একাকীত্বের বিভূতি

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:৩০

বাংলা কবিতায় শূন্য দশকের কবিদের একটা চ্যালেঞ্জ আছে। কবিতার এই সন্ধিক্ষণ সময়ে শূন্যকে করে তুলতে হবে অর্থবহ। পঞ্চাশ দশক থেকে শূন্য দশক, ষাট বছরের পথ পরিক্রমায় বাংলা কবিতা বারবার অবিমৃষ্যকারীদের ভিড় থেকে উঠে দাঁড়াতে চেয়েছে। 

আমি তারুণ্যের শক্তিতে বিশ্বাস করি বলেই—সব সময় রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতাটিতে পরাবৃত হই—‘আয় অশান্ত, আয়রে আমার কাঁচা/ আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।’

আদিত্য নজরুলের কবিতায় যে তরতাজা উপজীব্য এবং বয়সশৈলীর নিবিষ্টতা, তাতে তাকে আমার অর্গানিক মনে হয়েছে। বর্তমান বিশ্ব অর্গানিকের জন্য কাঁদছে। অন্তত আদিত্য নজরুল তার এই ম্যাটামডার্ন চারিত্র্য অর্জনে অনেকটাই সফল। ‘ধ্রুব’ শিরোনামের কবিতাটির কয়েকটি লাইন এখানে তুলে দিচ্ছি—

দুঃখ ও বেদনা

স্বনির্ভর এক কৃষকের প্রতিচ্ছবি

যে কি’না অবিরল

 

উত্পাদন করে যাচ্ছে

নেরুদার অসমাপ্ত বিপ্লবী শস্য

এখানেই আদিত্যের অর্গানিকমুখিনতা ধরা পড়ে। তার দায়বদ্ধতা—নিশ্চয়ই কবির দায়বদ্ধতা থাকবে—তবে তা কার মতো? আদিত্য নজরুল বলছেন নেরুদার মতো। এবং অবশ্যই বিপ্লবী শস্যে। আমরা পেয়ে যাই এক গভীর অন্তর্বরণ আর নেরুদার বিপ্লবী ভাবমূর্তি। বাংলাদেশের মার্কসীয় কবিরা প্রেমের রচনা সৃষ্টিতে অনাগ্রহী ছিলেন, কিন্তু নেরুদা সেই সফল কবি, যিনি প্রেম ও প্রকৃতির মধ্যে তার বিপ্লবী সত্তাকে সমর্পণ করেছিলেন। আদিত্য নজরুলের ‘উপলব্ধি’ কবিতায় পাই শূন্য দশকের সব কবিতার উপলব্ধির সমন্বয়।

 

আমি কি এমন দুঃখে আছি

কলঙ্ক মাথায় নিয়ে বড় বেশি

দুঃখে কাঁদে চাঁদ

নিজস্ব ভূখণ্ড নেই বলে

স্বর্ণলতারও দুঃখ অনেক

ঘুঘু চরা ভিটেরও আছে বহু দুঃখ

 

অনিকেত মানুষের বেদনা, উদ্বাস্তু লোকমানসের মর্মন্তুদ কান্না আর শূন্য ভিটের হাহাকার খুব অল্প কথায়, পরিশীলিত শব্দবন্ধে তুলে এনেছেন আদিত্য। অলঙ্কারের বাহুল্য নেই, নেই বক্তব্যের ভার কিংবা অনুপ্রাস উেপ্রক্ষার দখলদারিত্ব। আছে নির্ভার স্বাধীন বাক্যবন্ধ, কিন্তু তাতে আছে অকৃত্রিম গভীরতা আর নন্দনের অনিবার্য উপস্থিতি। আছে অজস্র উদ্বেগ, আছে শঙ্কা কিন্তু এগুবার যে মন্ত্র তা’ও কণ্ঠে আছে—তুলে দিচ্ছি সেই মন্ত্রের মর্মরিত কয়েকটি লাইন—

চারদিকে অনিয়মে ভরে যাচ্ছে

সুচতুর জুয়াচালে

ট্রাভেল এজেন্সিগুলো

বিক্রি করে দিচ্ছে

পাখিদের উড়াল প্রতিভা

তুমি কতদূর গেছো?

বাংলা কবিতার প্রারম্ভ উত্তর-উপনিবেশকালে এবং অবশ্যই মাইকেল মধুসূদন দত্ত থেকে। বুদ্ধদেব বসু মেঘনাদ বধ কাব্যের বিচারের ক্ষেত্রে যে ত্রুটি নির্দেশ করতে চেয়েছেন—এখন যুগ প্রমাণ করেছে—এখানেই মধুসূদনের শক্তি। বাক্যের পরিমিতি, নিরাভরণ দেহ দীর্ঘসূত্রতাকে পরিহার, সংকেতের সাহায্যে কিংবা ইশারায় প্রকৃত সত্য ও বক্তব্য বুঝিয়ে দেওয়া শূন্য কবিদের অন্বিষ্ট বলে মনে হয়েছে আমার। কাব্যরূপ, শব্দের অমোঘ ব্যবহার মধুসূদনকে যেভাবে আধুনিক করে তুলেছিল, প্রত্যাশা করি শূন্যের কবিদেরও সেই চিরায়ত কাব্যবোধে উদ্দীপ্ত হতে হবে। মধুসূদনের পরে বিষ্ণু দে মধুসূদনের দোষে দুষ্ট। এবং অস্বীকার করব না বিষ্ণু দে’র আয়োজনের মধ্যে মধু কবি প্রাণায়ামরত। আজ সময় এসেছে দুশো বছরের বাংলা কবিতার বিষয় ও বাক্প্রতিমা নিয়ে চিন্তা করার। কবি সময়ের দাস নয়, কবিতা বাংলাদেশের সত্য জীবন এবং অবশ্যই সময়ের প্রতিনিধি। আদিত্য সময়ের প্রতিনিধিত্ব করেন। এবং অবশ্যই তার ‘বোধ’ জাগ্রত করে নিচের লাইনগুলো—

‘হিংস্রতা কিংবা প্রেম যাই হোক/ সবকিছুরই/ সূত্রপাত চোখ হতে।

আমরা বলবো সবকিছুরই সত্যবাক আছে। হতাশা ও বেদনার মধ্যে

এই কথাগুলো তীব্রভাবে আমাদের বিক্ষুব্ধ চেতনাকে আলোড়িত করে। কারণ ‘দুঃখ তার যোগ্য শত্রু/ পেয়েছে বলেই/ জীবন এতোটা/ রক্তমাখা হয়েও/ সুখ প্রিয়।’

এই চিরায়ত উচ্চারণ আদিত্য নজরুলের স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করে। যদিও প্রতিটি মানুষ এই শ্রেণিবিভক্ত সমাজে একা

একা

এবং

শেষ পর্যন্ত একাই।

একাকীত্বের এই অহম কবিদের হাজার বছর ধরে শ্লেজ গাড়ির মতো টেনে নিয়ে যায় ভবিষ্যতের দিকে। আদিত্য নজরুল শূন্য দশকের নিঃসঙ্গতার মধ্যেও শূন্যের আরো একটা এক যুক্ত করেছেন। কারণ তিনি মগ্নতায় ডুবে থাকেন। কবিতার মগ্নতা ছাড়া কে কবে উচ্চারণ করতে পেরেছে... ঈশ্বরকে ঋণগ্রস্ত রেখে কি লাভ?