পর্বতারোহীরা বরাবরই দুঃসাহসী হয়ে থাকেন। ভয়কে জয় করাই তাদের চ্যালেঞ্জ। দুঃসাহস থেকেই পর্বতারোহীরা পর্বতারোহণের সাহস ও শক্তি পেয়ে থাকেন। পর্বতে ওঠার জন্য তাদের পছন্দের তালিকায় থাকে এমন সব পর্বতমালা, যেগুলো রীতিমতো ভয়ঙ্কর এবং শৃঙ্গে আরোহণ করা কঠিন। যখনই পর্বতারোহীরা উপকূলীয় শৃঙ্গ ও পর্বতগুলোর বরফের গা বেয়ে ওপরে উঠতে যান তখনই তাদেরকে নানা ধরনের অপ্রত্যাশিত বিপদের মুখোমুখি হতে হয়। বেয়ে ওঠার সময় যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। কিন্তু পর্বতারোহীরাও নাছোরবান্দা। তারা সকল প্রতিকূলতা ও ভয়কে জয় করে পর্বতের চূড়ায় উঠে যান। বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এমন কয়েকটি পর্বত নিয়ে লিখেছেন জুবায়ের আহম্মেদ ও
তাফসিরুল ইসলাম
অন্নপূর্ণা:উচ্চতার দিক দিয়ে পৃথিবীতে অন্নপূর্ণা পর্বতের অবস্থান দশম স্থানে। এর উচ্চতা ৮,০৯১ মিটার। এই পর্বতে প্রথম আরোহণ করা হয় ৩ জুন, ১৯৫০ সালে। বরফ বেয়ে ওঠাই এই পর্বত আরোহণের সহজ পথ। অন্নপূর্ণা মধ্য নেপালে অবস্থিত। সর্বপ্রথম ‘মরিস হার্জগ’ এবং ‘লুইস লাচেনাল’ ১৯৫০ সালে এর সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করেন। ১৯৫০ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ১৩০ জনেরও বেশি পর্বতারোহী এটি আরোহণ করেছেন এবং ৫৩ জন উঠতে গিয়ে মারা গেছেন। এই সংখ্যাই বুঝিয়ে দেয় অন্নপূর্ণা কতটা ভয়াল। তবে এর সবচেয়ে ভয়াবহ জায়গা হচ্ছে ৮,০০০ মিটার উঁচুতে।
কে টু:এটি পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। এই পর্বতের উচ্চতা ৮,৬১১ মিটার। এটি হিমালয় পর্বতমালার কারাকোরাম পর্বত রেঞ্জের অন্তর্গত পর্বতশৃঙ্গটি পাকিস্তানের গিলগিত-বালতিস্তান ও চীনের জিংজিয়ানের তাক্সকোরগান সীমান্তে অবস্থিত। এই পর্বতে প্রথম আরোহণ করা হয় ৩১ জুলাই, ১৯৫৪ সালে। পর্বতারোহীদের জন্য এটাতে আরোহণ করা কৌশলগত দিক দিয়ে সবচেয়ে কঠিন বলে মনে করা হয়। এই পর্বতশৃঙ্গে আরোহণ করা অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় এটি ‘জংলি পর্বত’ নামেও পরিচিত। এতে ওঠার অনেক সহজ পথ থাকলেও সবচেয়ে সহজ রুটেও অনেক চড়াই উত্রাই পার হতে হয়। ভারি তুষারপাত, অধিক পরিমাণ শিলা ও বেশকিছু বরফ স্তম্ভ অতিক্রম করে যেতে হয়। যার ফলে কোনো ধরনের পূর্বাভাস ছাড়াই এই পর্বত ধসে পড়তে পারে। এর চূড়ায় আরোহণকারী প্রতি ৪ জনের মধ্যে একজন মৃত্যুবরণ করেছেন। একারণেই এটি অন্যতম ভয়ঙ্কর পর্বত হিসেবে পরিচিত।
নাঙ্গা পর্বত: নাঙ্গা পর্বত পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গগুলোর মধ্যে নবম স্থানে অবস্থান করছে। এটি পাকিস্তানের উচ্চতম পর্বত। ৩ জুলাই, ১৯৫৩ সালে সর্বপ্রথম একদল আস্ট্রিয়ান ও জার্মান অভিযাত্রী এর শীর্ষে আরোহণ করেন। পর্বতারোহীদের নিকট নাঙ্গা পর্বতে আরোহণ অত্যন্ত কঠিন। ‘কে টু’ পর্বতের মতো এটিও ‘টেকনিক্যালি ডিফিকাল্ট’ হিসেবে পরিচিত। এই পর্বতের শিখরে পৌঁছানোর প্রথম পদক্ষেপেই যে কাউকেই অতিক্রম করতে হবে খুবই সরুপথ। এটি অতিক্রম করতে ১৫,০০০ ফুট ওপরে আরোহণ করতে হয়। এই সকল ভয়ানক বৈশিষ্ট্যের কারণে এই পর্বত খুবই ভয়ঙ্কর। এই পর্বতে আরোহণ করতে গিয়ে অনেক পর্বতারোহী মৃত্যুবরণ করেছেন। এ কারণে এটি পরিচিতি পেয়েছে ‘দ্য ম্যান ইটার’ বা ‘মানব খাদক’ পর্বত হিসেবে। অনেকে নাঙ্গা পর্বতকে ‘কিলার মাউন্টেইন’ও বলে থাকেন।
কাঞ্চনজঙ্ঘা: কাঞ্চনজঙ্ঘা পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ। এর উচ্চতা ৮,৫৮৬ মিটার। এই পর্বতটি ভারতের সিকিম রাজ্যের সঙ্গে নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে অবস্থিত। কাঞ্চনজঙ্ঘা শব্দটি শুনে তত্সম শব্দ মনে হলেও অনেকের ধারণা এটি স্থানীয় শব্দ ‘কাং চেং জেং গা’, যার অর্থ ‘তুষারের পাঁচ ধনদৌলত’। যদি পৃথিবীর অন্যান্য পর্বতগুলোর মধ্যে পর্বতারোহীদের মৃত্যুর হার হিসেব করা হয়, তবে দেখা যাবে সবগুলোতেই এই হার উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। একমাত্র ব্যতিক্রম হলো কাঞ্চনজঙ্ঘা। সাম্প্রতিককালের এক হিসেব মতে, এই পর্বতে মৃত্যুর হার বেড়েছে ২২ শতাংশ। প্রাকৃতিক দূর্যোগসহ বেশকিছু কারণে পর্বতারোহীদের জন্য এই পর্বতে আরোহণ করা বেশ কঠিন। তাই পৃথিবীর অন্যান্য ভয়ঙ্কর পর্বতগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
দ্য ইগার:পর্বতারোহীদের এই পর্বতে আরোহণের সময় প্রচণ্ড ঝুঁকি ও দূর্যোগ পোহাতে হয়। তাই এই পর্বতের ডাক নাম ‘মার্ডার ওয়াল’। একে ‘পর্বোতারোহীদের খুনি’ বলা হয়ে থাকে। প্রথম ‘দ্য ইগার’ পর্বতে আরোহণ করা হয়েছিল ১৯৩৮ সালে। উত্তর দিক দিয়ে এ পর্বত বেয়ে উঠতে গেলে নানা বিপদের পড়তে হয়। পাশাপাশি পাথর ঝড়েরও মুখোমুখি হতে হয়। তাই এই পর্বত আরোহণের সময় উত্তর দিক দিয়ে না ওঠাই উত্তম।
মাউন্ট এভারেস্ট:মাউন্ট এভারেস্টের নাম আমরা সবাই জানি। এটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। এর উচ্চতা ৮,৮৪৮ মিটার। এটি নেপালে অবস্থিত। মাউন্ট এভারেস্টে ২৯ মে, ১৯৫৩ সালে প্রথম আরোহণ করেন এডমন্ড ও তেনজিং নোরগে। ব্রিটিশ পর্বতারোহীরা সর্বপ্রথম এই পর্বতশৃঙ্গ আরোহণের চেষ্টা শুরু করেন। নেপালে এ সময় বিদেশিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকায় ব্রিটিশরা তিব্বতের দিক থেকে এই পর্বতের উত্তর শৈলশীলা ধরে বেশ কয়েকবার আরোহণের চেষ্টা করেন। ১৯২২ সালে তারা এই পথে ৮,৩২০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত ওঠে মানব ইতিহাসে নতুন কীর্তি স্থাপন করেন। প্রায় সব পর্বতারোহীরাই মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন দেখেন। এ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি পর্বতারোহী মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছেন। সর্বপ্রথম বাংলাদেশি হিসেবে মূসা ইব্রাহিম এভারেস্টের চূড়ায় ওঠেন। কখনও কখনও এই মাউন্ট এভারেস্ট পর্বত ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। এতে প্রচুর পর্বতারোহী প্রাণ হারিয়েছেন।
ড্যানলি: ড্যানলি উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ পর্বত। এটি ‘ম্যাগাটন ড্যানলি’ নামেও পরিচিত। এই পর্বতের উচ্চতা ২,৩২০ ফুট। যে সকল পর্বতারোহীরা ড্যানলি পর্বত চড়ে এসেছেন তাদের সকলকেই একটি বিষয় বলেছেন, তা হলো যখন তখন আবহাওয়ার পরিবর্তন ও হঠাত্ তাপমাত্রার তারতম্য তাদের কাছে ড্যানলি পর্বতকে ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। এই পর্বতের সফল পর্বতারোহীর সংখ্যা শতকরা ৫০ ভাগ। পর্বতারোহীরা এই পর্বতে তাদের স্বপ্নের চূড়াতে উঠতে গিয়ে এ পর্যন্ত ১০০ জনেরও বেশি মারা গেছেন।
বাইন্থা ব্রাক:বাইন্থা ব্রাক একটি বিখ্যাত পর্বত। এটি পৃথিবীর অন্যতম একটি দুর্গম, যা অনেকেই রাক্ষস নামে অভিহিত করেছেন। এই পর্বতটি সর্বপ্রথম ১৯৭১ সালে আবিষ্কৃত হয়। কিন্তু সবচেয়ে মজাদার ব্যাপার হলো ২০০১ সাল অবধি কেউই এই পর্বতটি জয় করতে পারেননি। যারাই এই পর্বতে আরোহণের চেষ্টা করেছেন তারা সবাই ব্যর্থ হয়েছেন। ডগ স্কট নামে একজন পর্বতারোহী এই পর্বতে আরোহণ করতে গিয়ে তার দুটি পা-ই হারিয়েছেন। এর থেকেই বোঝা যায় পর্বতটি কতটা ভয়াল। প্রায় ২০টিরও অধিক ব্যর্থ চেষ্টা এই মহাকাব্যময় পর্বতটিকে সবার কাছে ভয়ঙ্কর হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে।
