মার্কা মারা

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০১৯, ২১:৩৭

নাভীদ মাহবুব

আমাদের সময়ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এ মার্কা মারা হলকক্ষ/জায়গা ছিল :

আ’উল্লাহ (আহসানুল্লাহ) হলে দিদারের কক্ষ : মতিন স্যারের মাইক্রোওয়েভ তত্ত্বের জটিল সমীকরণ হজম করার জন্য সেমিস্টার পরীক্ষার আগে দিদারের জীবন দুর্বিষহ করতে এই বিশেষ কক্ষে দলে দলে ছিল সবার হাজিরা। তার রুমমেট বাবু সবার ঈর্ষা, কেননা সে ২৪/৭ দিদারের রুম সার্ভিস পায়—যখন যা পড়া বোঝা লাগে, সবই হাতের নাগালে। এত বছর পরও যখন বাবুকে চিনতে সমস্যা হয়, ‘রুম মেট’ বাবু বললে নিমেষে সবাই চিনে ফেলে।

রশীদ হলে এরশাদ আলীর রুমেও একই অবস্থা। অর্ধেক সময় অবশ্য সে এই বিশেষ কক্ষ থেকে পলাতক। বিনামূল্যে আমাদেরকে টিউশনি করাতে গিয়ে নিজেই না আবার পরীক্ষায় ফেল করে বসে। এমন কোনো বিষয় নেই, যে বিষয়ে সে ‘ঘাঘু’ নয়। আর আদর্শ বালক হিসেবে বাংলা সিনেমার বাইরে যদি বাস্তব জগতে কেউ থেকে থাকে, সে এই এরশাদ আলী। তাই ৮০-র দশকে ঢাকা কলেজে পড়ার সময় যখন একবার হলে রেড করা হয়, তখন হলের বাসিন্দা এরশাদ আলীকে জিগ্যেস করা হয়, ‘তোমার নাম কি?’ উত্তরে সে সরলভাবেই সত্য বলে, ‘এরশাদ’। রেডকারীদের প্রতিক্রিয়া, ‘ফাইজলামি করার জায়গা পাও না?’ বাকিটা ইতিহাস।

শেরে বাংলা হলে রুহুলের বিশেষ রুম : পড়ার চাপে চান্দি গরম হলে ‘বুয়েটের ভুপেন হাজারিকার’ কণ্ঠে গান শুনে মাথা ঠান্ডা করা। চতুর্থ বত্সরের শেষ দিন, অর্থাত্ ‘র্যাগ ডে’তে বিষণ্ন রুহুল তার গান গাবার শুরুতে ভারী গলায় বলল, ‘বুয়েটে আজ আমার শেষ গান’। এই জগতেও ছিল সেই রাতে তার শেষ গান...

রশীদ হলে রাশুর রুম : দিন/রাতে যে কোনো সময় বিশ্বের যে কোনো জায়গার ক্রিকেটের ধারা বিবরণী শর্ট ওয়েভ আর মিডিয়াম ওয়েভ বেতারের মাধ্যমে শোনা আর বসে সারাক্ষণ ঝিমাত। কিন্তু উইকেট পতনের সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম থেকে উঠে পুরো ওভারের বিস্তারিত বিশ্লেষণ দিয়ে দিত। আর এমনইভাবে দিত যে ভাষ্যকারের কানে গেলে উনার ঘুম হারাম হয়ে যেত নিজের চাকরির নিরাপত্তার দুঃশ্চিন্তায়।

নজরুল ইসলাম হল, ‘সোহাগ’ করে যাকে আজ পর্যন্ত ‘বয়লার’ বলে সম্বোধন করা হয়, কেননা গ্লোবাল ওয়ার্মিং এখান থেকেই শুরু। এখানেও রয়েছে মার্কা মারা কক্ষ-৪২৯ রুম । জি আর ই আর টোফেলে উচ্চ নম্বরের সিঁড়ি এই বিশেষ কক্ষে। মার্কিন মুল্লুকে যাবার ধান্ধা এইখানে—যদি না কোনো দিন এই বুয়েটের সেশন জ্যাম থেকে বের হয়ে আসতে পারি। আরেক আকর্ষণ—ক্ষুধার্তের জন্য যে কোনো সময়ই রয়েছে ফুজি ইন্সট্যান্ট নুডলস। যারা ভুলে গিয়েছেন ফুজি হল মামার বাবা, মানে মামা নুডলসের পূর্বসূরি।

নজরুল ইসলাম হলের ছাদ : বিদ্যুত্ চলে গেলে পাশে মেডিক্যাল কলেজের ড. ফজলে রাব্বি হলের ছাদে আসা ভবিষ্যত্ ডাক্তারদের সঙ্গে অভিনব গালির মৌখিক যুদ্ধ। কারেন্ট চলে আসলে সজোরে সম্মিলিত হাসি, তালি, আর তারপর আবার বই পুস্তকের জগতে ফিরে যাওয়া।

ক্যাফেটেরিয়ার ‘ভেঞ্চুরি’: ফ্লুইড মেকানিক্স-এ শেখা ভেঞ্চুরি ইফেক্টের ব্যবহারিক প্রয়োগ এখানে। লাইব্রেরি আর ক্যাফের মাঝখানের চিপা দিয়ে সজোরে বাতাস বয়ে যাওয়া বাতাসের হাওয়া উপভোগ করার স্থান এই ভেঞ্চুরি। আর এখানেই বসে ছাত্রছাত্রীদের ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ করার জন্য এই জায়গা বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ারের মতো।

ক্যাফে চত্বর : জ্বালাময়ী (আর শান্তিপ্রিয়) বক্তৃতা, উন্মুক্ত কনসার্ট আর ক্যাফে ফুটবলের তীর্থস্থান।

শহিদ মিনার : বিকালে বসে চিনাবাদাম খাওয়া আর রাস্তার মানুষের খোমা মাপার স্থান।

... ... ... এখন বোধ করি জামানা পালটিয়ে গিয়েছে...

n লেখক : একজন কমেডিয়ান, এ টি এন বাংলার দ্যা নাভীদ মাহবুব শো-এর উপস্থাপক, যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ড মোটর কোম্পানির প্রাক্তন প্রকৌশলী, আই বি এম বাংলাদেশের প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক