বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু

নৌকায় ভোট দিয়ে আগুন সন্ত্রাসীদের জবাব দিন

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:৩৯

গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় প্রথম নির্বাচনী জনসভায় দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী ও যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যাদের শাস্তি হয়েছে তাদের দোসরদের প্রার্থী করা হয়েছে। যারা স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, আগুনসন্ত্রাসীদের নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমেছে, নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে তাদের উপযুক্ত জবাব দিন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতায় আসলে তারা দেশকে ধ্বংস করে দেবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে দেবে। আবার এ দেশের মানুষ ক্ষুধার্ত হবে, অশিক্ষিত হবে, মানুষের ভাগ্যের বিপর্যয় ঘটবে। মানুষের ভাগ্য নিয়ে আর যেন তারা ছিনিমিনি খেলতে না পারে, সেজন্যই নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে জনগণের সেবা করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

গতকাল বুধবার বিকেলে কোটালীপাড়ার উপজেলা সদরে শেখ লুত্ফর রহমান আদর্শ সরকারি মাঠে একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের বিশাল জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছি, জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচার করেছি। বাংলাদেশ আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। এই অগ্রযাত্রা আমাদের ধরে রাখতে হবে। 

শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের প্রথম নির্বাচনী জনসভা থেকে সমগ্র দেশবাসীর কাছে আবেদন জানাই, নৌকা মার্কায় ভোট চাই, জনগণের সেবা করতে চাই। দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।  তিনি বলেন, ২০২১ সালে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করব। সেই সময় যেন স্বাধীনতাবিরোধী, খুনি, রাজাকার, অগ্নিসন্ত্রাসকারীরা ক্ষমতায় না থাকে।

এর আগে গোপালগঞ্জে পৌঁছেই প্রধানমন্ত্রী সর্বপ্রথম টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাঁর মাজার জিয়ারত করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা উপস্থিত ছিলেন। এরপরই প্রধানমন্ত্রী তাঁর নিজের নির্বাচনী আসন গোপালগঞ্জ-৩ (টুঙ্গিপাড়া-কোটালীপাড়া) এর ভোটারদের কাছে নিজের জন্য নৌকা মার্কায় ভোট চান। আর এর মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা তাঁর নির্বাচনী প্রচারের দায়িত্ব এলাকার ভোটারদের ওপর ছেড়ে দিয়ে বলেন, আপনারাই নৌকায় ভোট দিয়ে আমাকে নির্বাচিত করেন। আপনাদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের জনগণের সেবা করার সুযোগ পাই। এজন্য আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এবারও আমি আপনাদের সেই দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি। আমার আপনজন বলতে ছোট বোন আছে আর আছেন আপনারা। আপনারা আমার আপনজন হয়ে টুঙ্গিপাড়া ও কোটালিপাড়ায় গ্রামে গ্রামে মানুষের কাছে গিয়ে আমার জন্য নৌকা মার্কায় ভোট চাইবেন। আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে আরেকটিবার দেশ সেবা করার সুযোগ করে দেবেন।

শেখ হাসিনা আরো বলেন, আমাদের সবসময় একটাই লক্ষ্য থাকে, জাতির পিতা এই বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। এই বাংলাদেশ কারো কাছে ভিক্ষা করে চলবে না। এই বাংলাদেশের মানুষ মাথা উঁচু করে চলবে। সেই মর্যাদা নিয়ে চলবে। সেই মযার্দাটা যাতে মানুষ পায় আমরা সেভাবে দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।  তিনি বলেন, যেখানে দারিদ্র্যের হার ৪০ ভাগ ছিল, আজকে ২১ ভাগে কমিয়ে এনেছি। আমাদের লক্ষ্য সামনে, আমরা যখন স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করবো, তখন দেশ হবে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

জনসভা পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে:সড়কপথে বেলা দেড়টার দিকে টুঙ্গিপাড়ায় পৌঁছেই প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু মাজারে যান এবং জাতির জনকের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন শ্রদ্ধা জানান এবং বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা জাতির পিতার মাজার জিয়ারত করেন। নিজ পৈত্রিক নিবাসে দুপুরের আহার ও নামাজ আদায় শেষে প্রধানমন্ত্রী বিকাল চারটায় কোটালিপাড়ার জনসভাস্থলে যান। এদিকে এই জনসভাকে ঘিরে অন্যরকম উম্মাদনা লক্ষ্য করা গেছে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায়। সকাল ১১টা থেকেই মানুষের ঢল নামতে শুরু করে জনসভা অভিমুখে। হাজার হাজার মানুষ বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা করে জনসভায় আসতে থাকেন। জনসভা পরিণত হয় জনসমুদ্রে।

কোটালীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুভাষ চন্দ্র সুত্রধরের সভাপতিত্বে জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, বিএম মোজাম্মেল হক, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক শেখ মো. আবদুল্লাহ, কেন্দ্রীয় সদস্য এস এম কামাল হোসেন, যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাউছার, গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান চৌধুরী এমদাদুল হক প্রমুখ । জনসভা মঞ্চে এবারই প্রথম বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ রেহানা উপস্থিত থাকলেও তিনি বক্তব্য রাখেননি। কিন্তু চমক হিসেবে শেখ রেহানার অনুরোধে জনসভায় বক্তব্য রাখেন দেশের জনপ্রিয় দুই চলচ্চিত্র অভিনেতা ফেরদৌস ও রিয়াজ। 

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁর বারবার প্রাণনাশের চেষ্টার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বারবার আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু আমি কখনও মৃত্যুকে পরোয়া করি না, কোন ষড়যন্ত্রকে আমি ভয় করি না। প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করে বলেন, দেশের ৯৬ ভাগ মানুষ আজকে বিদ্যুত পাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য প্রতিটি ঘর আলোকিত হবে। তিনি বলেন, কওমী মাদ্রাসা যারা ছিল সম্পূর্ণ অবহেলিত, আজকে কওমী সনদ স্বীকৃতি দিয়ে তাদের সনদ দিচ্ছি। আমরা প্রতিটি মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। যাতে এদেশের কেউ অবহেলিত না থাকে।

বিএনপি-জামায়াতের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৪ সালের নির্বাচন ঠেকানোর নামে ওই বিএনপি-জামায়াত জোট মিলে অগ্নিসন্ত্রাস করেছে, জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে পুড়িয়ে হত্যা করেছে।

গতকাল রাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টুঙ্গীপাড়ায় নিজ বাড়িতে অবস্থান করেন। আজ বৃহস্পতিবার সকালে তিনি ভাঙ্গা, ফরিদপুর মোড়, রাজবাড়ি মোড়, পাটুরিয়া ঘাট, মানিকগঞ্জ, সাভারসহ মোট সাতটি স্থানে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন। রাতেই ঢাকায় ফিরে আসবেন প্রধানমন্ত্রী।