৯ মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পর পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের পরাজিত করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ শত্রুমুক্ত হয়। ওই দিন সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরের আশেপাশের মুক্তিযোদ্ধারাসহ হাজার হাজার মুক্তিকামী জনতা নারায়ণগঞ্জ নৌ টার্মিনাল ও টিএন্ডটি অফিসে অবস্থানরত পাক বাহিনী সদস্যদের আটক করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে উল্লাস করতে থাকে। দুপুরের পর থেকে নারায়ণগঞ্জ শহর উল্লাসের নগরীতে পরিণত হয়। শত্রুমুক্ত নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি বাড়ি-ঘরে উড়তে থাকে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা।
অবশ্য এর আগে পাক হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে নারায়ণগঞ্জের মুক্তিকামী জনতা প্রথম পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে ২৬ মার্চ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কের মাসদাইরে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়লে দুই দিন এখানে যুদ্ধ হয়। পরে পাকবাহিনীর নির্বিচার গণহত্যায় ২৭ জন নিহত হয়। এরপর নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার বক্তাবলী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণসহ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আট মাস এলাকাটি মুক্ত এলাকা ছিল। তবে ১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বর পাকবাহিনী বক্তাবলীতে ঢুকে শত শত বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়াসহ ১২৯ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পরে মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে যান।
৯ মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর কমান্ডার এম এ সামাদের নেতৃত্বে প্রথম আড়াইহাজার শত্রুমুক্ত হয়। আড়াইহাজার উপজেলার ডাকবাংলাতে পাকবাহিনীর ঘাঁটি দখল করে শত শত মুক্তিকামী মানুষকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে বিজয় উল্লাস করে। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা নারায়ণগঞ্জ শহরের দিকে এগোতে থাকে। ১২ ডিসেম্বর সোনারগাঁও শত্রুমুক্ত করে মুক্তিযোদ্ধারা। মূলত ১২ ডিসেম্বরের পর থেকে মুক্তিযোদ্ধারা স্থানীয় মুক্তিকামী মানুষের সহায়তায় শহরের দিকে এগোতে থাকে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এ সময় পাকবাহিনী তাদের শক্তি বৃদ্ধি করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকবাহিনীর যুদ্ধ চলতে থাকে। এ সময় ২ নম্বর সেক্টরের আওতাধীন নারায়ণগঞ্জের পুরো দায়িত্বে ছিলেন মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ। মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার তমিজউদ্দিন রিজভী ও মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ১৫ ডিসেম্বর গিয়াসউদ্দিন বীর প্রতীকের নেতৃত্বে সামিউল্লাহ মিলন, তমিজউদ্দিন রিজভী, আতাউর, মতিন, বাতেন, সবুজ, নূর মিয়া চৌধুরী বাচ্চু, সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, আব্দুর রব প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধারা শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বপার বন্দরে এসে বন্দরকে শত্রুমুক্ত করে বিভিন্ন পথে শহরে প্রবেশের চেষ্টা করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তখন মিত্রবাহিনীর ৫৮ মাউন্টেন ডিভিশন যোগ দেয়।
তিনি আরও বলেন, ১৬ ডিসেম্বর সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরের আশেপাশের সব মুক্তিযোদ্ধাসহ হাজার হাজার মুক্তিকামী জনতা নারায়ণগঞ্জ নৌ টার্মিনাল ও টিএন্ডটি অফিসে অবস্থানরত পাকবাহিনীকে আটক করে। পরে তারা সবাই মিলে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে উল্লাস করতে থাকে। ওই দিন দুপুরের পর থেকে নারায়ণগঞ্জ শহর উল্লাসের নগরীতে পরিণত হয়। শত্রুমুক্ত নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি বাড়ি-ঘরে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উড়ানো হয়।
