সিয়াম আহমেদ
শিশুদের প্রতি শারীরিক ও যৌন নির্যাতন এবং শিশু হত্যার ঘটনা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। কোনোভাবেই লাগাম টানা যাচ্ছে না। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে মানুষ নিজের সন্তানকে নৃশংসভাবে হত্যা করছে, সত্-বাবার দ্বারা কন্যাশিশুটি যৌন নিপীড়নের স্বীকার হচ্ছে, আবার মায়ের পরকীয়ার পথে বাধা হওয়া শিশুকে ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করা হচ্ছে। শিশু গৃহকর্মীকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাসায় আটকে রেখে গুরুতর জখম বা যৌন নির্যাতন করা হচ্ছে। ইদানীং গণমাধ্যমগুলোতে এমন খবরই আসছে। একটির পর আরেকটি। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০.৮ শতাংশ হলো শিশু। যাদের বয়স শূন্য থেকে চৌদ্দ বছরের মধ্যে। এ বিপুল সংখ্যক শিশুই আমাদের দেশের সম্পদ। আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম। এরাই আগামীদিনে জাতির কর্ণধার। শিশুরা নিষ্পাপ, ফুলের মতো। তাদের কারো সঙ্গে কোনো প্রকার বিভেদ ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব নেই। সুতরাং তাদের তো অন্যের দ্বারা নির্যাতিত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। শিশুরা ক্রমাগতভাবে পরিচিত ও অপরিচিত জনের হাতে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিশুরা অধিকাংশ সময় তাদের পরিবারের সদস্য কিংবা খুব বিশ্বস্ত কোনো মানুষ দ্বারা নির্যাতনের স্বীকার হয়। যেমন—সত্-বাবা, চাচা,গৃহশিক্ষক অথবা প্রতিবেশীর দ্বারা যৌন নির্যাতনের স্বীকার হয়। কখনো বা প্রবাসীর স্ত্রীর অনৈতিক সম্পর্কের বলি হয় তাদের নিষ্পাপ সন্তান। সম্প্রতি সুনামগঞ্জে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য একটি শিশুকে তার বাবা নিজ হাতে হত্যা করেছে। হত্যাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিশুটির শরীরের অঙ্গগুলো পাশবিক কায়দায় কেটে ফেলে। এখানেই শেষ নয়, হত্যার পর শিশুটির পেটে দুটি ছুরি বিদ্ধ করে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখে। এ ধরনের একটি লোমহর্ষক, হূদয়বিদারক, পাশবিক হত্যাকাণ্ডও কী আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না? যারা শিশুদের ওপর এ ধরনের নির্যাতন চালাচ্ছে তাদের মাঝে একটা ধারণা হয়ে গেছে যে তাদের এই অপরাধের কোনো বিচার হবে না। কেননা বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির তেমন নজির নেই। আর এ ধারণাই অপরাধীদেরকে শিশুদের ওপর পাশবিক আচরণের অভয় দেয়। এ পর্যন্ত শিশু নির্যাতনের ১ লাখ ৮০ হাজার মামলা হয়েছে। এ মামলাগুলোর অধিকাংশই এখনো বিচারাধীন। এছাড়া যেসব মামলার রায় হয়েছে সেগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ ধরনের নির্যাতনের মামলাগুলোর মাত্র ১.৩৬ শতাংশ মামলায় আসামির সাজা হয়েছে। বাকি ৯৮.৬৪ শতাংশ মামলায় আসামি আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বিভিন্নভাবে বেরিয়ে গেছে। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন আমাদের এমন তথ্যই দেয়। এছাড়া বিচারকার্যের দীর্ঘসূত্রতা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ঢিলেমি, আইনের ব্যত্যয়, সামাজিক অসচেতনতা, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ইত্যাদি কারণে শিশু নির্যাতন ও হত্যা বেড়েই চলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসচেতনতা, সামাজিক প্রতিরোধ, আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ, দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ এবং প্রকৃত দোষীরা যাতে বিচার থেকে রেহাই পেতে না পারে সে ব্যবস্থা করা গেলে শিশুদের অনেকাংশে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
