উত্তরের জনপদ রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে সৌরবিদ্যুত্। এখন রাতের আঁধারেও আলোকিত এই অঞ্চল। বিদ্যুত্-সুবিধার আওতার বাইরে থাকা ২ হাজারের মতো মানুষ সোলার হোম সিস্টেমের আওতায় এসেছে শতভাগ বিদ্যুতায়িত এই উপজেলায়। হাজারের কাছাকাছি স্ট্রিট লাইটের আলোয় ঝলমল করছে উপজেলাটির প্রত্যন্ত জায়গার রাস্তাগুলোও। এমনকি টিআর-কাবিটার সৌরবিদ্যুত্ পৌঁছে গেছে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক প্রতিষ্ঠান মসজিদ, মন্দিরেও। অল্প খরচে সেচের সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে সৌরবিদ্যুতের সাহায্যে চালিত সোলার পাম্পের মাধ্যমে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের টিআর-কাবিটার অধীনে নবায়নযোগ্য শক্তি বাস্তবায়ন কার্যক্রমে নিয়োজিত সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) সহযোগী প্রতিষ্ঠান রুরাল সার্ভিসেস ফাউন্ডেশন (আরএসএফ) রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলায় টিআর-কাবিখার সব কার্যক্রমের মাধ্যমে উন্নয়নমূলক এই কাজ পরিচালনা করেছে।
আরএসএফের রংপুর জোনের ফিল্ড অপারেশন ম্যানেজার আকতার হোসাইন জানান, মিঠাপুকুরে ইডকলের অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা) কর্মসূচির মাধ্যমে ১৭৯১টি ঘরে সোলার হোম সিস্টেম বসানো হয়েছে, সড়কে স্ট্রিট লাইট বসানো হয়েছে ৯০১টি, এসি সিস্টেম বসানো হয়েছে ৬৮টি, ডিসি সিস্টেম বসানো হয়েছে ২১টি। এসি ও ডিসি সিস্টেমগুলো বসানো হয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান মসজিদ, মন্দিরে। এছাড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, তথ্যসেবা কেন্দ্রেও বসানো হয়েছে এসি সিস্টেম।
এই উপজেলায় সড়কে স্ট্রিট লাইট বসানো হয়েছে ৯০১টি। মহাসড়ক, দুর্গম অঞ্চলের রাস্তায় এই লাইটগুলো বসানো হয়েছে। অঞ্চলের মিঠাপুকুর থেকে ফুলবাড়ী মহাসড়কটি একসময় অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকত। টিআর-কাবিটা প্রকল্পের স্ট্রিটলাইট প্রায় এই মহাসড়কে স্থাপন করা হয়। এই মহাসড়কে অটোরিকশা চালান শফিকুল আলম। তিনি জানালেন, আগে সড়কটি অন্ধকার থাকত। এ কারণে চৌরাস্তা বা মোড়গুলোতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটত। এখন স্ট্রিট লাইটের আলো থাকায় এই মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমে গেছে। চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধপ্রবণতাও কমে গেছে।
টিআর-কাবিটা প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৫ সাল থেকে শুরু করে চলতি অর্থবছর পর্যন্ত ১ হাজার ৭৯১টি ঘরে সোলার হোম সিস্টেম বসিয়েছে আরএসএফ। সোলার হোম সিস্টেমগুলো সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে বিনা মূল্যে দেওয়া হয়। ফলে এই জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়ন হচ্ছে। উপজেলার ফকিরেরহাট গ্রামের বাসিন্দা জমিলা বেগম। বয়স আশির কাছাকাছি। জীবনসায়াহ্নে এসে পেয়েছেন বিদ্যুতের সুবিধা। কম দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন বয়োবৃদ্ধ জমিলা এখন সন্ধ্যার পরও বাড়ির অনেক কাজ করতে পারছেন। তাকে এখন আর আগের মতো কেরোসিন তেল কিনতে হয় না। পরিশোধ করতে হচ্ছে না বিদ্যুতের বিলও। জমিলা বলেন, ‘আগত খুব কষ্ট হইছে বাহে। এলা আইতোতও (রাতে) কাজ কইরবার পারি। ছোয়াগুলা আইতোত পইরবার পারে। ত্যাল কেনা নাগে না, কারেন্টের জন্য টাকাও দেওয়া নাগে না।’
টিআর কাবিটা প্রকল্পের মাধ্যমে এ উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে বসানো হয়েছে ২১টি সোলার হোম সিস্টেম। ফলে প্রান্তিক মানুষগুলো ২৪ ঘণ্টা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। চেংমারী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে ৪৫০ ওয়াটের একটি এসি সোলার সিস্টেম বসানো হয়েছে। কেন্দ্রটির তত্ত্বাবধায়ক মোক্তায়ারা বানু বলেন, ‘প্রায় এক বছর আগে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একটি এসি সোলার সিস্টেম বসানো হয়েছে। আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মূলত রাতে সন্তান প্রসবের কাজ করা হয়। রাতের অন্ধকারে সোলার এসি সিস্টেম সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে বেশ উপকারে আসছে।’
ঘরবাড়ির পাশাপাশি টিআর-কাবিটা প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এসি, ডিসি সোলার ও সোলার হোম সিস্টেম বসানো হয়েছে। ফলে শিক্ষা কার্যক্রম আরো সহজে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। শঠিবাড়ী ডিগ্রি কলেজে ৯০০ ওয়াটের একটি এসি সোলার সিস্টেম বসিয়েছে আরএসএফ। কলেজটির অধ্যক্ষ মেজবাহর রহমান বলেন, ‘আমাদের অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেক বেশি। এই এসি সোলার সিস্টেমের কারণে আমরা নিরবছিন্ন বিদ্যুত্-সুবিধা পাচ্ছি এবং ইমেইল ও প্রিন্টিংয়ের কাজও করতে পারছি। এছাড়া কলেজ চত্বরে স্ট্রিট লাইট দেওয়া হয়েছে, যার কারণে কলেজের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার হয়েছে।
টিআর-কাবিটার প্রকল্পটি নিয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোশফিকুর রহমান বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় জনগণ ও অংশীদারদের নিয়ে আমরা মিঠাপুকুর উপজেলায় টিআর-কাবিটা কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। সবাই আমাদের সহায়তা করছেন। আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ জনগণের দোরগোড়ায় সরকারের এই সেবা পৌঁছে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।’
