অভিশংসন তদন্ত নতুন চাপে ট্রাম্প

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০১৯, ২২:০৫

তালেব রানা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিশংসনের জন্য তদন্ত চলছে। তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য বিদেশি শক্তির সাহায্য নেওয়ার অভিযোগে এই তদন্ত করছে ডেমোক্র্যাটরা। এরই মধ্যে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের কমিটি বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সাক্ষ্য নিয়েছে। আগামীতে আরো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সাক্ষীকে ডাকা হবে। এই অভিযোগ প্রমাণ হলে ট্রাম্প পদচ্যুত হতে পারেন। 

গত ২৫ জুলাই ইউক্রেনের নতুন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনে আলাপ করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার ঘনিষ্ঠ এক ‘হুইসেলব্লোয়ার’ এই ফোনালাপ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেন। ঐ অভিযোগে বলা হয়, ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট   নির্বাচনে অন্য দেশের হস্তক্ষেপের জন্য নিজের কার্যালয়ের ক্ষমতাকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যবহার করেছেন। আগামী নির্বাচনে তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন এমন একজনের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য বিদেশি রাষ্ট্রকে চাপ দিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের এই কার্যকলাপ আইনের লঙ্ঘন এবং অপব্যবহার।

হোয়াইট হাউজের প্রকাশ করা দুই প্রেসিডেন্টের কথোপকথনের মেমোতে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার ছেলে হান্টারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে ইউক্রেনকে চাপ দিয়েছেন। বাইডেনের ছেলে হান্টার ইউক্রেনের একটি জ্বালানি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। এই ফোনালাপের কয়েকদিন আগেই ইউক্রেনকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দেয় ট্রাম্প প্রশাসন।

ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ—এই সহায়তা বন্ধের মাধ্যমে ইউক্রেনকে চাপ দিয়েছেন ট্রাম্প। যদিও ট্রাম্প এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।  তবে তিনি জনসমক্ষে ইউক্রেন ও চীনকে বাইডেনের বিরুদ্ধে তদন্তের আহ্বান জানিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছেন। এসব বিতর্কের মাঝেই হোয়াইট               হাউজের ভারপ্রাপ্ত চিফ অব স্টাফ মিক মুলভানির এক বক্তব্য নতুন করে চাপের মুখে ফেলেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মুলভানি বলেন, ডেমোক্র্যাটদের ব্যাপারে তদন্তের জন্য ইউক্রেনকে চাপ দিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ৪০ কোটি ডলারের সামরিক  সহায়তা বন্ধ রেখেছেন। তার ঐ বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, পররাষ্ট্র নীতিতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে। এরপরই ট্রাম্পের মিত্ররা ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’-এ নেমেছেন। ট্রাম্পের আরেকজন আইনজীবী জে সেকুলো টাইম ম্যাগাজিনকে বলেছেন, মুলভানির ব্রিফিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের লিগ্যাল কাউন্সিল যুক্ত নেই। মার্কিন বিচার বিভাগও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। এর কয়েক ঘণ্টা পরই নিজের অবস্থান বদলে মুলভানি এসব কথা অস্বীকার করেন।

ট্রাম্পকে আরেক চাপে ফেলেছেন জ্বালানি মন্ত্রী রিক পেরি। গত বুধবার তিনি পদত্যাগ করেছেন। তিনি বলেছেন, ইউক্রেন বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশেই তার ব্যক্তিগত আইনজীবী রুডি গুলিয়ানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ২০১৬ সালে ডেমোক্র্যাটদের কর্মকাণ্ডের তদন্ত।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের মার্কিন রাষ্ট্রদূত গর্ডন সোন্ডল্যান্ড হাউজের তদন্তকারীদের বলেছেন, ইউক্রেনে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি পরিচালনার দায়িত্ব আইনজীবী গুলিয়ানির ওপর অর্পণ করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। রাজনৈতিক বিষয়ে তদন্তের জন্য সামরিক সহায়তার ব্যবহার ‘সঠিক’ নয়। ইউক্রেনে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন করা উচিত। প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত আইনজীবীর নয়।

আমেরিকান ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক জর্দান টামা বলেন, সন্ত্রাস দমন বা পরমাণু অস্ত্র নিরোধে মার্কিন সামরিক সহায়তা ঠিক আছে। কিন্তু প্রেসিডেন্টের পুনর্নির্বাচনের প্রচারণার জন্য বিরোধীদের বিষয়ে তদন্তে সামরিক সহায়তার ব্যবহার যথাযথ নয়।

হঠাত্ করেই এসব ঘটনা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এসব ঘটনা কংগ্রেসে তার অভিশংসন প্রক্রিয়াকে কতটা প্রভাবিত করবে সেটা বলা কঠিন। প্রতিনিধি পরিষদে প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করা হলেও পদ থেকে অপসারণে অবশ্যই ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করে সিনেটরদের ভোট দিতে হবে। এই সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানের হাতে। কিন্তু গত কয়েকদিনের ঘটনা রিপাবলিকানদের জন্যও নতুন করে চাপ তৈরি করেছে! 

এরই মধ্যে রিপাবলিকানরা সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তাদের দুশ্চিন্তা হলো, রিপাবলিকানদের ক্ষোভ প্রেসিডেন্টের ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়ায় তাদের সমর্থনকে দুর্বল করতে পারে। একইসঙ্গে বেরিয়ে আসা তথ্যও সিনেটে প্রেসিডেন্টের প্রতি সমর্থনকে হুমকিতে ফেলতে পারে। রিপাবলিকান দলের অন্যতম ডোনার ড্যান এবারহার্ট বলেন, কিছু ক্ষেত্রে রিপাবলিকানরা তথ্য পুনরায় যাচাই করবে। সিদ্ধান্ত বদলানোর বিষয়টিও বিবেচনা করবে।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্ত এখনো প্রাথমিক ধাপে রয়েছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনই নিজেকে এক ক্রমবর্ধমান অনিশ্চিত জায়গায় দেখতে পাচ্ছেন।