প্রতিদিনই বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে নানা দাবিতে আন্দোলন-ধর্মঘটের খবর উঠে আসে সংবাদমাধ্যমে। গত এক দশকে গোটা দেশের বিনোদনের, গর্বের বড়ো উত্স ক্রিকেট। ক্রিকেটাররাই এর প্রাণ। এবার দাবি আদায়ের মিছিল ও ধর্মঘটে নাম লেখালেন ক্রিকেটাররা। বিসিবির বিভিন্ন কার্যক্রমে ছড়িয়ে পড়া অসন্তোষে ফুঁসে উঠেছেন ২২ গজের নায়কেরা। হুট করেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে গতকাল।
সাকিব আল হাসানের নেতৃত্বে এক সংবাদ সম্মেলনে ১১ দফা দাবি জানিয়েছেন ক্রিকেটাররা। বিসিবি একাডেমি মাঠে বাংলাদেশের টেস্ট ও টি-২০ অধিনায়ক বলেছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট চলবে। এর কারণে হুমকিতে পড়ে গেল বাংলাদেশ দলের আসন্ন ভারত সফর। কার্যত অচলাবস্থাই তৈরি হলো দেশের ইতিহাসে ক্রিকেটারদের সবচেয়ে বড়ো ধর্মঘটের কারণে।
গতকাল বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের ঘোষণা অনুযায়ী, সব ধরনের ক্রিকেটীয় কার্যক্রম থেকে বিরত থাকবেন ক্রিকেটাররা। এই সময়ে জাতীয় দলের ভারত সফরের ক্যাম্পে যাবেন না তামিম-মুশফিকেরা। ক্যাম্প শুরু হওয়ার কথা ২৫ অক্টোবর। চলমান জাতীয় লিগেও অংশ নেবেন না ক্রিকেটাররা। জাতীয় লিগের তৃতীয় রাউন্ড শুরু হবে ২৪ অক্টোবর। তবে ধর্মঘটের আওতামুক্ত থাকবে বয়সভিত্তিক দলগুলো।
সাকিব বলেছেন, ‘আমরা জানি, সবাই আমাদের সাথে আছে। যতদিন আমাদের দাবিগুলো পূরণ না হচ্ছে, ততদিন আমরা ক্রিকেটের সাথে জড়িত থাকছি না। তবে বয়সভিত্তিক দল বাদে, মানে অনূর্ধ্ব-১৯, ১৭, ১৬—এরা সবাই বাদে জাতীয় দল ও ঘরোয়া ক্রিকেটার সবাই এর সঙ্গে জড়িত। এটা আজকে (গতকাল সোমবার) থেকেই। এটা ঘরোয়া লিগ, প্রথম শ্রেণি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পর্যন্ত সবকিছুতেই।’
দাবি আদায়ের পর সব ধরনের কার্যক্রমে ফিরবেন ক্রিকেটাররা। সাকিব বলেছেন, ‘দাবিগুলো যখন মানা হবে, সেটা আলোচনা সাপেক্ষেই হবে। দাবিগুলো মানা হলে আমরা আমাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে অবশ্যই ফিরে যাব। আমরা সবাই চাই, ক্রিকেটের উন্নতি হোক।’
তবে হুট করেই দেশের ক্রিকেটকে নাড়িয়ে দেওয়া সংবাদ সম্মেলনে হাজির হননি ক্রিকেটাররা। এর পেছনে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনাও ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ক্রিকেটারের সঙ্গে গতকাল কথা বলে জানা গেছে, অনেক দিন ধরেই এমন কিছু করার চেষ্টায় ছিলেন তারা, কিন্তু সংঘবদ্ধ হতে পারছিলেন না। এবার জাতীয় লিগের দ্বিতীয় রাউন্ড শুরুর পর সংবাদ সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত হয়। নিজেরা পরিকল্পনা করেন সবকিছু নিয়ে, যার ইঙ্গিত মেলে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাত্কারে সাকিব বিভিন্ন বিষয়ে বিসিবির সমালোচনা করলে।
ক্রিকেটারদের ১১ দফা :গতকাল একাডেমি মাঠে উপস্থিত ছিলেন জনা পঞ্চাশেক ক্রিকেটার। শীর্ষ ক্রিকেটার তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ, মুস্তাফিজ, সৌম্য, মুমিনুল হক, তাসকিনরাও উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ঘরোয়া ক্রিকেটের পরীক্ষিত, অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররাও ছিলেন। ১১ ক্রিকেটার সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন তাদের ১১টি দাবি।
ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)-এর সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের দ্রুত পদত্যাগ চেয়েছেন ক্রিকেটাররা। কারণ দীর্ঘদিন ধরে কোয়াব নিষ্ক্রিয়। কোয়াবের সভাপতি নাঈমুর রহমান দুর্জয় বিসিবির পরিচালক, সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পাল বিসিবির বেতনভুক্ত ম্যাচ রেফারি।
এছাড়া ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে পুরোনো পদ্ধতিতে দলবদল, সপ্তম আসরের পর বিপিএলে ফ্র্যাঞ্চাইজ পদ্ধতি ফেরানো, দেশীয় ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক বাড়ানো, জাতীয় লিগের ম্যাচ ফি ১ লাখ করা, ডিএ বাড়ানো, ভ্রমণে বিমানের টিকিট দেওয়া, কেন্দ্রীয় চুক্তিতে ক্রিকেটারদের সংখ্যা ৩০ জনে উন্নীত করা, জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের বেতন বাড়ানো, দেশীয় কোচ, আম্পায়ার, ট্রেনার, ফিজিও, গ্রাউন্ডসম্যানদের বেতন বাড়ানো, জাতীয় লিগের সঙ্গে একটি ওয়ানডে টুর্নামেন্ট করা, বিভিন্ন লিগে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক সময়মতো পরিশোধ করার দাবি জানিয়েছেন ক্রিকেটাররা।
দ্রুত পদক্ষেপ নেবে বিসিবি :ক্রিকেটারদের ঘটা করে সংবাদ সম্মেলন, ১১ দফা দাবি, ধর্মঘট যেন বিনা মেঘে বজ পাতের মতোই ছিল বিসিবির কাছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, গতকাল দুপুরে এমন কিছু জানার পরই ক্রিকেটারদের থামানোর চেষ্টা করেছেন বিসিবির পরিচালকেরা। কিন্তু ক্রিকেটাররা অনড় থাকায় তা সম্ভব হয়নি। তারপর থেকেই মুখে কুলুপ এঁটেছেন প্রভাবশালী পরিচালকেরা। যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাউকে পাওয়া যায়নি।
তবে বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজন জানিয়েছেন, আলোচনা করেই সমাধান করা হবে। দ্রুত পদক্ষেপ নেবে বিসিবি। ক্রিকেটারদের দাবি নিয়ে গতকাল তিনি বলেছেন, ‘আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছি। আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি এসব ব্যাপারে। ক্রিকেটাররা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো সমস্যা বা বিষয় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। বিষয়টি যত দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, সেটা আমরা দেখছি।’
দ্রুত সমাধান হবে—ক্রীড়ামন্ত্রীর আশাবাদ
এদিকে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এমপি মনে করেন খেলোয়াড়দের শুরুতেই কঠোর অবস্থানে যাওয়া ঠিক হয়নি। তবে তিনি মনে করেন যে বিষয়টির দ্রুত সুরাহা হবে। গতকাল রাতে তিনি ইত্তেফাককে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ক্রিকেটারদের দাবিগুলো আমি দেখেছি। তাদের অনেকগুলো দাবিই যৌক্তিক। তবে তারা এভাবে হার্ডলাইনে না গিয়ে ক্রিকেট বোর্ডের সাথে কথা বলতে পারত। কারণ এর সাথে দেশের স্বার্থ জড়িত।’
এক প্রশ্নের জবাবে জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, ‘আমি বোর্ডের দুই-একজনের সাথে কথা বলেছি। তারা আমাকে আশ্বস্ত করেছেন দ্রুত এর সমাধান করা হবে।’
ভারতীয় বোর্ডের প্রতিক্রিয়া :আগামী মাসেই বাংলাদেশ দলের ভারত সফর। সূচিও চূড়ান্ত। গতকাল ধর্মঘটে নেমেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ভারত সফর। এ বিষয়ে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের এক কর্মকর্তা পিটিআইকে বলেছেন, ‘বিসিসিআই অপেক্ষা করবে এবং ঘটনা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। এটা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অভ্যন্তরীণ বিষয়। যতক্ষণ না তাদের কাছ থেকে শুনছি, ততক্ষণ মন্তব্য করার কারণ দেখছি না।’
