স্টকহোম থেকে সারাজেভোর দূরত্ব ১,৫০০ মাইলেরও বেশি, আর বসনিয়াতে যুদ্ধটা থেমেছিল ১৯৯৫ সালে। তাই, যে সুইডিশরা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বেছে নিয়েছেন, তাদের সঙ্গে এক প্রজন্ম আগে বলকানের প্রাণকেন্দ্রে সংঘটিত জঘন্যতম যুদ্ধটির রয়েছে সময় এবং দূরত্বের বিস্তর ফারাক। তবে সময় এবং দূরত্বের এই ব্যবধান বসনিয়াতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সার্ব বাহিনীর প্রমাণিত গণহত্যার ঘটনাটির অস্বীকারকারী পিটার হ্যান্ডকে এই বছরের পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তটির কোনো অজুহাত হতে পারে না।
আমরা এক বিভ্রান্তিকর সময়ের মধ্যে আছি, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভার্জিনিয়ার শার্লিটসভিল শহরে মিছিলকারী নব্য নািসদের মধ্যেও কিছু ‘খুব ভালো লোক’ খুঁজে পান! এবং আমাদের কাছে একটি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা সবসময় বর্ণবাদ এবং ষড়যন্ত্রমূলক নানা তত্ত্ব ছড়ায়। আমাদের এই বিশ্বকে প্রতারণামূলক উপায়ে বর্ণনা করা হচ্ছে এবং ইতিহাসকে এই বিকৃত উপায়েই পুনর্লিখনের অপচেষ্টা চলছে। এক্ষেত্রে চূড়ান্ত যে জিনিসটি আমাদের দরকার, যা ঘটতে পারে বলে আমি আশঙ্কা করেছিলাম, সেটি হলো—মেধাকে সম্মান জানানোর সর্বোচ্চ পুরস্কার নোবেলকে তুলে দেওয়া হবে এমন কোনো মেধাবীর কাছে, যিনি আমাদের এই যুগের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রধান সংকটগুলোরই প্রতিনিধিত্ব করেন। আমরা জানি যে, নোবেল পুরস্কারের জন্য এই নির্বাচনগুলো এমন একটি মুহূর্তে এসেছে যখন হিংস্র ‘শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা’ ১৯৯০-এর দশকের সার্বদেরকে বীরত্বের অবতার হিসেবে চিহ্নিত করছে। এটা বিস্ময়কর একটা বিষয় যে, নোবেল কমিটি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার জন্য এমন একজন অস্ট্রিয়ান লেখককে বেছে নিয়েছে, যে এই যুদ্ধাপরাধীদের একজন সমর্থক, যে সবসময়ই এই যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।
আমি সত্যিই জানি না যে, কোথা থেকে আমি এই পুরো বিষয়টি শুরু করব। আমি বরং কী বলছি না, সেটাই স্পষ্ট করে উল্লেখ করি। আমি বলছি না যে হ্যান্ডকের সাহিত্যকর্ম আমাদের পড়া উচিত নয়। আমার আপত্তির বিষয় রিচার্ড ওয়গনারকে শোনা উচিত কিনা সেই পুরনো প্রশ্নেরও পুনরাবৃত্তিও নয়। সবাই ওয়াগনারের সংগীত শুনুন, এবং হ্যান্ডকে পড়ুন। আমি বলতে চাই—তার সাহিত্যকর্ম পড়া এক জিনিস, আর তাকে পুরস্কৃত করা অন্য জিনিস, এই পুরস্কার শুধু তার অনবদ্য এবং রাজনৈতিক উপন্যাস এবং নাটককেই নয়, তার পুরো সাহিত্যকর্মকে বৈধতা প্রদান করে।
হ্যান্ডকের সবচেয়ে বিখ্যাত রাজনৈতিক অপরাধ ছিল সার্বিয়ান নেতা স্লোবোডান মিলোযভিকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেওয়া, যিনি গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের মামলার বিচারের অপেক্ষায় থাকাবস্থায় কারাগারে মারা গিয়েছিলেন। হেগে আটক থাকাকালে মিলোযভিককে দেখতে গিয়েছিলেন হ্যান্ডকে, এবং ২০০৬ সালে সার্বিয়ার পোজারেভাকে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় তার প্রশংসা করে ‘স্তুতিবাক্য’ পাঠ করেছিলেন। পরবর্তী সময়কালে
হ্যান্ডকে বহু বছর ধরে লিখেছেন কীভাবে সার্বদের ভুল বুঝেছে সবাই, এবং কী অন্যায়ভাবে সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় ৯০ দশকে ঘটে যাওয়া রক্তপাতের জন্য দোষারোপ করা হয়েছিল সার্বদের।
হ্যান্ডকের নোবেল জয় বিতর্কিত হওয়ার প্রধান কারণ ১৯৯৬ সালে তার লিখিত বেশকিছু ধারাবাহিক প্রবন্ধ, পরে যা, ‘A Journey to the Rivers: Justice for Serbia.’ শিরোনামে একটি ছোট পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। সার্বিয়ায় করা তার সংক্ষিপ্ত এক সফরের ওপর ভিত্তি
করে লিখিত এই বইয়ে অভিযোগ করা হয় যে, গণমাধ্যম সার্বের লোকদের ‘নিরলসভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছে’, এবং হ্যান্ডকে সার্বিয়ান নেতার কাছ থেকে নিজেকে দূরে রাখার ভান করে লিখেছিলেন যে, ‘আমি সার্বিয়ান জনগণের সাথে আছি, মিলোযভিকের সাথে নই’—মিলোযভিকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেওয়া পশ্চিমা দেশের অল্প কয়েকজনের মধ্যে একজন হিসেবে হ্যান্ডকে উপস্থিত হওয়ায় তার এই মন্তব্য বেশ অদ্ভুত লেগেছিল।
সুতরাং, হ্যান্ডকে আসলে কী বিশ্বাস করেন? সেটি কি আসলে খুবই ভয়াবহ? ১৯৯৬ সালে তার প্রবন্ধগুলো প্রকাশিত হওয়ার পরে হ্যান্ডকে ফরাসি সংবাদপত্র লিবারেশন-এ একটি সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছিলেন। বর্তমান সময়ের আলোচনায় নিবন্ধটি খুব কম মনোযোগ পেয়েছে, এবং এটি দুর্ভাগ্যজনক কারণ এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, তিনি বসনিয়াতে সংঘটিত গণহত্যার বিষয়টি কখনোই স্বীকার করেননি। যেমন, তিনি লিখেছেন যে বসনিয়াতে ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ থাকার তথ্যটি আসলে ভুল ধারণা।
তিনি লিখেছেন, ‘ঠিক, যুগোস্লাভ প্রজাতন্ত্রের অঞ্চল, বিশেষত বসনিয়ায় ১৯৯২ এবং ১৯৯৫-এর মধ্যে কিছু ‘অসহনীয় শিবির’ ছিল। তবে আসুন এই শিবিরগুলোর জন্য বসনিয়ার সার্বিয়ানদের স্বয়ংক্রিভাবে দায়ী করে ফেলা বন্ধ করি। সেখানে ‘ক্রোয়াট শিবির’ এবং ‘মুসলিম শিবিরও’ ছিল এবং এসব জায়গায় যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার বিচার হেগেই করা হবে।’
বসনিয়ার সার্ব শিবিরে যুদ্ধ চলাকালে হ্যান্ডকে কখনো সফর করেননি, এবং যেগুলোর অস্তিত্ব তিনি স্বীকার করেন না, সেগুলো ছিল ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প’। যুদ্ধের সময় আমি সেগুলো দেখেছি, ওয়াশিংটন পোস্টে আমার কাজের অংশ হিসেবে সেসব ক্যাম্প আমি সফর করেছি। আমি শিবিরের ভেতরে বন্দিদের পাশাপাশি বেঁচে থাকা লোকদের সাথে কথা বলেছি। হেগের জাতিসংঘের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল সেখানে সংঘটিত অপরাধের জন্য সার্বদের দীর্ঘ কারাবাসের সাজা দিয়েছে। ঐ রকম বিশাল বিশাল শিবির বা ক্যাম্পের মতো মুসলমানদের তেমন কিছুই ছিল না। সার্বদের সেই ক্যাম্পগুলোতে কয়েক হাজার বন্দিকে আনা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে এবং হত্যা করা হয়েছে। হ্যান্ডকে এবং প্রায় সবাই এই বিষয়ে যে অবস্থানটি গ্রহণ করেন সেটি একটি ধোঁকা, যাকে অপরাধ না বলাটাই হাস্যকর। মুসলিম সেনারা কি কোনো অত্যাচার করেছে? হ্যাঁ, তবে এলোমেলো স্বল্পসংখ্যক অপরাধকে একটি পরিকল্পিত এবং বিশাল সংখ্যার সাথে গুলিয়ে ফেলা একধরনের প্রতারণা এবং বিশাল অপরাধটিকে খাটো করে দেখার সুস্পষ্ট প্রয়াস। এটাই অন্যায়ের পক্ষাবলম্বীরা করে থাকেন।
ফ্রান্সের বাসিন্দা হ্যান্ডকে লিবারেশনে প্রকাশিত তার নিবন্ধগুলোতে এই অপপ্রয়াসটিই আরো গভীরভাবে চালিয়েছেন। স্রেব্রেনসিয়া অঞ্চলটি সার্ব বাহিনী দখল করে নেওয়ার পর হাজার হাজার মুসলমান হত্যার বিষয়টিকে তিনি সর্বাধিক ‘ঘৃণ্য’ গণহত্যা বলে অভিহিত করেন। তবে তিনি খুব দ্রুত সুর পাল্টে উল্লেখ করেন, ‘স্রেব্রেনসিয়ার আশপাশের অসংখ্য সার্ব গ্রামে মুসলিম গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া লোকদের কথাও শোনা উচিত।’ সবাইকে একইভাবে দোষী হিসেবে প্রমাণ করার এটি একটি কৌশল, যা অনেকের সাথে খুব কম সংখ্যককে সমান করে ফেলে এবং এই যুদ্ধটি যে বিশেষত সার্ব এবং মিলোযভিক শুরু করেছিল—সে সত্যটিকে আড়াল করে।
হ্যান্ডকে এটি বেশ ভালোভাবেই করেছেন। বসনিয়া থেকে সংবাদ প্রতিবেদন পাঠানো লেখক ডেভিড রাইফ A Journey to the Rivers বইটি পড়ে মন্তব্য করেছেন, ‘সত্য বলতে—তিনি আসলে জানেন না যে তিনি কী বলছেন... তিনি সার্বিয়ায় এসেছিলেন এর জটিল রাজনীতি সম্পর্কে কিছু না জেনেই এবং বইটি প্রমাণ করে যে, তিনি সেখান থেকে ফিরেছেন কিছু না জেনেই।’
পুরস্কার বিজয়ী অনেক লেখক আছেন যারা রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা রাখেন, এবং সময়ে সময়ে বাজে বাজে বইও লেখেন। নোবেল পুরস্কার পাওয়া বা সম্পাদকদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে যাওয়ার সুযোগ লাভের ক্ষেত্রে এটি কোনো অযোগ্যতা নয়। তবে আমরা এখানে একটি গণহত্যা অস্বীকার করার বিষয়ে কথা বলছি। আমরা বলছি—ইতিহাসের গতিধারা বদলে দেওয়া, দুষ্কৃতকারীদেরকে নায়ক এবং ভুক্তভোগীদের খলনায়ক বানানো বিষয়ে। এই ধরনের বিশেষ প্রচলিত একটি ইতিহাস হলো—খ্রিস্টানরা তাদের সংস্কৃতি রক্ষার জন্যই মুসলমানদের হত্যা করে। এই ধরনের ইতিহাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম ইউরোপের মুসলমান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের সঙ্গে চলমান বর্ণ বৈষম্যেকে বৈধতা দানের চেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই বিতর্কের বিষয়ে সুইডিশ অ্যাকাডেমির প্রতিক্রিয়াটি দুঃখজনক। এই বিষয়ে প্রথমদিককার আপত্তিগুলোর বিষয়ে অ্যাকাডেমির স্থায়ী সচিব ম্যাটস মালম নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন যে, হ্যান্ডকে বেছে নেওয়া হয়েছে সাহিত্যিক ও নান্দনিক কারণে। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক বিবেচনার সঙ্গে সাহিত্যমানের সামঞ্জস্য বিধান করা অ্যাকাডেমির কাজ নয়’।
অজুহাত তৈরির জুয়া খেলায় এরকম আরো উদাহরণ আছে। এলেন ডি জেনারেস (মার্কিন টিভি উপস্থাপিকা, অভিনেত্রী) উল্লেখ করেছেন, কত দুর্দান্ত একজন মানুষ ছিলেন জর্জ ড বুশ (ইরাকে আক্রমণ করে কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করার কথাটি মনে না করাই ভালো)। আমাদের পৃথিবী একটি রাজনৈতিক বিশ্ব, আমি আশা করি এলেন এবং সুইডিশ অ্যাকাডেমি তার প্রশংসা করবে। কথা এবং কাজকে বাস্তব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করার একটি বিশেষ দায়িত্ব থাকে ক্ষমতাবান এবং প্রভাবশালী লোকদের।
স্টকহোম বসনিয়া থেকে অনেক দূরে হলেও, এটি নরওয়ে থেকে এতটা দূরে নয়, যেখানে ২০১১ সালে সন্ত্রাসী আন্ডার্স ব্রেভিক ৭৭ জনকে হত্যা করেছিল, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল একটি গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে থাকা শিশু। ব্রেভিক বালকানদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং ১,৫০০ পৃষ্ঠার একটি ইশতেহার লিখেছিলেন, যাতে মিলোযভিকের পুতুল উগ্র জাতীয়তাবাদী সার্বদের উত্সাহিত করা হয় এবং এবং তাদের প্রশংসা করা হয়। সার্বরা বসনিয়ায় যে তাণ্ডবলীলা চালিয়েছে, সেটাকে ক্ষতিকর কিছু নয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার একটি সংস্কৃতিতে আমরা এখন আছি, যে সংস্কৃতির বিরোধিতা করার কোনো দায়িত্বই যেন পুরস্কার প্রদানকারী কমিটির নেই।
পিটার হ্যান্ডকে যা বিশ্বাস করতে চান, তা বিশ্বাস করার অধিকার তার রয়েছে। তিনি যত খুশি মিথ্যা বলতে এবং সেই মিথ্যা ছড়িয়ে দিতে পারেন, এটাই তার অধিকার। তবে সুইডিশ অ্যাকাডেমি যা করেছে তা আমি সহজেই বিশ্বাস করতে পারছি না। তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্তটি সাধারণ মানুষের কাছে পুঁজিপতিদের বিক্রি করা সেই দড়িটির কথা মনে করিয়ে দেয়, যে দড়ি দিয়ে সেই সাধারণ মানুষদেরকেই ফাঁসিতে ঝুলানো হবে। নোবেল কমিটি পুরস্কারের জন্য এমন একটি নির্বাচন করেছেন, যা তাদের পুরস্কারকে ধ্বংস করবে, যেমনটি হওয়ারই কথা।
