মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ও সার ব্যবহারে ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২১:৪৮

মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ

কৃষিতে কীটনাশকের ব্যাপক প্রয়োগ এবং মাত্রাতিরিক্ত সার ব্যবহার দেশের জনস্বাস্থ্যকে ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। কৃষিপণ্যকে কীটনাশক থেকে রক্ষা করা গেলে মানুষ অনেকটা স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে মুক্ত হতে পারত বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজন। তারা বলেছেন, জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা গবেষণাগারে ৮২টি খাদ্যপণ্য পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এতে গড়ে ৪০ শতাংশ খাদ্যেই মানবদেহের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি নিষিদ্ধ ডিডিটি, এনড্রিন, ক্লোরডেন, হেপ্টাক্লোর এবং অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান রয়েছে। এসব রাসায়নিক বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।

এদিকে ৩৫ শতাংশ ফল ও ৫০ শতাংশ শাকসবজির নমুনাতেই বিষাক্ত বিভিন্ন কীটনাশকের উপস্থিতি রয়েছে। চালের ১৩টি নমুনায় মিলেছে মাত্রাতিরিক্ত বিষক্রিয়াসম্পন্ন আর্সেনিক। পাঁচটি নমুনায় পাওয়া গেছে ক্রোমিয়াম। হলুদের গুঁড়োর ৩০টি নমুনায় ছিল সিসা ও অন্যান্য ধাতু। লবণেও সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০-৫০ গুণ বেশি সিসা পাওয়া গেছে। মুরগির মাংস ও মাছে পাওয়া গেছে মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর এন্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব। হলুদ ও লবণে সিসাসহ আরো কিছু ধাতব উপাদান প্রয়োগের মাধ্যমে এগুলো চকচকে ও ভারী করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতি মুনাফালোভী কৃষক, উত্পাদনকারী, মজুতকারী, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা খাদ্যে রাসায়নিক দ্রব্যাদি, ডিডিটি, কীটনাশক, কাপড়ের রং, রেল ইঞ্জিন, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার, মোটরযান, নৌযান ও কলকারখানার পোড়া তেল ও মবিল মিশ্রিত তেল, ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথেফেন, কৃত্রিম হরমোন ব্যবহার করছে। কৃষিজাত পণ্যে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ও কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। মিষ্টিতে কাপড়ের রং প্রয়োগ করা হয়। শুঁটকি মাছ সংরক্ষণে ডিডিটি ও হেপ্টাক্লোর ব্যবহার করা হয়। এসব রাসায়নিক মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিষ ও ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে না পারলে দেশ ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে। এটি দেশের মানুষকে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দেবে। সরকার, নাগরিক সমাজ ও সর্বসাধারণের সচেতনতাই পারে এই পরিস্থিতিকে পালটে দিতে।

পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন’—পবার চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, আমাদের চারপাশের পরিবেশ আজ নানাভাবে দূষিত ও বিপর্যস্ত। এ অবস্থায় সবার জন্য নিরাপদ খাদ্যের জোগান দেওয়া সত্যিই এক দুরূহ জটিল কাজ। কিন্তু আমাদের সবার সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য এবং ভবিষ্যতের নিরাপদ বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাদ্যের জোগান জরুরি। আর মানুষসহ সব প্রাণসত্তার জন্য নিরাপদ খাদ্যের জোগানের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের নির্মল পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা করতে সমন্বিত জাগরণ দারকার। তিনি বলেন, খাদ্যে রাসায়নিক দ্রব্যাদি মিশানোর সঙ্গে জড়িত এবং রাসায়নিক দ্রব্যাদিযুক্ত ও ভেজাল খাদ্য বিক্রয়কারীদের মোবাইলকোর্টের মাধ্যমে দণ্ড প্রদান অব্যাহত রাখতে হবে।

প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, জমির মাটি থেকে খাবারের থালা অবধি খাদ্য নিরাপদ হওয়া জরুরি। খাবার নিরাপদ কি না, এ নিয়ে নিয়মিত খাদ্য পরীক্ষাও জরুরি। আমরা যেমন খাবারে কোনো ভেজাল চাই না, আবার ফরমালিন-কার্বাইড বা ক্ষতিকর কোনো উপাদান খাবারে মিশে থাকুক তা-ও চাই না। সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ রাসায়নিক পদার্থের আমদানিকারক ও ব্যবহারকারী এবং লেবেল ছাড়া বা মিথ্যা লেবেলের অধীন কীটনাশক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।