অনিশ্চয়তায় ব্রেক্সিট

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০১৯, ২২:০৬

শিফারুল শেখ

 

বৃহস্পতিবার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দু-দুটি সাফল্যের স্বাদ পান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। প্রথমে ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ব্রেক্সিট নিয়ে বোঝাপড়া চূড়ান্ত হয়। তারপর ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত নেতারা একযোগে সেই চুক্তির প্রতি সমর্থন জানান। দুই পক্ষের ভবিষ্যত্ সম্পর্কের বিষয়ে রাজনৈতিক ঘোষণাপত্রও অনুমোদন করেন তারা। জনসন সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে অংশ না নিয়ে দেশে ফিরে পার্লামেন্টে তার নতুন ব্রেক্সিট চুক্তির সমর্থন আদায়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে তিনি ব্যর্থই হন। উল্টো পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট পেছানোর ব্যাপারে একটি প্রস্তাব পাশ হয়। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী তিনি ইইউর কাছে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া পেছানোর অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। কিন্তু সেখানেও তিনি ঠিক সময়ে ব্রেক্সিট কার্যকরের ব্যাপারে মতপ্রকাশ করেছেন। ফলে ব্রেক্সিটের আকাশে কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

ফের বাধার মুখে জনসন: বাইরে উত্তাল জনতা। আর ভেতরে ৩৭ বছর পরে নজিরবিহীনভাবে চলছে অধিবেশন। শনিবার এটাই ছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ছবি। ইইউর সবুজ সংকেত পেয়ে যাওয়ার পরে শনিবার পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট চুক্তি পেশ করার কথা ছিল প্রধানমন্ত্রী বরিসের। ঠিক ছিল, সেই চুক্তি নিয়ে ভোট দেবেন ব্রিটিশ এমপিরা। চুক্তি পাশ হয়ে গেলে ৩১ অক্টোবর ইইউ ছাড়তে ব্রিটেনের আর কোনো বাধা থাকত না। কিন্তু বরিসের সেই চুক্তি পাশের আগেই দুপুরে তার নিজের দল কনজারভেটিভ পার্টির এক এমপি অলিভার লেটউইন ব্রেক্সিট পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব পেশ করেন। তার যুক্তি ছিল, ৩১ অক্টোবর যেন কোনোভাবেই চুক্তিহীন ব্রেক্সিট না হয় তা সুনিশ্চিত করতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বরিসের চুক্তি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা করা দরকার। যা মাত্র ১১ দিনে সম্ভব নাও হতে পারে। বরিস বহুবার বলেছেন, ৩১ অক্টোবর যে কোনো মূল্যে ইইউ ছাড়বে ব্রিটেন। চুক্তি হোক বা না-ই হোক। বরিসের সেই রাস্তা আটকাতেই ব্রেক্সিট ফের স্থগিত করার প্রস্তাব পেশ করেন লেটউইন। মাত্র ১৬ ভোটের ব্যবধানে সেই প্রস্তাব পাশও হয়ে যায়। লেটউইনের পক্ষে পড়ে ৩২২ ভোট। আর বিপক্ষে ৩০৬ ভোট। কনজারভেটিভদের ‘বন্ধু দল’ ও তাদের জোটসঙ্গী নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ডিইউপির এমপিরাও ব্রেক্সিট পেছানোর পক্ষে ভোট দেন।

নতুন চুক্তি নিয়েও সংশয়: নতুন চুক্তি অনুযায়ী আইরিশ সীমান্তে ‘ব্যাকস্টপ’ ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ পড়লেও তার বদলে অত্যন্ত জটিল এক ব্যবস্থা চালু হবে। বরিস জনসনের দাবি মেনে উত্তর আয়ারল্যান্ড প্রদেশকে যুক্তরাজ্যের শুল্ক কাঠামোয় রাখা হলেও সেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু নিয়মকানুন বজায় থাকবে। বিশেষ করে সেখানে পণ্যের আগমণ নিয়ন্ত্রণ করা হবে। যে পণ্য শেষ পর্যন্ত ইইউতে প্রবেশ করবে, তার ওপর শুল্ক বসানো হবে। ভ্যাট সংক্রান্ত জটিলতাও দূর করা হয়েছে। উত্তর আয়ারল্যান্ডের আঞ্চলিক পার্লামেন্ট প্রতি চার বছর অন্তর এই নিয়ম চালু রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। স্বাধীন রাষ্ট্র আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটেনের অংশ নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সীমান্ত নিয়ে যে প্রস্তাব রাখা হয়েছে তা নিয়ে ডিইউপির প্রবল আপত্তি।

এই চুক্তির আরেকটি দিকও ব্রিটেনের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত্ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে। পূর্বসূরি থেরেসা মে’র প্রথম ব্রেক্সিট চুক্তির খসড়ায় ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে নিবিড় সম্পর্কের উল্লেখ ছিল। জনসনের চুক্তি কার্যকর হলে দুই পক্ষের মধ্যে বাণিজ্যের পথে অনেক বেশি বাধা থাকবে। ফলে ব্রিটিশ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন।

ক্ষুব্ধ বরিসের গোলমেলে চিঠি: লেটউইনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বিরোধী দলনেতা লেবার পার্টির জেরেমি করবিনও বলেছিলেন, আজ একটি ঐতিহাসিক দিন। তবে চটে যান প্রধানমন্ত্রী। রাগত স্বরে বলেন, এভাবে বারবার ব্রেক্সিট পিছিয়ে দেওয়ায় আখেরে ক্ষতি ব্রিটেনেরই। আমি ব্যক্তিগতভাবে ইইউ কর্তাদের বলব, তারা  যেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ব্রেক্সিট স্থগিত করার প্রস্তাব মেনে না নেন। তিনি তাই-ই করেন। ইইউ থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে বিলম্বিত করার অনুরোধ জানিয়ে স্বাক্ষরবিহীন একটি চিঠি পাঠিয়েছেন বরিস। পাশাপাশি নিজের স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ব্রেক্সিট পিছিয়ে দেওয়া হবে একটি ভুল সিদ্ধান্ত। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্কের কাছে জনসন মোট তিনটি চিঠি পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে একটি ‘বেন অ্যাক্ট’ নামের সেই আইনের ফটোকপি যা জনসনকে চিঠি লিখতে বাধ্য করেছে; দ্বিতীয়টি, ব্রিটিশ সরকার শুধু এ আইন অনুযায়ী কাজ করছে এমনটি জানিয়ে ইইউতে নিযুক্ত ব্রিটিশ দূতের পাঠানো একটি নোট এবং তৃতীয় আরেকটি চিঠি যেটিতে জনসন জানিয়েছেন তিনি সময় আর বাড়াতে চান না।

তৃতীয় চিঠিটি টুইটারে প্রকাশ করেছে ফিনান্সিয়াল টাইমস। ওই চিঠিতে জনসন বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই আমি বলে আসছি এবং আজ পার্লামেন্টকেও বলেছি, আমার দৃষ্টিভঙ্গি ও সরকারের অবস্থান হচ্ছে সময় আরো বাড়ালে যুক্তরাজ্য ও আমাদের ইইউ অংশীদারদের স্বার্থ এবং আমাদের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ৩১ অক্টোবরের আগেই ব্রিটিশ পার্লামেন্টের মাধ্যমে ব্রেক্সিট সংক্রান্ত আইনগুলো পুরোপুরি প্রস্তুত করা যাবে বলে চিঠিতে নিজের আস্থার কথাও জানিয়েছেন বরিস। তবে ব্রেক্সিট বিলম্বে আগ্রহ নেই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্যের পর অনিশ্চয়তা আরো বেড়েছে। পেছাতে ইইউভুক্ত ২৭ দেশের সমর্থন লাগবে। কেউ বলছেন, ইইউ সমর্থন জানাবে এবং কেউ বলছেন, সমর্থন পাবে না। ফলে বরিসেরই জয় হবে। আর হারলে তাকে বিদায় নিতে হতে পারে।