প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলির এই জরাজীর্ণ দশা কেন?

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:৪৭

প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে নির্মিত চারকক্ষবিশিষ্ট স্কুলভবনের বিমে ফাটল ধরিয়াছে। পিলারের অবস্থাও নাজুক। ভরসা এখন বাঁশের খুঁটি! যেকোনো মুহূর্তে ঘটিয়া যাইতে পারে গুরুতর দুর্ঘটনা। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ইতোমধ্যে দেওয়ালের পলেস্তারা খসিয়া পড়িয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী আহতও হইয়াছে। তাহা সত্ত্বেও সেখানেই চলিতেছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান। কোমলমতি শিশুরা আতঙ্কিত, অভিভাবকরা যুগপত্ উদ্বিগ্ন এবং ক্ষুব্ধ। কিন্তু প্রতিকার মিলিতেছে না। শিক্ষকদের অভিযোগ হইল, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাগণ বিষয়টি জানেন এবং ভবনটি পরিদর্শনও করিয়াছেন সরেজমিনে। আর কর্মকর্তারা বলিতেছেন, জরুরিভিত্তিতে মেরামতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করিয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হইয়াছে। এখন বরাদ্দ পাওয়া গেলেই সংস্কারকাজ শুরু করা হইবে। এইখানে যে-চিত্রটি তুলিয়া ধরা হইয়াছে সেইটি টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কৈয়ামধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। কিন্তু ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন যে, সারা দেশের আরও শত শত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্রও ভিন্ন নহে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অতি জরাজীর্ণ অবস্থায় রহিয়াছে সারাদেশে এমন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। আর জরাজীর্ণ বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। অভিযোগ হইল, নির্মাণের পর আর কোনো সংস্কারের ছোঁয়া লাগে নাই এইসকল বিদ্যালয় ভবনে। এমনকি ১০ বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষিত বিদ্যালয়েও চলিতেছে পাঠদান—যাহা শুধু উদ্বেগজনক বলিলে কমই বলা হয়।

প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, দেশজুড়িয়া যখন উন্নয়নযজ্ঞ চলিতেছে, নিজস্ব অর্থে নির্মিত হইতেছে পদ্মাসেতুর মতো বৃহদাকার প্রকল্প, তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলির এই জরাজীর্ণ দশা কেন? প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জরাজীর্ণ বেশিরভাগ বিদ্যালয়ই ইতোমধ্যে সংস্কারের আওতায় আনা হইয়াছে। ইহার জন্য যথেষ্ট বরাদ্দও রহিয়াছে। প্রকল্প ও রাজস্ব বাজেটের আওতায় এই সংস্কারকাজ চলিতেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী জানাইয়াছেন যে, সরকার ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৫ হাজার ক্লাসরুম তৈরির একটি প্রকল্প গ্রহণ করিয়াছে। যেইসকল বিদ্যালয়ে ক্লাসরুম অপর্যাপ্ত, ভবন জরাজীর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত— সেইসকল বিদ্যালয়ে প্রয়োজন অনুসারে এই ক্লাসরুম নির্মাণ করা হইবে। অতএব, ইহা স্পষ্ট যে সরকার বসিয়া নাই এবং সংস্কারকাজে সরকারের সদিচ্ছার যেমন অভাব নাই, তেমনি অর্থবরাদ্দও কোনো সমস্যা নহে। তাহা হইলে সমস্যাটি কোথায়? কেন দিনের পর দিন সারা দেশের হাজার হাজার শিশুশিক্ষার্থীকে জীবনের ঝুঁকি, উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে ক্লাস করিতে হইতেছে? প্রশ্নটির উত্তর রহিয়াছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যেও। তিনি যথার্থই বলিয়াছেন যে,  স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা আগাইয়া আসিলে এই দেশের কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ই জরাজীর্ণ থাকিবে না। ইঙ্গিতটি অস্পষ্ট নহে। কে না জানেন যে, শুধু বরাদ্দ থাকিলেই হয় না, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও এই ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকার বিশেষ প্রয়োজন রহিয়াছে। তাহারা আন্তরিকভাবে তত্পর হইলে বাস্তবিকই কোনো বিদ্যালয় জরাজীর্ণ থাকিবার কথা নহে।