ভোলায় পুলিশ-জনতা সংঘর্ষ গুলি, নিহত ৪

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০১৯, ০১:৩০

ফেসবুক মেসেঞ্জারে ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ তুলে ভোলার বোরহানউদ্দিনে ‘সাধারণ তৌহীদি জনতার’ বিক্ষোভ সমাবেশে পুলিশের সঙ্গে এলাকাবাসীর সংঘর্ষে চারজন নিহত ও শতাধিক লোক আহত হয়েছে। গতকাল রবিবার বেলা ১১টার দিকে এ সংঘর্ষে উপজেলার ঈদগাহ মাঠ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় পুলিশ শটগানের গুলি ছোড়ে বলে জানা গেছে। এতে আহত অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে বোরহানউদ্দিন হাসপাতালে, ৪০ জনকে ভোলা সদর হাসপাতালে এবং গুলিবিদ্ধ ৩২ জনকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া বুকে গুলিবিদ্ধ কনস্টেবল আরিফকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকার সিএমএইচে নেওয়া হয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।

নিহতরা হলেন :বোরহানউদ্দিন উপজেলার মহিউদ্দিন পাটওয়ারীর মাদ্রাসায় পড়ুয়া ছেলে মাহবুব (১৪), কাঁচিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের দেলওয়ার হোসেনের কলেজে পড়ুয়া ছেলে শাহিন (২৩), বোরহানউদ্দিন পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাহফুজ (৪৫) এবং মনপুরা হাজিরহাট এলাকার বাসিন্দা মিজান (৪০)।

ভোলার সিভিল সার্জন ডা. রথীন্দ্রনাথ রায় ও বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের               আবাসিক চিকিত্সক ডা. মো. শাহিন সংঘর্ষে চার জন মারা যাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ডা. শাহিন জানান, মাহবুব ও শাহিনের শরীরে বুলেট বিদ্ধ হওয়ার চিহ্ন রয়েছে। অন্যদের মৃত্যুর কারণ ময়নাতদন্তের পর জানা যাবে। জেলা প্রশাসক মাসুদ আলম সিদ্দিক জানিয়েছেন, এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ঐ এলাকায় বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

যেভাবে সংঘর্ষ :পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মেসেঞ্জারে সংখ্যালঘু এক ব্যক্তির আইডি থেকে ইসলাম ধর্ম ও নবী (স)কে কটূক্তি করে কয়েকজনকে কুরুচিপূর্ণ মেসেজ পাঠানো হয়। পরে সেটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ মুসল্লিরা গতকাল সকালে ঐ মেসেজ প্রদানকারীর শাস্তির দাবিতে বোরহানউদ্দিন ঈদগাহ মাঠে ‘সাধারণ তৌহীদি জনতার’ ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে। তবে এ বিক্ষোভ মিছিল না করার জন্য বোরহানউদ্দিন ঈদগাহ মসজিদের ইমাম মাওলানা জালাল উদ্দিন ও বাজার মসজিদের ইমাম মাওলানা মিজানকে অনুরোধ জানায় পুলিশ। তাদের অনুরোধে এ দুই ইমাম সকাল ১০টার দিকেই দোয়া-মোনাজাতের মাধ্যমে বিক্ষোভ মিছিলটি সমাপ্ত করেন। কিন্তু ততক্ষণে বোরহানউদ্দিনের বিভিন্ন গ্রাম থেকে হাজার হাজার লোক এসে ঈদগাহে জড়ো হয়। একপর্যায়ে তারা ঐ দুই ইমাম এবং সেখানে থাকা পুলিশের ওপর চড়াও হয়। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে মসজিদের ইমামের রুমে আশ্রয় নেয়। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশ নিজেদের বাঁচানোর জন্য উত্তেজিত মুসল্লিদের ওপর ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এতে মুসল্লিরা আরো উত্তেজিত হয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ চালায়। সকাল ১০টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে জনতার সংঘর্ষ হয়।

এসপি যা বললেন :ভোলার পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়ছার বলেন, ‘বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামের অভিযুক্ত ওই যুবকের ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়েছে। সে আমাদের হেফাজতে রয়েছে। আমরা হ্যাকের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আটক করেছি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এ নিয়ে গত রাতে স্থানীয় আলেমদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছে, আজকের প্রোগ্রাম হবে না। কিন্তু সকাল থেকে আমাদের কাছে খবর আসে যে সেখানে মাইকিং হচ্ছে এবং স্টেজ বানানো হচ্ছে। সেখানে গিয়ে আমরা মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলি। আমি নিজে সেখানে বক্তব্য দিয়েছি। তারা সবাই আমার বক্তব্য শুনেছে। যখন আমি স্টেজ থেকে নেমে আসি, তখন একদল উত্তেজিত জনতা আমাদের ওপর হামলা চালায়। আমরা আত্মরক্ষার্থে একটি রুমে গিয়ে আশ্রয় নেই। যখন তারা আমাদের রুমের জানালা ভেঙে ফেলছে, তখন আমরা প্রথমে শটগানের ফাঁকা গুলি ছুড়ি। এতে কাজ না হওয়ায় ওপরের দিকে গুলি চালাই। এতে আমার জানামতে একজন পুলিশ সদস্য বুকে গুলি লেগে গুরুতর আহত হন। আমরা আহত অবস্থায় যাদের হাসপাতালে পাঠিয়েছি তাদের মধ্যে তিন জন নিহত হয়েছে। তবে নিহত আরো থাকতে পারে, সেটা আমাদের কাছে তথ্য নেই।’

অভিযুক্তের ফেসবুক আইডি হ্যাক করা হয় :অভিযোগ উঠেছে, শুক্রবার বিকেলে বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামের ফেসবুক আইডি থেকে তার ফ্রেন্ড লিস্টের বেশ কয়েক জনের কাছে ইসলাম ধর্ম ও নবী নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ভাষার মেসেজ আসে। বিপ্লব বোরহানউদ্দিন উপজেলার কাঁচিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের চন্দ্র মোহন বৈদ্দের ছেলে। পরে কয়েকটি আইডি থেকে মেসেজগুলোর স্ক্রিনশট নিয়ে ফেসবুকে প্রতিবাদ জানালে বিষয়টি সবার নজরে আসে। এ অবস্থায় সন্ধ্যার পর বিপ্লব বোরহানউদ্দিন থানায় আইডি হ্যাক হয়েছে বলে জিডি করতে এলে পুলিশ বিষয়টি তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে নিজেদের হেফাজতে রাখে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ এক হ্যাকারকে আটক করে। গতকাল রাতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বিপ্লব থানা হেফাজতে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, ফেসবুকে ধর্ম অবমাননা করার গুজব ছড়িয়ে এর আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজার জেলার রামুতে হামলা চালিয়ে লুটপাটসহ ১২টি বৌদ্ধ মন্দির ও ৩০টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে একদল দুর্বৃত্ত। এছাড়া ২০১৬ সালে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার নাসিরনগরে রসরাজ নামের এক মত্স্যজীবীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এনে লোকজনকে উসকানি দিয়ে খেপিয়ে তুলে বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা চালানো হয়।

এদিকে বোরহানউদ্দিনে জনতা-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনায় আজ সোমবার বেলা ১১টায় ভোলা সরকারি স্কুল মাঠে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেছে সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্য পরিষদ। গতকাল বিকালে ভোলা প্রেসক্লাবের সামনে সংগঠনের নেতারা এ ঘোষণার পাশাপাশি ভোলার পুলিশ সুপার ও বোরহানউদ্দিনের ওসিকে প্রত্যাহারসহ ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন।

বরিশাল হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ ৩২ জন :বরিশাল অফিস জানায়, শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গতকাল সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ভোলার ঘটনায় গুলিবিদ্ধ ৩২ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন :বোরহানউদ্দিনের মিজানুর রহমান (৩০), ইউসুফ (৬০), নান্টু (৪০), মাকসুদুর রহমান (১৮), তানভীর (৩০), ওয়া?লিউল্লাহ (২৪), সিদ্দিক (২৮), আবু তাহের (৩০), শামীম (১৮), সোহরাব (৩০), আল আ?মিন (১৮), জামাল (২৫), আবুল কালাম (৩৮), ক?বির (৩৫), আলাউ?দ্দিন (৪২), সোহেল (২৬), হান্নান (৪৫), রিয়াজ (২৯), ইমাম হাসান (২৬), নুরুল ইসলাম (৩৫), র?কিব (১২), মনির (১৭), রা?কিব (১৫), হা?সিব (১৪) তাজুল ইসলাম (৫৫), মুন্না (১৩) ও সুজন (৩৫)। এরা সবাই গু?লিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন বলে জা?নিয়েছেন শেবা?চিম হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দা?য়িত্বরত চিকিত্সক আবুল হাসানাত রাসেল।

বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ :ভোলায় পুলিশের সঙ্গে জনতার সংঘর্ষে হতাহতের প্রতিবাদে গতকাল বিকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে ইসলামী ছাত্র খেলাফত বাংলাদেশ। সমাবেশে অনতিবিলম্বে দোষীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বক্তারা।   এছাড়া বরিশালে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে একই সময় অশ্বিনী কুমার টাউন হলের সামনে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল হয়। বক্তারা ভোলায় তৌহিদী জনতার ওপর পুলিশের হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, পুলিশ বিনা উসকানিতে গুলি চালিয়েছে।

চট্টগ্রাম অফিস জানায়, ভোলার বোরহান উদ্দিনে পুলিশের গুলিতে চার জন নিহত হওয়ার প্রতিবাদে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবিতে হাটহাজারীতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে হেফাজতে ইসলাম। গতকাল আসর নামাজের পর কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে আসেন। এ সময় তারা টায়ার জ্বালিয়ে চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি আঞ্চলিক মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। বিক্ষোভকারীরা হাটহাজারী থানা ভবন লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন এবং কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করেন। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিহতদের স্মরণে গায়েবানা জানাজায় অংশগ্রহণ করেন।