মো. সাইফুল ইসলাম
গত ২১ আগস্টের পত্রিকায় প্রকাশিত ছোট্ট একটি খবর আমাকে ব্যথিত করেছে। সত্যি বলতে বিবেকবান সবারই হূদয়কে ব্যথিত, বিবেককে দংশন করেছে। সেটা হলো ‘চট্টগ্রামে কুকুরের মুখ থেকে নবজাতক উদ্ধার’। এক নিঃশ্বাসে সমগ্র সংবাদ পড়ে হূদয়ে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করলাম। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। প্রতিটি ধর্মেই মানুষ মানুষকে ভালোবাসার, শ্রদ্ধা করার বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। তবে মানবশিশুর অবস্থান কেন আবর্জনার মধ্যে হবে? তবে কেন বৃদ্ধ মাকে রাস্তার ধারে ফেলে রেখে সন্তানেরা ঘরে ফিরে যাবে? কেন বৃদ্ধ বাবা রিকশা চালাবেন আর বিনা চিকিত্সার যন্ত্রণায় রাস্তার ধারে বস্তিতে কাতরাবেন? প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার আগে অন্তরের অন্তস্থল থেকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, সেই সাহসী ও মানবতাবাদী পুলিশ সদস্য এসআই মোস্তাফিজুর রহমানকে, যিনি তিনটি কুকুরের মুখ থেকে একটি নবজাতককে উদ্ধার করে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। সমাজের নৈতিক অবক্ষয় ও ধর্মীয় অনুশাসন না মানার কারণে মূলত এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও অপরাধ করে আইনের হাত থেকে পার পাওয়ার মানসিকতাই এ ধরনের অপরাধকে উত্সাহিত করে বলে মনে হয়।
নবজাতককে ডাস্টবিনে, ড্রেনে আবর্জনা স্তূপে কুড়িয়ে পাওয়ার ঘটনা এদেশে নতুন নয়। তবে ইদানীং এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। পাপ-পুণ্যের হিসাব কষেই যদি এসব নবজাতককে আবর্জনায় ফেলা হয়, তবে একজন মানুষ হিসেবে বলব, ‘পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়’ আর নবজাতককে তো নয়ই। কবি সুকান্তের কথায় বলি ‘যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলো আজ রাত্রে, তার মুখে খবর পেলুম, সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক, নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার, জন্মমাত্র সুতীব্র চিত্কারে’। তাই এসব নবজাতকের অধিকার আছে বেঁচে থাকার আর আমাদের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব সৃষ্টির সেরা মানবসন্তানদের বাঁচাতে এগিয়ে আসা। মহান আল্লাহ যদি জীবন দান করেন, তবে আল্লাহর দেওয়া জীবনপ্রাপ্ত নবজাতককে হত্যা করার অধিকার বাবা-মা বা অন্য কারো হতে পারে না।
যে নবজাতককে নিয়ে আজকের এই লেখা, তার মাকে খুঁজে পাওয়া গেছে। তিনি একজন ভারসাম্যহীন নারী, বলতে গেলে মানসিক বিকারগ্রস্ত। তাহলে প্রশ্ন হলো, কতটা নির্মমতার স্বীকার এই নারী? কতটা যন্ত্রণা তাকে সইতে হয়েছে? আর কতটা যন্ত্রণার পথচলা তার বাকি? আর যেসব নরপশু এ কাজ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আজ নিজেকে বাকহীন বলেই মনে হয়। সত্যিই মাঝে মাঝে অবাক হই এই ভেবে যে এ ধরনের কিছু বিকারগ্রস্ত মেয়ে বা নারীকে আমরা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে দেখি। তাহলে সমাজের বিত্তবানেরা কি এদের দেখেন না? এদেশের বেসরকারি হাসপাতালের মালিক ও ডাক্তাররা কি এদের দেখেননি? সরকারি কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান এদের দেখার জন্য এবং এদের যন্ত্রণা লাঘবের জন্য নেই কি? নিশ্চয়ই কেউ না কেউ দেখে থাকবেন। তাহলে এই ভারসাম্যহীন নারীদের কি তারা ন্যূনতম চিকিত্সা দিতে পারতেন না? সমাজে আজ প্রকৃত সমাজসেবীর সংখ্যা মাঝে মাঝে খুবই কম বলে মনে হয়। আগে সমাজসেবীরা গ্রামে পুকুর কাটতেন, পানীয় জলের ব্যবস্থা করতেন। সমাজের মঙ্গলের জন্য রাস্তাঘাট, বাজার, স্কুল, পুল-কালভার্ট, সাঁকো ইত্যাদি নিজ উদ্যোগে মানবতার সেবার জন্য বানাতেন। আজ অনেক বিত্তশালী শুধুই করপোরেট উন্নতির জন্য স্কুল, হাসপাতাল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এসব প্রতিষ্ঠানকে তারা পয়সা বানানোর হাতিয়ার বা মেশিন হিসেবে ব্যবহার করছেন। আশা করি এই লেখার পর কোনো না কোনো সমাজসেবী, কোনো না কোনো বিত্তশালী এ ধরনের বিপদগ্রস্ত মা ও নবজাতকের জীবন বাঁচাতে সত্যিই কিছু একটা করবেন।
সমাজে যেসব দুস্থ নারী এ ধরনের ঘটনার স্বীকার হয়ে নবজাতকদের জন্ম দিচ্ছেন, তাদের অবশ্যই সাহসী ভূমিকায় আসতে হবে। জোর করে তাদের নিজ নিজ মাতৃত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রয়োজনে আদালত পর্যন্ত যেতে হবে, পিছপা হলে চলবে না। আইনজীবীরা আশা করি এদের পাশে দাঁড়াবেন এবং বিনা মূল্যে এদের প্রয়োজনীয় সব রকমের আইনি সহায়তা প্রদান করবেন। আর রাষ্ট্র অবশ্যই এ ধরনের নারী ও নবজাতকের আশ্রয়স্থল বানিয়ে অত্যন্ত যত্নসহকারে মা ও নবজাতকদের বেড়ে উঠতে সাহায্য করবে। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব অপকর্মের হোতাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে ধরে এনে যথাযথ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দৃশ্যত এমন উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে করে কোনো নরপশু এ রকম বিকারগ্রস্ত, মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়েদের দিকে তাকাতেও সাহস না পায় আর আমাদের মনুষ্যত্বকে কখনোই ভূলুণ্ঠিত করতে না পারে। পরিবার ও সমাজের উচিত সব ধরনের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এ ধরনের নবজাতক ও মাকে যত্ন করে সারিয়ে তোলা এবং বড়ো করা। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এসব শিশুর জন্য যথাযথ শিক্ষার ব্যবস্থা করা এবং যাতে শিশুরা শিক্ষার আলো পায়, সুন্দর মন নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে। সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যমের উচিত এ ধরনের অপরাধের খুঁটিনাটি বের করে বস্তুনিষ্ঠ খবর প্রচার করা। সংবাদপত্রের এ ধরনের খবর অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে প্রভূত সাহায্য করে। যারা ধর্ষণ করে, ধর্ষিতার যন্ত্রণা তারা কখনোই উপলব্ধি করতে পারে না। নিজের হীন লিপ্সা চরিতার্থ করাই তাদের একমাত্র কাজ। নারী জাতির মর্যাদা এরা বোঝে না, বুঝতে চায় না। এ ধরনের পুরুষদের আচরণ পশুর আচরণকেও হার মানায়। এরা সমাজকে কলুষিত করে চলেছে। এদের থামানোর সময় এসেছে। এখনই এদের না থামালে আমাদের এই সুন্দর দেশ নারীদের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
একজন ধর্ষিতার কোলে জন্ম নেওয়া নবজাতককে নিয়ে যে কোনো নারীর পক্ষে লালন-পালন করা, সমাজে টিকে থাকা এবং নবজাতককে মাতৃত্বের স্নেহ দেওয়া যে কত কষ্টের ও সাহসের ব্যাপার, তা লিখে বোঝনোর ভাষা আমার জানা নেই। তাই এ ধরনের ঘটনার পর সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে সহনশীলতা ও মানবতা নিয়ে আর সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের এগিয়ে আসতে হবে সমাজ ও রাষ্ট্রকে উদ্বুদ্ধ করতে, যাতে করে আর একটি নবজাতকও রাস্তায়, আর্বজনায় পতিত না হয়ে নিজ নিজ মাতৃকোলেই বড়ো হয়ে উঠতে পারে। বেঁচে থাকুক প্রতিটি নবজাতক, তা সে যেখানেই জন্মগ্রহণ করুক না কেন। বেঁচে থাকুক আমাদের মনুষ্যত্ব প্রতিটি মানুষের হূদয়ে।
n লেখক : লে. কর্নেল, সেনা সদর, কিউএমজি শাখা (এসটি পরিদপ্তর), ঢাকা সেনানিবাস
