মো. শহীদুল ইসলাম
মধ্যপ্রাচ্যে কে বেশি ক্ষমতাধর সৌদি আরব নাকি ইরান? উভয় রাষ্ট্রই তাদের নিজ নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। মধ্যপ্রাচ্যে অনেকদিন ধরে চলমান অস্থিরতার পেছনে এই দুটি দেশের আধিপত্য বিস্তারের যে প্রতিযোগিতা; সেটিই প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। মুসলিমদের প্রধান দুটি পবিত্র স্থান মক্কা ও মদিনা সৌদি আরবে অবস্থিত হওয়ায়, পুরো মুসলিম বিশ্বের কাছে সৌদি আরবের প্রতি একধরনের শ্রদ্ধা রয়েছে। উভয় দেশই মুসলিমপ্রধান দেশ হলেও তাদের মধ্য আদর্শিক পার্থক্য রয়েছে। ইরান শিয়া রাষ্ট্র আর সৌদি আরব সুন্নিপ্রধান রাষ্ট্র। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব হওয়ার আগ পর্যন্ত উভয় দেশই রাজতান্ত্রিক দেশ ছিল। ফলে এ সময়ের পূর্বপর্যন্ত তাদের মধ্যে শিয়া-সুন্নি পার্থক্য তেমন রাজনৈতিক রূপ নেয়নি এবং উভয় রাষ্ট্রই তখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ছিল।
ইমাম আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে যে ইসলামী বিপ্লব হয়, তখনকার শাসক রেজা শাহ পাহলবী যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট ছিল। ফলে বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত লাগে, আর এর পরপরই তেহরানে যু্ক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে হামলার ঘটনা ঘটে এবং এই ঘটনার ফলে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার সূচনা হয়। মধ্যপ্রাচ্য শিয়াদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর ইরানকে সৌদি আরব নিজেদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভাবতে থাকা—আর তখনই শুরু হয় এই দেশ দুটির মধ্য দ্বন্দ্ব।
সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয় ২০১৬ সালে, যখন সৌদি আরবের একজন শীর্ষ শিয়া নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয় দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। এর আগে তাদের দ্বন্দ্ব্ব প্রক্সি যুদ্ধে রূপ নেয়, যখন সিরিয়াতে ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সুন্নিপ্রধান সিরিয়াতে শিয়া শাসক বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সহায়তা শুরু করে সৌদি আরব, আর বাশার আল আসাদকে ক্ষমতায় রাখতে তাকে সর্বাত্মক সহায়তা শুরু করে ইরান। ফলাফল—বাশার আল আসাদ এখনো ক্ষমতায়, আইএস-এর উত্থান, সিরিয়া মৃত্যুকূপে পরিণত হয়, প্রায় ৫ লাখের অধিক লোকের মৃত্যু হয়। সিরিয়ার মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই বাস্তুহারা হয়। সৌদি আরব ইরানের মধ্যে আরেকটা প্রক্সিযুদ্ধ শুরু হয় ইয়েমেনে। ২০১১ সালে আলি আব্দুল্লাহ সালেহ যখন তার ডেপুটি আব্দু রাব্বু মানসুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে, এর কিছুদিন পরই যাইদি শিয়াদের নেতৃত্বে হুদি বিদ্রোহীরা সানা দখল করে নিলে প্রেসিডেন্ট আব্দু রাব্বু মানসুর হাদি পালিয়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নেন। তার ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য সৌদি আরবের নেতৃত্বে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ জোট বেঁধে ইয়ামেনে হুদিদের হটানোর চেষ্টা শুরু করে। আর অন্যদিকে ইরান হুদিদের সব রকমের সহযোগিতা চলমান রেখেছে। সেই যুদ্ধ এখনো চলমান। ফলাফল স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে ইয়েমেনে। জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যুদ্ধ বন্ধ না করলে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়বে ইয়েমেন। সেখানে হাজার হাজার মানুষ খাদ্য, চিকিত্সার অভাবে মারা যাচ্ছে। শুধু যুদ্ধে প্রায় ১০ হাজারের ওপরের মানুষ মারা গেছে। ইয়েমেন শিশুদের কঙ্কালসার দেহ দেখলে যে কোনো মানব হূদয়ই কেঁপে উঠবে। কিন্তু এই শিশুদের কান্নার আওয়াজ কী সৌদি রাজপ্রাসাদ কিংবা ইরানের নেতৃবৃন্দের কানে পৌঁছায় না!!
সর্বশেষ ১৪ সেপ্টেম্বর হুদি বিদ্রোহীদের দ্বারা সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। সৌদি আরব ইরানকে সরাসরি এর জন্য দায়ী করে আসলেও হুদিরা এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে উভয় দেশেই আক্রমণাত্মক বাক্য বিনিময় অব্যাহত রেখেছে।
লোহিত সাগর অতিক্রম করার সময় ইরানের তেল ট্যাংকার ‘সাবিতি’ লক্ষ্য করে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছে গত শুক্রবার। এর জন্য ইরান প্রথমে সৌদি আরবকে দায়ী করলেও পরে অবশ্য প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বিবদমান দুটি পক্ষের মধ্যে এমন পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্য সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নতুন করে ৩ হাজার সৈন্য পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। যা পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করে ফেলেছে। ইরান এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে, সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যে কোনো সামরিক আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য তারা প্রস্তুত।
এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে দেশ দুটির মধ্যে উত্তেজনা কমাতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে দুটি দেশের মধ্যে আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। শুধু সাম্প্রতিক হামলার বিষয়টি নিয়ে নয়, আলোচনা হতে হবে সিরিয়ার সংকট, ইয়েমেন সংকট নিয়েও। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি ফেরাতে উভয় দেশকেই সর্বোচ্চ ছাড়ের মানসিকতা নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে। এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়নের জন্য তাদেরকে অবশ্যই ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। ঐক্যবদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিশাল শক্তি, বিভক্ত মধ্যপ্রাচ্য যা নয়। উভয় দেশকে অবশ্যই অস্ত্র প্রতিযোগিতা থেকে বের হয়ে নিজেদের জনগণের জীবনমান উন্নয়নে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা, প্রযুক্তির দিকে নজর দেওয়া উচিত।
n শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
