২ শতাংশ আর্থিক প্রণোদনা
প্রবাহে আসবে নতুন গতি
g রেজাউল করিম খোকন
বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, প্রবাসী আয় প্রাপ্তিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে নবম অবস্থানে রয়েছে। ২০১৮ সালে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ১ হাজার ৫৫০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি হলো রেমিট্যান্স। অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের গুরুত্ব বিবেচনায় দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমজীবী মানুষের কষ্টার্জিত বৈদেশিক আয় বৈধ উপায়ে দেশে পাঠাতে উত্সাহিত করতে প্রেরিত রেমিট্যান্সের বিপরীতে সরকার বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ সুবিধা ওয়েজ আর্নার্স রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। বিদেশ থেকে পাঠানো প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স আহরণকারী ব্যাংক প্রচলিত বিধিবিধান পরিপালন করে উপকারভোগী অর্থাত্ বেনিফিসিয়ারির হিসাবে জমা অথবা উপকারভোগীকে দেওয়ার সময় উক্ত অর্থের ওপর ২ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেবে। একজন প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর প্রতিবারে সর্বোচ্চ ১৫০০ মার্কিন ডলার সমমূল্যের অর্থের জন্য প্রণোদনা হিসেবে ২ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেবে। বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের রেমিট্যান্স আহরণের গড় মাসিক অংকের ভিত্তিতে তিন মাসের জন্য প্রয়োজনীয় নগদ সহায়তার অনুমিত পরিমাণের তহবিল সরকারি বরাদ্দ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ইমপ্রেস্ট আগাম আকারে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অনুকূলে হস্তান্তর করছে।
তফসিলি ব্যাংকের অনুকূলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রদত্ত ইমপ্রেস্ট তহবিল শেষ হয়ে গেলেও ব্যাংকগুলো নিজ তহবিল থেকে নির্ধারিত হারে নগদ সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রাখবে। পরবর্তীকালে তাদের চাহিদার প্রেক্ষিতে সরকারের কাছ থেকে তহবিল প্রাপ্তির পর তা পুনঃভরণ করা হবে। রেমিট্যান্স প্রাপকের অনুকূলে নগদ প্রণোদনা সহায়তা প্রদানে অযথা বিলম্ব কিংবা হয়রানি করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এবং জড়িত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ।
চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স তথা প্রবাসী আয় পাঠালে ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এরপর গত ৬ আগস্ট এ বিষয়ে নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে এই প্রণোদনা দেওয়া শুরু হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধিতে যার ইতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই রেকর্ড সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি। গত সেপ্টেম্বর মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ২৯ শতাংশ। রেমিট্যান্সে প্রণোদনা দেওয়াকে বাজেটে সরকারের সবচেয়ে সঠিক এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন সবাই। প্রণোদনায় এখন থেকে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো কমবে আশা করা যাচ্ছে। এখন থেকে ব্যাংকে গেলেই প্রবাসী আয়ের প্রণোদনার টাকা পাওয়া যাবে। বিশ্বের যে কোনো দেশ থেকে কেউ যদি রেমিট্যান্স পাঠান, তাহলে তিনি ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা পাবেন। গত ১ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত যারা অর্থ পাঠিয়েছেন, তারাও এখন এই প্রণোদনা পাবেন। বৈধ উপায়ে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য ২ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা দিতে সরকার বাজেটে যে বরাদ্দ রেখেছিল, তা থেকে অর্ধেক টাকা ছাড় করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সম্প্রতি এক হাজার ৫৩০ কোটি টাকা ছাড় করে প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে তিন হাজার ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
আশা করা যায়, চলতি অর্থবছরে প্রবাসী আয় ১ হাজার ৮০০ কোটি থেকে ২ হাজার কোটি মার্কিন ডলারও হয়ে যেতে পারে। বিদায়ী অর্থবছরে এটি ছিল ১ হাজার ৫০০ ডলারের মতো। এখন থেকে ১ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত পাঠানোর ক্ষেত্রে কাউকে কোনো প্রশ্ন করা হবে না, কোনো কাগজপত্রও চাওয়া হবে না। এমনকি ১ হাজার ৫০০ ডলারের মধ্যে দিনে তিন-চারবার করেও দেশে অর্থ পাঠানো যাবে। একবারে কেউ এর চেয়ে বেশি ডলার পাঠাতে চাইলেই কেবল কাগজপত্র চাওয়া হবে। এসব কাগজপত্রের মধ্যে আছে প্রবাসীর পাসপোর্টের কপি, বিদেশি কোম্পানির নিয়োগপত্র, ব্যবসা করলে তার নথিপত্র ইত্যাদি।
অন্যদিকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে সুবাতাস বইছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি। আর গত সেপ্টেম্বর মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ২৯ শতাংশ। প্রতি বছর দুই ঈদের পর রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যায়। আগস্টে কোরবানির ঈদের পর ধারণা করা হয়েছিল সেপ্টেম্বরে প্রবাসীরা কম রেমিট্যান্স পাঠাবেন। কিন্তু এবার তেমন হয়নি। সেপ্টেম্বরে ১৪৬ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন তারা। যা মাসের হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে চতুর্থ সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। এর আগে গত মে মাসে রোজার ঈদকে সামনে রেখে ১৭৪ কোটি ৮১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিল প্রবাসীরা। যা ছিল মাসের হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল জুলাই মাসে; ১৫৯ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল ২০১৮ সালের মে মাসে ১৫০ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা, জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহে সুখবর দিয়ে শেষ হয় ২০১৮-১৯ অর্থবছর। গত অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেমিটেন্সে প্রবৃদ্ধি ছিল আরো বেশি; ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ।
রেমিট্যান্স অর্জনে গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরেও ভালো প্রবৃদ্ধি নিয়ে শুরু হয়েছে। সাধারণত ঈদের পর প্রবাসীরা কম রেমিট্যান্স পাঠান। কিন্তু এবার দুই ঈদের পরও রেমিট্যান্স বেড়েছে। এটা খুই ভালো খবর। প্রণোদনা দেওয়ার কারণেও রেমিট্যান্স বাড়ছে। এছাড়া বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হয়েছে। সেসব দেশে অবস্থানকারী আমাদের প্রবাসীরা এখন বেশি মজুরি পাচ্ছেন; বেশি অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে জনশক্তি রপ্তানি বাড়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স। বর্তমানে ১ কোটির বেশি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। জিডিপিতে তাদের পাঠানো অর্থের অবদান ১২ শতাংশের মতো। স্থানীয় বাজারে ডলারের তেজিভাব এবং হুন্ডি ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা পদক্ষেপের কারণে বেশ কিছু দিন ধরেই রেমিট্যান্স বাড়ছে। এদিকে রেমিট্যান্স বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়নও (রিজার্ভ) সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে।
