আদনান গান ভালোবাসে। গিটার ভালোবাসে। টিভিতে যখন কেউ গিটার বাজিয়ে গান করে, আদনান মনোযোগ দিয়ে শোনে। ওর ইচ্ছে করে গিটার বাজাতে। গিটারের টুংটাং সুর কানে আসে। আম্মু ওর ভালোলাগাটা বুঝতে পারেন।
একদিন বললেন, তোর আব্বুকে বল না।
আদনান বলল, কী বলব?
আম্মু বললেন, একটি গিটার কিনে দিতে বল।
আব্বু তখন দুজনের কথা শুনছিলেন। তিনি বললেন, আবদার করতে হবে না। একদিন কিনে আনব।
আব্বু অনেক ভালো। আদনান একটু বড়ো হলে আব্বু ওকে বলেছেন, তোমার নাম রেখেছি একটি সিনেমা দেখে। ছোটবেলায় দেখেছিলাম। সিনেমাটির নাম—মেঘের অনেক রঙ।
সেখানে একটি ছেলের নাম ছিল আদনান। সেই সিনেমাটি দেখে নাকি আব্বু নিজেকে আদনান ভাবতেন।
এ কথা তিনি বারবার বলেন। নিজে আদনান হতে পারেননি বলে ছেলের নাম রেখেছেন আদনান।
আব্বু একদিন একটি লাল রঙের গিটার নিয়ে এলেন। আদনান ভীষণ খুশি। গিটার পেয়ে আব্বুকে জড়িয়ে ধরল। আব্বু বললেন, গিটার বাজাবে ভালো কথা, কিন্তু পড়ালেখার যেন বারোটা না বাজে।
আদনান মুচকি মুচকি হাসে। গিটারটি পেয়ে হাতছাড়া করতে চায় না। তারে হাত রেখে টুংটাং বাজায়। সুর ছাড়া। ও তো সুর শেখেনি। গিটার বাজাতে শেখেনি। শিখতে হবে।
আদনান রাতে শোবার সময় গিটারটি কাছে নিল। ঘরের লাইট অফ করে দিল।
গিটার বলে উঠল, তুমি কি এখনই ঘুমাবে?
আদনান অবাক। একটু চমকে উঠল। কী জবাব দেবে বুঝতে পারছে না। গিটার আবারও জিজ্ঞেস করল, তুমি কি এখনই ঘুমাবে?
আদনান বলল এবার, তুমি চাইলে তোমাকে বাজাব।
গিটার হি-হি করে হেসে উঠল। আদনান বলল, তুমি হাসছ কেন?
গিটার বলল, আমাকে বাজাতে অনুমতি লাগবে না। যখন খুশি বাজাবে। কিন্তু আমি বলছিলাম কি, তোমার হোম ওয়ার্ক তো শেষ হয়নি।
আদনান জিভ কেটে বলল, ঐ যা, একদম ভুলে গিয়েছিলাম। তোমাকে পেয়ে হোম ওয়ার্কের কথা মনেই পড়েনি।
আদনান উঠে গিয়ে আলো জ্বালাল। পড়ার টেবিলে বসল। হোম ওয়ার্ক শেষ করে শুয়ে পড়ল। তখন গিটারটি বলল, এখন খুশি হলাম।
আদনান বলল, কেন খুশি হলে?
গিটার বলল, তোমার কাজ দেখে আমার তো শুধু হাসি পায়।
আদনান বলল, হাসি পায় কেন?
গিটার বলল, সেই যে আমাকে নিয়ে টুংটাং শুরু করলে, থামলে না। পড়ার কথাও ভুলে গেলে। আবার মনে করিয়ে দিলে লাফ দিয়ে উঠলে। আমার তো শুধু হাসি পায়।
—নাও, এবার ঘুমাও।
—আমি ঘুমাই না। সারারাত জেগে তোমাকে পাহারা দেব।
—পাহারা দেবে কেন?
—তুমি যেন তোমার সব কাজ ঠিকঠাক করতে পার। এবার ঘুমাও।
প্রথম দিনের আলাপ খুব জমল। এরপর সারাদিন গিটার কোনো কথা বলে না। কিন্তু রাত হলেই, শুতে গেলেই গিটার গল্প শুরু করে। দিনের বেলা কথা কখনই বা বলবে। সারাদিন ব্যস্ত থাকে আদনান। সকালে স্কুল, বিকালে কোচিং, সন্ধ্যায় হাউজ টিউটর, রাতে নিজের পড়া। একটু টিভি দেখা, কার্টুন দেখারও সময় বের করা কষ্টকর। যাক, গিটারটি পেয়ে রাতে একটু নিরিবিলি কথা বলা যায়। আদনান নিজের কাছেই নিজে প্রশ্ন করে, গিটার কেন কথা বলে? গিটারের কি মুখ আছে? না চোখ আছে, না কান আছে। তাহলে সে কথা বলে কীভাবে? তাছাড়া আলো থাকলে কখনো কথা বলে না। লাইট অফ করলে, একটু অন্ধকার হলেই কেবল কথা বলে। এটা খুব রহস্যজনক। বিষয়টা কাকে বলবে ভেবে পায় না আদনান। আম্মুকে বললে আম্মু পাত্তাই দেবেন না। হেসেই উড়িয়ে দেবেন। আব্বুকে বললে আব্বু গবেষণা করতে রাতে ওর ঘরে আসবেন। একথা কাউকে বলা যাবে না, গিটার কেন কথা বলে?
স্কুল থেকে এসে আদনান দেখল ছোটমামা এসেছে। ও মনে মনে ভাবল, ছোটমামাকে সব খুলে বলবে। গিটার শুধু কথাই বলে না, ভুলও ধরিয়ে দেয়। এই তো সেদিন—জুতার ফিতা বাঁধতে ভুলে গিয়েছিল আদনান। স্কুলের মাঠে দৌড়াতে গিয়ে দেখল পা থেকে জুতা খুলে যেতে চাইছে। তখন বুঝল ফিতা বাঁধা হয়নি। রাতে ঘুমাতে গেলে গিটারটা বলল, জুতার ফিতা বাঁধতে ভুলে গেলে চলবে কী করে?
—ফিতা বাঁধিনি, তুমি জানলে কেমন করে?
—স্কুলের মাঠে দৌড়াতে আরেকটু হলে তো পড়েই যেতে।
প্রতিদিন এরকম খুঁটিনাটি যা ঘটে, গিটার সবই বলে। ছোটমামাকে বিষয়টি বলবে কি বলবে না করে শেষে বলেই ফেলল। —আচ্ছা ছোটমামা, গিটার কি কখনো কথা বলে?
ছোটমামা ছাদের দিকে তাকিয়ে বলল, বলতেও পারে। বাজনার মধ্যে তো কথা থাকেই।
আদনান বলল, বাজনায় না মামা, সরাসরি কথা বলতে পারে কি না?
—পারে। গিটার যদি মানুষের রূপ ধারণ করে।
—মানুষের রূপ?
আদনান আর কথা বাড়ায় না। ওর মাথার ভেতর অনেক চিন্তা ভর করে। রাতে শোবার সময় গিটার বলল, তোমার মামা আমার সম্পর্কে কী বলল?
—তোমার জানার দরকার কী?
—খারাপ কিছু বলেছে? আমি তোমার বন্ধু নই? আমাকে শুধু কি বাজানোর জন্যই কাছে রেখেছ?
আদনান কিছু বলতে পারে না। ছোটমামার কথাটা কানে বাজতে থাকে—গিটার যদি মানুষের রূপ ধারণ করে...। তখন ও নিজেই বুঝতে পারল গিটার কেন কথা বলে!
আদনান ভীষণ লজ্জা পেল। নিজের সাথে ও নিজেই কথা বলে। কী লজ্জা! লাজুক হাসি ওর ঠোঁটের কোনায়।
গিটারটি নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে আদনান।
