মহাবিশ্বলোকের ইশারার থেকে উত্সারিত সময়চেতনা আমার কাব্যে একটি সঙ্গতিসাধক অপরিহার্য সত্যের মতো; কবিতা লিখবার পথে কিছু দূর অগ্রসর হয়েই এ আমি বুঝেছি, গ্রহণ করেছি। এর থেকে বিচ্যুতির কোনো মানে নেই আমার কাছে। তবে সময়চেতনার নতুন মূল্য আবিষ্কৃত হতে পারে।
আজ পর্যন্ত যে-সব কবিতা আমি লিখেছি সে-সবে আবহমান মানবসমাজকে প্রকৃতি ও সময়ের শোভাভূমিকায় এক ‘অনাদি’ তৃতীয় বিশেষত্ব হিসেবে স্বীকার ক’রে কেবল-মাত্র তারই ভিতর থেকে উত্স-নিরুক্তি খুঁজে পাইনি। নাট্যকবির পক্ষে এটা পাওয়া প্রয়োজন। প্রতিভাসিক কবিতা-জগতের একাগ্রতা ভেঙে ফেলে তাকে নাট্যপ্রাণ বিশুদ্ধতা দেন সেই কবি। কিন্তু তবুও তিন জগতেই বিচরণ করেন তিনি—মানবসমাজকেই চিনে নেবার ও চিনিয়ে দেবার মুখ্যতম প্রয়োজনে আন্তরিক হয়ে ওঠেন। লিরিক-কবিও ত্রিভুবনচারী, কিন্তু তার বেলায় প্রকৃতি, সমাজ, ও সময়-অনুধ্যান কেউ কাউকে প্রায় নির্বিশেষে ছাড়িয়ে মুখ্য হয়ে ওঠে না; অন্তত মানবসমাজের ঘনঘটায় প্রকৃতি ও সময়ভাবনা দূর দুর্নিরীক্ষ্য হয়ে মিলিয়ে যাবার মতো নয়। কাজেই উপন্যাস ও নাটকের মতো মানুষমনকে সমূলে আক্রান্ত না ক’রেও, কবিতা মানসের আমূল বিপর্যয় ঘটিয়ে দিতে পারে—তাকে নির্মলতর ক’রে তুলবার জন্যে—কথা ও ইঙ্গিতের দুর্লভ স্বল্পতার ভিতর দিয়ে।
কোনো কিছুকে ‘চরম’ মনে ক’রে সুস্থিরতা লাভ করবার চেষ্টায় আত্মতৃপ্তি নেই; রয়েছে বিশুদ্ধ জগত্ সৃষ্টি করবার প্রয়াস—যাকে কবিজগত্ বলা যেতে পারে—নিজের শুদ্ধ নিঃশ্রেয়স মুকুরের ভিতর বাস্তবকে যা ফলিয়ে দেখাতে চায়। এতে ক’রে বাস্তব বাস্তবই থেকে যায় না; দুয়ের একটা সমন্বয়ে সেতুলোক তৈরি হয়ে চলতে থাকে এক যুগ থেকে অপর যুগে—কোনো পরিনির্বাণের দিকে, কারু মতে; অল্পাধিক শুভ পরিচ্ছন্ন সমাজপ্রয়াণের দিকে, অন্য কারু ধারণায়; কবিজগতে যে-পাঠকেরা ভ্রমণ করেছেন তাঁদের মনে (কিংবা হাতে) ইহজগত্ আবার নতুন ক’রে পরিকল্পিত হবার সুযোগ পায় তাই।
আমিও সাময়িকভাবে কোনো-কোনো জিনিসকে ‘চরম’ মনে ক’রে নিয়েছি জীবনের ও সাহিত্যের তাগিদে, মনকে চোখঠার দিয়ে মাঝে-মাঝে—টেম্পররি সসেপনশন্ অব ডিজিবলিফ্ হিসেবে। কিংবা কখনো-কখনো মনকে এই ব’লে বুঝিয়েছি যে, যাকে আমি শেষ সত্য ব’লে মনে করতে পারছি না, তা তবুও আমাদের আধুনিক ইতিহাসের দিক-নির্ণয়-সত্তা; আজকের প্রয়োজনে চরম ছাড়া হয়তো আর-কিছু নয়। কিন্তু তবুও সময়-প্রসৃতির পটভূমিকায় জীবনের সম্ভাবনাকে বিচার ক’রে মানুষের ভবিষ্যত্ সম্পর্কে আস্থা লাভ করতে চেষ্টা করেছি। অনেক দিন ধ’রেই পরিপ্রেক্ষিতের আবছায়া এত কঠিন যে, এর চেয়ে বেশি কিছু আয়ত্ত করা আধুনিকদের পক্ষে অসম্ভব না হলেও কিছুটা সুদূরপরাহত। (শেষাংশ)
কবির ‘কবিতার কথা’ (বাংলা একাডেমি সংস্করণ,
আগস্ট ২০১৭) বই থেকে
স্কেচ :সত্যজিত্ রায়
