অণুগল্প

মরমে মরা

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২১:২৪

 

লোকটির মিষ্টি কথায় কেমন করে ভুলে গেল সে? এই দিনেদুপরে তাকে বোকা বানিয়ে চলে গেছে। ঠিক হয়েছে। আড়ালে কোথাও দাঁড়িয়ে লোকটি নিশ্চয়ই লক্ষ করছে কখন বাস ছেড়ে যায়। বাস ছেড়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। তাকেও যেতে হবে। লোকটাকে খোঁজার চেষ্টা করলে নির্ঘাত বাস ফেল করবে। হাল ছেড়ে দিয়ে  নিজের হাত নিজেই কামড়াতে ইচ্ছে করছে নিশার। হায় রে কত রকমের ফাঁকিবাজ লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে ভদ্রলোক সেজে। ভালোই হয়েছে, তার মতো বেখেয়ালিদের এই রকম শিক্ষাই হওয়া উচিত। সে অন্য চিন্তায় মন দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু চেষ্টা করলে কী হবে! ঘুরেফিরে গোবরে-পোকার মতো প্যাঁচ ঘুরে ঢুকে যাচ্ছে তার মনগোবরের মধ্যেই।

টাকা অল্প কিন্তু সাত সকালে এমন ফাঁকিবাজির মধ্যে পড়ল? এই আফসোসই তাকে অশান্তির জঞ্জালে ফেলে দিয়েছে। দেখছে দিন রাত মানুষের ধাপ্পাবাজি। তারপরেও বয়স্ক লোকটার হাতে নির্লিপ্তের মতো পাঁচ শ টাকার নোটটা ধরিয়ে দিল। ভাঙতি নেই তো কী হয়েছে। বাসে উঠে পরে কনডাকটরকে টিকিটের দাম দিয়ে দিলেই হতো। শেষটায় নিজেকে গালমন্দ করতে করতে বাসে গিয়ে বসল সে। কিছুক্ষণের মধ্যে আরো সব যাত্রীর সঙ্গে লোকটিও উঠল, নিশা খেয়াল করেনি। হাত বাড়িয়ে তার ভাঙতি টাকা ফেরত দিল। তারপর নিজে সিটে বসল। পাশাপাশি সিট। নিশা বারকয়েক সরি বলল।

—সরি কেন মা?

—না মানে, টাকা ভাঙাতে গিয়ে আপনার কত কষ্ট হলো!

—কী বলি বল তো, এক কাপ চায়ের নেশা আর একটা খবরের কাগজ কিনবার জন্যে আশেপাশে কোথাও না পেয়ে একটু দূরে যেতে হলো। এই গরমে ঘেমে নেয়ে উঠেছি একেবারে।

ভদ্রলোকের আসতে দেরি দেখে কত আজেবাজে চিন্তা করেছে। মরমে মরে যেতে লাগল নিশা। মনের দীনতায় বারবার সরি বলছিল সে।

—কোথায় যাবে তুমি?

—ভাসানী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে।

—তাই নাকি, ভালোই হলো। পুরো পথটা  যাওয়া যাবে তোমার সঙ্গে গল্প করতে করতে।

—আপনার কী কাজ ওখানে।

—শিক্ষকতা।

নিশা লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যেতে লাগল। এর আগে কখনো দেখা হয়নি। একই ক্যাম্পাস কিন্তু নিজের ডিপার্টমেন্টের বাইরে তেমন কাউকে চেনে না সে।

এই যে শেষ ভাদ্রের খর রোদ্দুর। চারিদিকে নিদারুণ সন্তাপ। শিক্ষকের মুখের দিকে তাকিয়ে একরাশ প্রশান্তি নেমে এলো তার ভিতরে। ভালো করে লক্ষ করতেই দেখল মোটা ফ্রেমের চশমা চোখে। কাঁচাপাকা চুলে প্রশস্ত অবয়ব জুড়ে প্রবাহিত এক নদীর স্বচ্ছতা। চোখ দুটোতে অন্ধকারে আলোর প্রদীপ।