প্রাচীন প্রাগেজ্যাতিষপুর বা কামরূপ রাজ্য, হরিকেল রাজ্য হয়ে যে প্রাচীন শ্রীহট্ট; সেখানেই ভাষালিপির এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে চতুর্দশ শতকে। পৃথিবীতে প্রচলিত কয়েক হাজার ভাষার যেখানে নিজস্ব লিপিই নেই, সেখানে একটি ভাষার একাধিক লিপির যে প্রবর্তন বাংলাদেশের সিলেটে হয়; ভাষালিপির ইতিহাসে এটি এক বিরল অধ্যায়। বাংলালিপির পাশাপাশি সিলেটি নাগরীলিপি পাঁচশ বছর দাপটের সঙ্গে টিকে ছিল বঙ্গের উত্তর-পূর্বাঞ্চল জুড়ে। এ লিপির সাহিত্যজগত্ নেহায়ত ছোট নয়। আকারে-প্রকারে, বিষয়ে নাগরীলিপির সাহিত্যের বৈচিত্র্য মুগ্ধ হওয়ার মতো। নাগরীলিপি সাহিত্যে প্রেম-প্রণয়ের কয়েকটি পুঁথি অতুল পাঠকপ্রিয় ছিল। এরকম একটি পুঁথি চন্দ্রমুখির ছিল তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা। মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্যে, বিশেষত সিলেটি নাগরীলিপির সাহিত্যে পুঁথিটির এই সমাদর কেবল তার কাহিনির জন্যই নয়, তার কাব্যরচনায় কবির মুন্সিয়ানার জন্যও। সিলেটি নাগরীলিপি বাংলা বর্ণমালার একটি ভিন্ন সংস্করণ, যেখানে বর্ণাকৃতি নিজস্ব এবং বর্ণ ও শব্দ লেখায় কিছু ব্যতিক্রম দেখি। নানা ব্যতিক্রম অঙ্গে ধারণ করেও সিলেটি নাগরী বাংলাভাষা তথা সিলেটি উপভাষাকে মুখ্য কেন্দ্রে রেখে আবর্তিত হয়েছে গোটাকাল। এ-লিপিতে রচিত সাহিত্য ছিল জীবনঘনিষ্ঠতায় লোকজীবনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা।
‘চন্দ্রমুখি’র পুঁথিকার মুহম্মদ খলিল সম্পর্কে গবেষকদের কাছে খুব বেশি তথ্য নেই। খলিলের জন্ম, বাসস্থান ইত্যাদি সম্পর্কেও সম্পূর্ণ অন্ধকারে আমরা। তবে, গবেষক এস এম গোলাম কাদির (১৯৩৩-২০১১) চন্দ্রমুখি পুঁথির ভাষা, শব্দ প্রয়োগ ইত্যাদি বিচার-বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে লাউড়ের অধিবাসী বলে মত দিয়েছেন তাঁর ‘সিলেটী নাগরী : ভাষা ও সাহিত্য’ গ্রন্থে। লাউড় বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার একটি অঞ্চল। নবাবি আমলে সিলেট তরফ, ইটা, জৈন্তা, লাউড়, গৌড় এই পাঁচটি রাজ্যে বিভক্ত ছিল। চন্দ্রমুখি ছাড়াও মুহম্মদ খলিলের আরও দুটো পুঁথির উল্লেখ পাই চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণের (১৯২১-১৯৮৮) ‘সিলেটী নাগরী পরিক্রমা’ গ্রন্থে, এগুলো হচ্ছে—ফুলকুমারী এবং হাসিনা।
চারদিকে হাতড়িয়েও চন্দ্রমুখির রচনাকালের তেমন কোনো সন্ধান মেলে না, কেবল হতাশা ছাড়া। সাধারণত হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিতে পুঁথিকারেরা রচনাকাল এবং তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য লিপিবদ্ধ করে থাকেন রেওয়াজ অনুযায়ী। কিন্তু, কালের আস্তরণে বিলোপ হয়ে গেছে তার আদি পাণ্ডুলিপিটি, যা আমাদের দেখার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। আমাদের হাতে এ পুঁথির যে কয়েকটি সংস্করণ রয়েছে সেগুলি মুদ্রিত। তাই, পুষ্পিকা থেকে তার প্রকাশকাল, জন্ম-ঠিকুজি পাওয়ার কোনো সুযোগ অনিবার্যভাবেই নেই। নাগরীলিপি ও সাহিত্য গবেষক গোলাম কাদিরের লেখায় আমরা একপ্রকার ইশারা বা সংকেত পাই, তাঁর মতে, গ্রন্থটি আঠার শতকে রচিত। তাঁর অনুমানের স্বপক্ষে সমর্থন মেলে আহমদ শরীফের (১৯২১-১৯৯৯) বাংলা সাহিত্যে উপাখ্যান শাখার কাব্য পরিচয়ে। সেখানেও চন্দ্রমুখি পুঁথিকে আঠার শতকের রচনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। লাল বিহারী দে’র (১৮২৪—১৮৯২) ‘চন্দ্রমুখির উপাখ্যান’ নামে একটি গ্রন্থ রয়েছে। কিন্তু তার বিষয় স্বতন্ত্র। খলিলে চন্দ্রমুখির কাহিনির সাথে অংশতও মিল নেই ওই গ্রন্থের বিষয়বস্তুতে। তবে, গ্রন্থ দুটো রচনা হয়েছে সমকালে, প্রায় কাছাকাছি সময়ে।
চন্দ্রমুখির রচনাভঙ্গি সম্পর্কে এস এম গোলাম কাদির উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলায় অন্ততপক্ষে চারজন কবির কাব্যে মৃগাবতীর অনুসরণ লক্ষ করি। সতের শতকে দ্বিজ পশুপতি লেখেন চন্দ্রাবলী, সম্ভবত আঠারো শতকে আসামের কবি দ্বিজরামের মৃগাবতী চরিত্র ও করিমুল্লাহর যামিনীভান এবং উনিশ শতকে মোহাম্মদ খাতেরের মৃগাবতী যামিনীভান। মুহম্মদ খলিলের চন্দ্রমুখি সেদিক থেকে নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী। কেননা বিভিন্ন কারণে এ-কাব্য আঠারো শতকের প্রথমার্ধের রচনা বলেই মনে করি। তবে চন্দ্রমুখি মৃগাবতীর প্রত্যক্ষ অনুসরণ নয়, কোনও কোনও ঘটনা এবং সার্বিক গল্পের মৌল কাঠামোতে মৃগাবতীর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে কাব্যটিতে। কাহিনীর উপস্থাপনা বাহুল্য বর্জিত, প্রথানুগত হামদ-নাত, রচয়িতার আত্মপরিচয় বা রচনার কাল ও উদ্দেশ্য—এসব কোন উপক্রমণিকা নেই।’
পুঁথিটির রচনাকাল আঠার শতক, তখনো নাগরীলিপি মুদ্রণের যুগে প্রবেশ করেনি। অন্তত শতবর্ষ এটি হাতে লিখে প্রচলিত ছিল। কিন্তু, আমাদের হাতে এই পুঁথির যে কপি আছে, তা মুদ্রিত। আমরা এটি সংগ্রহ করেছি, সিলেটের খাদিমপাড়া নোয়াগাঁও গ্রামের মো. বারেক মিয়ার নিকট থেকে। পুঁথিটির মুদ্রণকাল ১৩৫৭ বাংলা, শ্রীহট্ট বন্দরবাজার ইসলামিয়া প্রেসে মহাম্মদ আবদুল গণি দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত। পুঁথির নামের ওপরে ‘আসল’ শব্দটি জুড়ে দিয়েছেন প্রকাশক। এর পেছনেও একটি চিরপরিচিত প্রেক্ষাপট জড়িয়ে রয়েছে। সেকালেও জনপ্রিয় পুঁথিগুলো পাইরেট হয়ে ছিল, এখানেই তার প্রমাণ বহন করে। আমাদের হাতের কপিটি প্রায় অক্ষত। সাইজ দৈঘ্য, প্রস্থে ৮X৫ ইঞ্চি। শুরু থেকে শেষ অবধি পৃষ্ঠাসংখ্যা ৫২। এর বাইরে আরেকটি পাতা রয়েছে। সেখানে এক পৃষ্ঠায় প্রকাশক একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছেন। বিজ্ঞাপনের শিরোনাম ‘সিলহেটী নাগরী কেতারের লিষ্টি।’ এই লিস্টিতে নাগরীর ৩৪টি বইয়ের তালিকা যুক্ত। বিজ্ঞাপনের শুরুতেই ‘নিম্নলিখিত কেতাব সমুদয় ও অন্যান্য হরেক রকম কোরাণ শরীফ, আরবী, ফারসী, উরদু, লকনবী কলিকাতি ছাপার কেতাব ও পুথি নীচের ঠিকানা মতে পত্র লিখিলে ভেলুপেবুল পোষ্টে বা রেল ষ্টিমার যোগে ঘরে বসিয়া সুলভ মূল্যে পাইতে পারিবেন এবং স্বয়ং বর্ণিত স্থানে আসিলে তাহাকে সাদরে যত শীঘ্র হয় পছন্দ মত কেতাব পুথি ও জিনিসাদি দিয়ে থাকি।’ এই তথ্য ভূমিকায় রয়েছে। আমাদের কাছে যে পুঁথি তাতে আলাদা পাটা নেই। একই কাগজে ছাপা পটে চারপাশে ব্লক করে প্রথম পৃষ্ঠাকে মুখশ্রী হিসেবে ছেপেছেন প্রকাশক। প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশকের নাম, প্রকাশকাল ইত্যাদি এবং মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। তৃতীয় পৃষ্ঠা থেকেই চন্দ্রমুখির কাহিনির সূচনা। সূচনা পৃষ্ঠার ঊর্ধ্বাংশে রয়েছে মসজিদের ছবির মধ্যে ক্যালিগ্রফিতে ‘আল্লাহ’ লেখা।
এই পুঁথিটি ২৩টি অংকে বা অধ্যায়ে বিভক্ত। এগুলো হচ্ছে, ‘আগাজ পুঁথি চন্দরমুখি, কুমারের কান্দন, চন্দরমুখি পাইবার, বএআন, রাজার বিলাপ, কুমারের উদদেশে চর পাঠাইবার বএআন, কইনার কান্দন, রাগ আহির, রাগ লাচাড়ি, চন্দরমুখির কুমারের উদদেশ করা ও মিলন, কুমারের কান্দন, কুমারের শাদি, কইনার বিলাপ, কুমারের বিলাপ, ইন্দরের আবেশ্বিরির বিলাপ, রাজা ও রানির বিলাপ, লাচাড়ি রাগ দুখি, জিলাইবার বএআন, চন্দরমুখির শখির কথা, রাগ লাচাড়ি, কইনার খবর পাইবার কথা, রাগ লাচাড়ি, রাগ ধামারি, রাগ বিআঘড়া।’ পুঁথিটির বেশিরভাগ অধ্যায় পয়ার ছন্দে লেখা, তবে কয়েকটি রাগ তাল ছন্দেও লেখা হয়েছে। একপ্রকার সুরে কাব্যঢঙে পুঁথি পাঠ হলেও কোথাও কোথাও রাগতালে গীত ভঙ্গিমায় এর কাব্যসুধা গ্রহণের আয়োজন রেখেছেন মুহাম্মদ খলিল।
চন্দ্রমুখি মূলত একটি মর্মস্পর্শী প্রেমকাহিনি। মিছির নগরের যুবরাজ গুল শুনাহর আর গন্ধর্ব রাজকন্যা চন্দ্রমুখির প্রেম, ট্র্যাজেডি, অতঃপর মিলনের কাহিনি বিবৃত হয়েছে পুঁথিতে। রূপকথার মতো এর ঘটনাপ্রবাহ বিস্তৃত। পুঁথির সূচনাতেই পুঁথিকারের বর্ণনা : ‘আগেতে আল্লার নাম মনিতে রাখিআ / চন্দরমুখির কথা শুন মন দিআ*/ মিছির নগরের রাজা নামে পুরবেশ্বর / তান ঘরে হইআ পুতরু গুল শুনাহর*’
এই গুল শুনাহরের সঙ্গে চন্দ্রমুখির প্রেম-বিরহ মূল উপজীব্য হয়েছে পুঁথিতে। পুঁথির ভাষায় : ‘গন্দরবব নগরে রাজা নামে বড় শুখি / তান ঘরে হইলা কইনা নামে চন্দরমুখি*/ উদিত হইয়া গেল পেরমের হুতাশন / জেই ভাবে দিনবন্ধু করিলা মিলন*’
রাজকুমার গুল শুনাহরের শিকারের শখ হলে বন্ধুবান্ধবসহ তিনি শিকারে বের হলেন। শিকারের জালে আটকা পড়ল এক হরিণী। কিন্তু হরিণী সবাইকে বিস্মিত করে জানায়, সে হরিণীরূপী মনুষ্যকন্যা। পুঁথির ভাষায় : ‘মিরগ কুপ ছাড়ি তবে কইনা রূপ ধরি / কুমারে ডাকিআ কহে মিরগ রূপ ধারি */ গন্দরবব কুমারি আমি চন্দরমুখি নাম / গন্দরবব নগরে ঘর তোমারে কহিলাম */ জদি আমারে দিআ থাক তুমার মন / আমার উদদেশ জাইও গন্দরবব ভুবন*/ এতেক বচন বুলি করিআ তুরিত / নির্মিশে চলিআ গেল আপনার পুরিত*’
গন্ধর্ব কন্যা চন্দ্রমুখির এমন অন্তর্ধানে ব্যাকুল হয়ে ওঠে রাজকুমারের চিত্ত। তার মনে রাজকুমারীর জন্য গভীর প্রেমের সঞ্চার হয়। পুঁথির ভাষায় : ‘দেখিলা গন্দরবব বালা* গলে শুভে মুহন মালা ঃ/ মুখ তান জেন শশির ধারা*/ বদন উজালা তান* গজমতি পরিধান ঃ/ চমকে জেন নাকের বেশর / ভংগিমা নএওনে চাএ* চাইতে পরানি লইআ জাএ ঃ/ চন্দর জিনি দুই চউক ভুরি*/ মুখেতে মধুর বানি* শার শুমার বুলিখানি ঃ/ হেন দেখি শুরংগ শুন্দর ’
চন্দ্রমুখির রূপের ঝলকানিতে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েন কুমার। প্রেমে মাতোয়ারা তার চিত্ত ব্যাকুল হয় চন্দ্রমুখির জন্য। তিনি পুড়তে থাকেন পিরিতির অনলে। পুঁথির ভাষায় :‘কুমারের মুখ দেখি জত পাতরগন / কেও কান্দে পাছাড় খাইআ কেও ভাবে মন*’
রাজকুমার বিলাপ করে বন্ধু জগেশ্বরকে জানান, হরিণী অবয়বে উপস্থিত চন্দ্রমুখির সন্ধান না পেলে তিনি বাঁচবেন না। রাজকুমারীর তল্লাশে সবান্ধব বেরুবেন গুল শুনাহর। অবশেষে রাজকুমার গুল শুনাহর রাজকুমারীকে বাহুলগ্ন করার উদ্দেশে রওনা হলেন। অনেক দিন, অনেক পরিক্রমা পাড়ি দিয়ে খুঁজে পেলেন গন্ধর্ব নগর। সেখানে এক বুড়ির বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। তারপর বুড়িকে নানা উপঢৌকন দিয়ে তার কাজে সহযোগিতার জন্য সম্মতি আদায় করলেন। আরাধ্য সাধনে গন্ধর্ব রাজকন্যার বাড়ি পর্যন্ত একটি সুড়ঙ্গ খনন করা হলো ছ’মাসে। এবার শুরু হলো অভিসারে যাওয়া-আসা। পুঁথির ভাষায় : ‘দেখিলা তবে চন্দরমুখি করিছে শএওন / চন্দর জিনি মুখকানি মজিলা মতন*/ রতন ওলংকার গলে করে ঝলমল / মুখ দেখি যুবরাজ হইলা বিকল*/ চতুরভিতে দেখে নিদরা জাএ শখিগন / দিলে শাধ করে মনে করিতে ভুনজন*/ ভিংগারের জল দিআ পাখালে বদন / পালংগে উঠিয়া বশে শানন্দিত মন*’
এসময় ঘুম থেকে জেগে ওঠে কুমারী। সুড়ঙ্গপথে পলায়নকারী রাজকুমার সম্পর্কে জানতে চায় সখিদের কাছে। এক সখির জবাব। পুঁথির ভাষায় : ‘দেখে খালি ডেগ আছে জল নাই কুআএ / করপুর তাম্বুল নাই শোনার খাচাএ*’
অতঃপর রাজকুমারী তর্জন-গর্জন করে সখিদের জানিয়ে দিলো তার গৃহে প্রবেশে সাধ্য কারো নাই। পুঁথির ভাষায় : ‘তরজন করিলা বালা শখিদের উপর / মুনিশ কিরূপে আইল পুরির ভিতর*/ পাথরের ঘর শখি লুহার কেও আড় / নরের কি শক্তি আছে ঘরে আশিবার*/ পাথর লংগিতে পারে পরর কি শক্তি / ওনুমানে বুঝি কিবা হুরপরি জাতি*’
রাজকুমারী বিষয়টি নিয়ে ভাবতেই থাকে। সে সাতপাঁচ অনেককিছুই ভাবে। তার মনে হয়, এ চোর প্রথাগত চোর নয়, বরং তার মনকে চুরির অভিসন্ধি রয়েছে এর। এবার চোর ধরতে সে প্রস্তুতি নেয়। ঘুমের ভান করে পড়ে থাকে বিছানায়।
এবার কুমারীর ফাঁদে ধরা পড়ে রাজকুমার। পুঁথির ভাষায় : ‘ভিংগারিআ জল দিআ পাখালে কদম / পালংগে উঠিআ বইশে শানন্দিত মন*/ বাটার তাম্বুল খাএ কিছু নাহি ভএ / খনে ওংগে বাড়াএ হাত চনচল রিদএ*/ হস্তের অংগুটি ধরি চাএ খশাইবার / হেন কালে জাগি কইনা ধরিল কুমার*’
রাজকুমার এবং রাজকুমারীর মিলনে দুজনেই অভিভূত। দুজনের মনের ইচ্ছা এক বিন্দুতে পরিণত হলো। অবারিত হলো যুগলবন্দি হবার সুযোগ। ভোরবেলা সখিগণ প্রত্যাশা অনুযায়ী দুজনকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দিলো। পুঁথির ভাষায় : ‘রূপ দেখি শখিগন আনন্দে হুলাশ / চন্দরমুখি বিআ দিলা কুমারের পাশ*’
অন্যদিকে গন্ধর্ব রাজার মহলে চলছে মাতম। প্রিয়পুত্রের এই নিরুদ্দেশ যাত্রায় রাজা হতবাক। দেশে-দেশে, জলে-স্থলে রাজকুমারের খোঁজে লোক পাঠালেন। এদের একজন মিছির নগরে এসে খোঁজ পেলেন শুনাহরের, জানতে পারলেন তার প্রেম অভিসারের কাহিনি। অতঃপর শুনাহরকে দেশে ফেরানোর জন্য চেষ্টা শুরু হলো। তার বন্ধু জগেশ্বর দেশের কথা, মা-বাবার আর্তির প্রসঙ্গ তুলে রাজকুমারকে দেশে ফেরার অনুরোধ জানায়। তাতে মন আর্দ্র হয় শুনাহরের। কিন্তু চন্দ্রমুখি যে তাকে ছাড়তে চাইবে না, এক কথা জানায় শুনাহর। পুঁথির ভাষায় : ‘জদি কইনা নিদরা জাএ আপনার ঘর / পটকাএ ছান্দিআ বান্দে আপনা কমর */ হস্তের ওংগুলি আমার মুখেতে রাখিআ / বেভুল নিদরা জাএ কইনা বশনে ঢাকিআ*’
জগেশ্বর এবার শুনাহরকে বুদ্ধি বাতলে দেয়। পুঁথির ভাষায় : ‘জেই না পালংগে শুইআ থাকে চন্দরমুখি / শনধি করে ফুলের বেশ তথা জাইও রাখি*/ চন্দরমুখির মুখেতে পানের বিরা দিআ / তবে শে ওংগুলি তুমার লইও খশাইআ*’
এবার সফল হলো জগেশ্বরের দল। দুর্বলচিত্তের অধিকারী রাজকুমার শুনাহর দেশের উদ্দেশে রাতের অন্ধকারে পালালেন প্রাণাধিক পত্নীকে রেখে। ঘুম থেকে জেগে শূন্য বিছানা দেখে শোকে, দুঃখে, অপমানে ভীষণ কাঁদল চন্দ্রমুখি। অতঃপর কঠিন হলো সে, শুনাহরের খোঁজে বেরুল। কিন্তু রাজনন্দিনী এ কণ্টকময় পথে বারবারই পীড়াদায়ক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলো। পুঁথির ভাষায় : ‘ঘাটে গিআ না পাইল ডিংগা করিছে মেলানি / দিন গেল রাতরি হইল চিন্তিত রজনী*/ একেত শুন্দর কইনা হাঁটিতে না পারে / খনে জাএ লড় দিআ খনে জাও ধিরে*/ গাছের শিকড় লাগি পড়ি আছাড় খাএ / কমল চরণ মাটি লহু বইআ জাএ*/ দুখের উপরে দুখ কত শবে আর / বশন ফাড়িয়া পদ বান্দে বারে বারে*’
রাজকুমারের ডিঙা চলছে। অনবরত চলছে, কোথাও দু’দণ্ড থামছে ডিঙা। এসময় নৌকায় বসে রাজকুমার বিলাপ শুনতে পেলো। সে বন্ধুদের নৌকা থামাতে বলে। সময় যাচ্ছে, রাজকুমারের মন চন্দ্রমুখির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার জন্য বিষিয়ে উঠছে। তপ্ত দগ্ধ হচ্ছে হূদয়। নৌকা বাঁক ঘুরতেই এক নবীন দরবেশ মূর্তি দেখা গেল। তার নাম শাহা শঙ্কা। গন্ধর্ব ফিরোজ শাহের রাজ্যে ছিল এতকাল। পুঁথির ভাষায় : ‘এতদিন শেই দেশে ভিক্কা মাংগি খাইলু / আশি নিশি পরভাতে মুই কান্দন শুনিল*/ শেব শবের কান্দন শুনি উদাসিনি হইলু / ধরিতে না পারি হিআ এথা চলি আইলু*’
শাহা শঙ্কা দরবেশরূপী চন্দ্রমুখীকে নৌকায় তুলে নিল রাজকুমার। এখানে চন্দ্রমুখীর অভিমান চাপা থাকল না। সে ক্ষোভ প্রকাশ করতে লাগল। পুঁথির ভাষায় : ‘নঅন থাকিতে তুমি জিবনের ওনধ / কেমনে চিনিবা তুমি গগনের চান্দ*’
পরক্ষণে, চন্দ্রমুখি স্বরূপ বদলে ফেলে, কথাবার্তায় বন্ধুর মতো আচরণ করে। পুঁথির ভাষায় : ‘একদিন জার শনে জার হএ মিলন / ছাড়ি জাইতে লাগে বেথা পুড়ে তার মন*/ নবিন পিরিতি তুমি ছাড়িআ জাইতে / না লাগিল দএআ মাএআ নিদারুন চিতে*’
শাহা শঙ্কার কথা শুনে শুনাহরের মনে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য অনুশোচনা হতে লাগল। সে বার বার বন্ধুদের দোষারূপ করতে লাগল। বাকিবতণ্ডা, তর্ক-দ্বন্দ্বের মধ্যে অবশেষে নৌকা ভিড়ল দেশের মাটিতে। নিরুদ্দিষ্ট পুত্রকে পেয়ে রাজার মুখে হাসি ফুটল, রাজ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। জগেশ্বর রাজাকে জানায় ‘পেরেমের জটি খাইআ কুমার হইআছে উদাস’। রাজা অবিলম্বে তার বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। পুঁথির ভাষায় : বাজান শুনিলা যখন এমত বচন / কইনা জুড়িনি কইলা ইন্দরের ভবন*’
এবং অবশেষে রাজকুমারের বিয়ে হলো ইন্দরের আবেশ্বরীর সঙ্গে। বিয়ের পর ফুলশয্যার সময় এল। রাজকুমার বায়না ধরলেন, শাহা শঙ্কাকে সঙ্গে নিয়েই তিনি যাবেন অন্দরে। ‘শুনিআ হাশিআ মরে ইন্দরের রাজ / কিনা কথা কহ পুতরু মুখে নাই শে লাজ*’
পুত্র অটল তার সিদ্ধান্তে, অবশেষে রণেভঙ্গ দিলেন পিতা। রাজকুমার শাহা শঙ্কাকে নিয়ে অন্দরে প্রবেশ করলেন। পাশের কক্ষে থাকলেন শাহা শঙ্কা রূপধারী চন্দ্রমুখি, রাজকুমার চললেন বাসরের উদ্দেশে। এ দৃশ্য যেকোনো প্রেমী জন্য অসহ্য, মরণসম, এমন অবস্থা প্রকৃত প্রেমী মেনে নিতে পারে না। চন্দ্রমুখি তাই সিদ্ধান্ত নিলেন আত্মহননের। নিজে বাসর সাজে সজ্জিত হলেন। অতঃপর প্রেমের জন্য নিজেকে বিসর্জন দিলেন। পুঁথির ভাষায় : ‘মরন নিকটে রাখি কান্দে চন্দরমুখি / দারুন কাটারি বালা শমুখেতে রাখি */ নিঠুর তুমার মাও বাপ নিঠুর তুমার হিআ / আমারে ছাড়িআ আইলে ফুলের বেশ দিআ*/ শংগে আইলু পরিচএ দিলু বারবার / না চিনিলা দুশটমতি কি দুশ আমার*/ জদিবা বা জানিত মনে চন্দরমুখি করি / তে কেনে করিত বিআ ইন্দরের আবেশ্বরি*/ এ বলিআ আলাহ্ নবি করিআ শরন / কাটারি হূদয়হানি ভেজিল জিবন*’
ঘুম থেকে জেগে রাজকুমার দরবেশকে দেখতে গেল পাশের কক্ষে। যা দৃশ্য দেখল তাতে সে বিমূঢ়। দরবেশের নিথর দেহ দেখে আর্তনাদ করে ওঠে কুমার। পুঁথির ভাষায় : ‘পরিচএ দিল কইনা উঠিতে না পাইলু / পাইআ অমুল্ল নিধি মুই শে হারাইল*/ জদি মইল চন্দরমুখি শুন্দর বদন / আমার জিবন রাখি কিশের কারন*’
রাজকুমার অনুসরণ করল তাকে। নিজে আত্মহননের পথ বেছে নিল। আর্তচিত্কার শুনে পাশের ঘরে গিয়ে নববধূ আবেশ্বরী দেখল, সজ্জিতা অবস্থায় নিথর দেহে পড়ে আছে এক রূপমনোহর বধূ এবং রাজকুমার। এ দৃশ্য আবেশ্বরীকে হতবিহ্বল করে, সে হিতাহিত জ্ঞান হারায়। সিদ্ধান্ত নেয়, সেও বেঁচে থাকবে না। পুঁথির ভাষায় : ‘পতি হেন শিরমনি জদি আমার মইল / তাহার শহিতে মরন আমার হইল*/ এ বুলিআ শে কইনা হারে বুইধি গিআন / শেই জে কাটারি আনি ভেজিল পরান*’
পুঁথিটির এ পর্যন্ত আখ্যান ট্র্যাজেডির। এখানেই পুঁথি শেষ হতে পারত। কিন্তু তা হয়নি। মৃতদেহ তিনটি সত্কারের সময় হঠাত্ ‘ইছা পেগাম্বরের’ আগমন ঘটে এবং রাজার কাছে এই সকল মর্মান্তিক ঘটনার সকরুণ বর্ণনা শুনে তিনি স্রষ্টার কাছে ‘জিউদান’ প্রার্থনা করলেন। পুঁথির ভাষায় : ‘কহিতে জিউদান পাইলা তিনজন / জাগিআ উঠিলা হেন দেখিআ শয়ন*’
এই জীবনপ্রাপ্তিতে আনন্দে মাতোয়ারা হলেন পুরিবাসী। পুত্র, পুত্রবধূদের নিয়ে অন্দরে রওনা হলেন রাজা। এদিকে গন্ধর্ব রাজা ফিরোজ শাহ তাঁর কন্যার খোঁজে চর পাঠালেন মিছির নগরে। ছয়মাস সন্ধানের পর এক চর খোঁজ পেল কুমারীর। চন্দ্রমুখি এ ঘটনা জানাল গুল শুনাহরকে। অবশেষে মিছির নগরের রাজা পুরবেশ্বর পুত্রবধূকে সানন্দে তাঁর পিতৃরাজ্যে যাবার অনুমতি দিলেন। চন্দ্রমুখি কুমারকে নিয়ে যাবার আবদার করল, রাজা কর্তৃক আজ্ঞা হলো। অতঃপর গন্ধর্ব রাজ্যের দিকে রওনা দিলো রাজকুমার ও চন্দ্রমুখি। পুঁথির ভাষায় : ‘শুন শুন মহা রাজা করি নিবেদন / চন্দরমুখি লইআ আইলু নিরপতি নন্দন*/ জার শনে চন্দরমুখি করিলা গমন / শেই দুই দিন দারে আইলা গন্দরবব ভুবন*’
‘চন্দ্রমুখি’ গ্রন্থটি এক নিটোল প্রেমকাহিনি। গল্পের বুনন চমত্কার। কাহিনি পরম্পরা সাবলীল, তাই পুঁথিটি পাঠককে টেনে রাখে শেষ পর্যন্ত। সিলেটি নাগরীলিপির এ-পুঁথিটি প্রায় দু’শ বছর পাঠকের পছন্দের তালিকায় তুমুল জনপ্রিয়তা থেকে প্রমাণ করে তার শক্তি।
