প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রেসক্রিপশনের পরিপ্রেক্ষিতে তত্কালীন বিএনপি সরকারের জনবান্ধব রেল বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল দেশের জন্য আত্মঘাতী। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা-কুড়িগ্রাম রুটে নতুন আন্তঃনগর ট্রেন ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে তিনি আরো বলেন, ‘আমি মনে করি, একটা দেশের যোগাযোগের জন্য রেল, সড়ক, নৌ ও বিমান—সবগুলো পথই চালু থাকা দরকার।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো এক আন্তর্জাতিক সংস্থার নির্দেশনা ছিল যেটা লাভজনক নয় তা বন্ধ করে দেওয়ার। সেই নির্দেশনায় বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে রেলযোগাযোগটাকেই সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য অনেকগুলো রেললাইন ও রেলস্টেশন বন্ধ করে দেয়।’ তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশের রেলযোগাযোগ হলো এদেশের সাধারণ ও মধ্যবিত্তের অন্যতম একটি চলাচলের মাধ্যম। যারা ক্ষমতায় ছিল (বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার), তারা রেলকে ধ্বংসের এবং একে বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পরই রেলকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। উত্তরবঙ্গসহ সমগ্র বাংলাদেশেই রেলযোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর যেসব রেলপথ বা লিংক বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেসবও তার সরকার নতুনভাবে চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি যেসব স্থানে রেলযোগাযোগ ছিল না, সেখানেও রেলযোগাযোগ চালু করা হচ্ছে। ফলে সাধারণের যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে স্বল্প খরচে পণ্য পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি এ সময় চিলমারী বন্দর পুনরায় চালুসহ উত্তরাঞ্চলের ভাওয়াইয়া গানের প্রচার-প্রসার এবং সংরক্ষণেও তার সরকার এগিয়ে আসবে বলে উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী এ সময় কুড়িগ্রামে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এবং লালমনিরহাটে একটি অ্যারোস্পেস অ্যান্ড এরোনটিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে তার সরকার সেখানে প্লেন তৈরি করার স্বপ্ন দেখছে বলেও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নতিটাও প্রয়োজন। উত্তরবঙ্গবাসীকে মঙ্গা শব্দটা যেন আর শুনতে না হয়, সেই ব্যবস্থা আমরা করেছি।’ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী রংপুর এক্সপ্রেস ও লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেনের র্যাকে নতুন কোচ প্রতিস্থাপনেরও উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন স্বাগত বক্তৃতা করেন এবং রেল বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়নের তথ্য তুলে ধরেন। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুজ্জামান আহমেদ গণভবন প্রান্তের মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। রেলপথমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন কুড়িগ্রাম স্টেশন থেকে যুক্ত হয়ে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও রংপুর রেলস্টেশন প্রান্তের সংযুক্ত জনগণের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী পরে মতবিনিময় করেন। বক্তব্য শেষ করে বাঁশি ফুঁকে ও সবুজ পতাকা উড়িয়ে নতুন ট্রেনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
রেল কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’ বুধবার ছাড়া সপ্তাহের বাকি ছয় দিন সকাল ৭টা ২০ মিনিটে কুড়িগ্রাম রেলস্টেশন থেকে ছেড়ে বিকাল ৫টা ২৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছাবে। ঢাকার কমলাপুর স্টেশন থেকে রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে সকাল ৬টা ২০ মিনিটে কুড়িগ্রাম স্টেশনে পৌঁছাবে। আগামী ১৭ অক্টোবর থেকে ট্রেনটির বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হবে। এতে শোভন চেয়ার ৫১০ টাকা, এসি চেয়ার ৯৭২ টাকা, এসি সিট ১১৬৮ টাকা এবং এসি বার্থ ১৮০৪ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাস্তায় চলাচলে সতর্ক থাকার আহ্বান :এর আগে সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতায় চার লেনবিশিষ্ট ফ্লাইওভার, সেতু, বাইপাসসহ বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধনকালে সড়ক দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যানবাহনচালক, পথচারীসহ সবাইকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, সবাইকে রাস্তায় চলাচলে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, ‘একটা দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু চালককে দায়ী করলে চলবে না, বরং কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটল, পথচারী এবং দুর্ঘটনাকবলিত যানের চালকের কী ভুল আছে, সেটাও কিন্তু দেখা দরকার। সে জন্য আমি বলব, চালক থেকে শুরু করে যারা সড়ক ব্যবহারকারী, সবারই সচেতনতা একান্তভাবে প্রয়োজন।’
স্কুলের শিশুদের ট্রাফিক আইন নিয়ে সচেতন করার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাস্তার কোন দিক থেকে হাঁটতে হবে, সেটাও শিক্ষণীয় বিষয়। কখন পার হতে হবে, সেটাও শিক্ষণীয় বিষয়। আমি মনে করি, আমাদের প্রতিটি স্কুলে এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীকেই স্কুলজীবন থেকেই এই শিক্ষাটা প্রদান করা একান্তভাবে দরকার।’
উদ্বোধনকৃত অন্যান্য প্রকল্প হচ্ছে ময়মনসিংহ-গফরগাঁও-টোক সড়কের বানার নদীর ওপর ২৮২ দশমিক ৫৫৮ মিটার দীর্ঘ পিসি গার্ডার সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার জাতীয় মহাসড়কের ইন্দ্রপুল হতে চক্রশালা পর্যন্ত বাঁক সরলীকরণ, ভোমরা স্থলবন্দর সংযোগসহ সাতক্ষীরা শহর বাইপাস সড়ক এবং মুন্সীগঞ্জ সড়ক বিভাগের অধীন ঝুঁকিপূর্ণ সেতুসমূহ (১৩টি সেতু) স্থায়ী কংক্রিট সেতু দ্বারা প্রতিস্থাপন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ এলাকার উপকারভোগী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করা সড়ক, সেতু, ফ্লাইওভার ও বাইপাস ব্যবহারে সবাইকে যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানান।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গণভবন প্রান্তে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে
প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত্
বাসস জানায়, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি বিশেষ করে তার সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র ও পরবর্তীতে ভারত সফর নিয়ে আলোচনা করেন।’ তিনি বলেন, সরকারপ্রধান রাষ্ট্রপতিকে তার সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সফর সম্পর্কে অবহিত করেন এবং রাষ্ট্রপতির কাছে এ সংক্রান্ত দুটি প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন।
প্রধানমন্ত্রী গত ৩ থেকে ৬ অক্টোবর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ইন্ডিয়া ইকোনমিক সামিটে যোগ দিতে চার দিনব্যাপী ভারত সফর করেন। এ সময় তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এর আগে ২২ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ)’র ৭৪তম অধিবেশনে যোগ দিতে আট দিনব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। প্রেস সচিব বলেন, রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সফরকালে তিনটি মর্যাদাবান পুরস্কার পাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান। যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে সফল টিকাদান কর্মসূচি ও যুব সমাজের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য দুটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন।
উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে এডিবি
বাংলাদেশের পাশে থাকবে
বাংলাদেশকে নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন অংশীদার উল্লেখ করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল গতকাল সন্ধ্যায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্কালে বলেছে, ব্যাংকটি উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের পাশে থাকবে। এডিবির পরিচালনা পর্ষদের সফররত ৭ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতা ইন-চাং সং বলেন, ‘এডিবি বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে থাকবে।’ সাক্ষাত্ শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
এডিবির প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে দ্রুত দারিদ্র্য স্তর হ্রাস ও উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও খাদ্য নিরাপত্তায় অগ্রগতির প্রশংসা করে বলে, ‘বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে।’ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সংস্থার সমর্থন অব্যাহত রাখারও আশ্বাস দেয়।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া এডিবি প্রতিনিধিদের মধ্যে এডিবির বিকল্প পরিচালক বৈয়রম মুহাম্মেদ গ্যারাজেব, কেনজো ওহে, বুরাক মুজিনোগলু এবং এডিবির বাংলাদেশ বিষয়ক কান্ট্রি ডিরেক্টর মনমোহন প্রকাশ উপস্থিত ছিলেন।
