ইতিহাসের কৌতুক এইখানে যে, লালন নিজে কী জাত ছিলেন আজীবন তা সযত্নে গোপন রেখে গেছেন। বোধহয় জীবনের কোনো গভীরতর অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর জাতিতত্ত্বে অনাস্থা এসেছিল কিংবা ফকিরিয়ানার ধারা মান্য করে জাতিতত্ত্বে অবিশ্বাসী ছিলেন। ‘হিতকরী’-র সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল:
ইহাকে আমরা স্বচক্ষে দেখিয়াছি; আলাপ করিয়া বড়ই প্রীত হইয়াছি। নিজে লেখাপড়া জানিতেন না; কিন্তু তাঁর রচিত অসংখ্য গান শুনিলে তাঁকে পরম পণ্ডিত বলিয়া বোধ হয়। তিনি কোনো শাস্ত্রই পড়েন নাই; ধর্ম্মালাপে তাঁহাকে বিলক্ষণ শাস্ত্রবিদ্ বলিয়া বোধ হইত। বাস্তবিক ধর্ম্মসাধনে তাঁহার অন্তর্দৃষ্টি খুলিয়া যাওয়ায় ধর্ম্মের সারতত্ত্ব তাঁহার জানিবার অবশিষ্ট ছিল না। লালন নিজের কোনো সাম্প্রদায়িক ধর্ম্মাবলম্বী ছিলেন না; অথচ সকল ধর্ম্মের লোকই তাঁহাকে আপন বলিয়া জানিত। মুসলমানদিগের সহিত তাঁহার আহার-ব্যবহার থাকায় অনেকে তাঁহাকে মুসলমান মনে করিত, বৈষ্ণবধর্ম্মের মত পোষণ করিতে দেখিয়া হিন্দুরা ইহাকে বৈষ্ণব ঠাওরাইত।
প্রত্যক্ষদর্শীর এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় লালন নিজের জন্য তৈরি করেছিলেন এক সুকৌশল আড়াল। তার মধ্যে প্রচ্ছন্ন থাকাই ছিল তাঁর কাম্য। জীবিতকালেই তাঁর জাত নিয়ে মানুষের সংশয় ও বিতর্ক ছিল। কিন্তু অন্যের জাত নিয়ে তাঁর কোনো উত্সাহ ছিল না। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ১৩০২ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালি অঞ্চলে ব্যাপক অনুসন্ধান করে লালন-বিষয়ে সরেজমিন যা জেনেছিলেন তা লিখে পাঠিয়েছিলেন ‘ভারতী’ পত্রিকায়। তাতে আছে:
লালনের ধর্মমত অতি সরল ও উদার ছিল। তিনি জাতিভেদ মানিতেন না, হিন্দু মুসলমানকে সমভাবে দেখিতেন ও শিষ্যদিগের মধ্যে হিন্দু মুসলমান সকল জাতিকেই গ্রহণ করিতেন। লালন হিন্দু নাম, সা উপাধি মুসলমান জাতীয়— সুতরাং অনেকেই তাঁহাকে জাতির কথা জিজ্ঞাসা করিত। তিনি কোনো উত্তর না দিয়া স্বপ্রণীত নিম্নলিখিত গানটি শুনাইতেন—
সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে
লালন ভাবে—জাতির কী রূপ দেখলাম না এ নজরে।
এরপরে গানটির পুরো উদ্ধৃতি আছে, তা এত প্রসিদ্ধ যে এখানে পুনরুদ্ধৃত করা নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু পাঠকদের লক্ষ করা দরকার দুটি বিষয়। প্রথমত, ‘হিতকরী’ ও ‘ভারতী’-র প্রতিবেদনে (যা যথাক্রমে লালনের প্রয়াণের সদ্য পরে ও পাঁচ বছর পরে লেখা) লেখক দুজন কোথাও লালকে ‘বাউল’ বলেননি বরং তাঁর ধর্মমতকে এক মিশ্র উদার মত বলে জানিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, দেখা যাচ্ছে, তাঁর সাধন জীবনের ধরন দেখে সমসাময়িক অনেকের মনে লালনের জাতি-পরিচয় বিষয়ে প্রশ্নাকুল উত্কণ্ঠা জেগেছিল। লক্ষণীয় এটাও যে তাঁদের প্রশ্ন নিরসনে লালনের তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। কেননা মানবিক বোধের এমন সমুচ্চ চূড়ায় তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন যেখান থেকে জাতিতত্ত্ব এক নিষ্ফল আচারসর্বস্ব শুষ্ক পরিহাস বলে তাঁর মনে হয়েছিল। তখন উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ। স্পষ্টতই দেশের মধ্যে অন্তঃশীল ছিল যুক্তিবাদের ধারা। ধর্মাচারের প্রচলবহুল অন্তঃসারশূন্যতা অনেকেই বুঝতে শুরু করেছেন। মীর মশাররফ, কাঙাল হরিনাথ, শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণবের মতো সচেতন শিক্ষিত ব্যক্তিদের সঙ্গে লালনের ভাবনার লেনদেন ছিল। শিলাইদহের ঠাকুর এস্টেটে তিনি যেতেন। সেখানে বোটের উপর বসিয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যেহেতু তাঁর চেহারা স্কেচ করেছেন তখন ধরে নেওয়াই যায় যে উচ্চতর ধর্মতত্ত্বের কিছু দেওয়া-নেওয়া বা আলাপ-আলোচনা উভয়ের মধ্যে আগে থেকে ছিল। (অংশবিশেষ)
সূত্র: লালন ফকির পাঠ ও বিবেচনা/সম্পাদনা: আহমাদ মাযহার ও পারভেজ হোসেন (সংবেদ, ২০০৮)
