে তার ৪ শতাংশ মালিকানা এবং অস্বীকৃতি, মজুরি বৈষম্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদিতে এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার কারণে নারীরা এখনো কৃষক হয়ে উঠতে পারেনি। নারীকে কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে নারীকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিশেষ কোটা ব্যবস্থা করতে উদ্যোগ নিতে হবে। অ-কৃষি খাতে কৃষি জমির ব্যবহার রোধ করতে ভূমি ব্যবহার নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
